ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

সাধারণ মানুষদের মস্তিষ্কের গঠন একই রকম হওয়ায় আমরা সবার সাথে একইভাবে যোগাযোগ করি। আমরা আমাদের কথা, ভাব-ভঙ্গি, আচার আচরণের মাধ্যমে খুব সহজেই কমিউনিকেট করতে পারি। ধরুন কিছু মানুষের বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করার এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা অনেক সময় বলি আমরা অনেক বুদ্ধিমান কিন্তু হয়তো সাধারণ পিপড়ারও কিছু বুদ্ধি আছে, আমরা যখন পা দিয়ে তাকে মাড়িয়ে দেই তখন হয়তো সে চেঁচিয়ে বলে “আমায় মেরো না, আমি এই পৃথিবীতে বাঁচতে চাই।” কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনা। কারণ পিপড়ার সাথে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনা। অটিস্টিকদের ব্যাপারটাও এরকম। মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ বিষয়ে একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন আপনার পুরো কম্পিউটার ভাল আছে কিন্তু মনিটরটি নষ্ট। তখন কি হবে। আপনি কি-বোর্ড বা মাউস দিয়ে
কম্পিউটারকে নির্দেশ দিতে পারবেন সেন্ট্রাল প্রোসেসিং ইউনিট ভাল থাকায় সে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজও করতে পারবে। কিন্তু মনিটর নষ্ট থাকায় আমরা কিছুই জানবো না।

তেমনি কিছু মানুষ আছে আমরা তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারিনা অথচ তারা সারাক্ষণ আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চায় কিছু বলতে চায়। তারা অটিস্টিক।
১৯৭০ সালে হার্ভার্ডের একটি শিশু হাসপাতালে প্রথম একটি অটিস্টিক শিশু সনাক্ত করা যায়। শিশুটির ডাক্তার সবাইকে ডেকে বলেন, “তোমরা একটি অদ্ভুত শিশুকে দেখে যাও এ সুযোগ আর পাবেনা।” যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৬৬ জন শিশুর মাঝে একজন অটিস্টিক শিশু।

অটিস্টিকদের নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক ভুল ধারণা আছে। আমাদের স্বাভাবিক ধারণা তারা বুদ্ধিশূন্য বোধশক্তিহীন। তারা কিন্তু মোটেও তা নয়। স্বাভাবিকভাবে একটি অটিস্টিক শিশুকে দেখে মনে হয় সে আপনাকে দেখছেই না। অন্য জগতে আছে বা সে বুঝতে পারছেনা। আসলে সে কিন্তু সবই পারছে। আপনি তাকে বুঝতে পারছেন না ঠিক সেভাবে সেও আপনাকে বুঝতে পারছে না। অটিস্টিকদের সাথে যোগাযোগের কোন সঠিক পদ্ধতি এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

তাদের মস্তিষ্কের গঠনে কিছু ভিন্নতা আছে যা আমরা ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা বলি। তার জন্য তারা অন্যভাবে যোগাযোগ করে। অন্যভাবে বুঝে। অন্যভাবে তারা চায়। যেমন ধরুন কোন একটি ডিভাইস তার নিজস্ব প্রোগ্রামের জন্য যেভাবে একটি কাজ করে তেমনি প্রোগ্রামের ভিন্নতার কারণে অন্য একটি ডিভাইস একই কাজ ভিন্নভাবে করছে। এক্ষেত্রে হয়তো ডিভাইস দুটোর মধ্যে যোগাযোগ করানো গেল না। বিজ্ঞানীরা বলেন, অটিস্টিকদের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বেশি তারা বাইরে খুব কম যোগাযোগ করে। স্বাভাবিক মানুষ একটি কাজের জন্য মস্তিষ্কের যে অংশ ব্যবহার করে অটিস্টিকরা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এ কাজ অন্য অংশে করে। তাই আমরা যেভাবে কোন কিছু বুঝি বা চিন্তা করি তারা সেভাবে করে না অন্যভাবে করে। তাই তাদের সাথে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনা। এটি শুধু তাদের সমস্যা নয়, একদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমাদেরও সমস্যা। তাদের ভাবনার জগতটি সম্পূর্ণ রহস্যে আবৃত।

আমরা যদি একটি খরগোশের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি যেমন বিরক্ত হব তেমনি তারাও বিরক্ত হয়, আমরাও হই। তাদের বুদ্ধি বা বোধশক্তি মোটেও কম নয়। তারা শুনতে পায়, দেখতে পায়, তারা বুঝতে পারে, শুধু যোগাযোগটা করতে পারেনা। কথা বলতে পারলেও কথা বলতে চায় না। ধরুন আপনি এখন ঘুমিয়ে আছেন। এমন সময় কেউ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে আপনি বুঝলেও উত্তর দিতে পারছেন না বা চাইছেন না। ব্যাপারটি এত জটিল যে উদাহরণ দিয়ে বুঝানো বেশ কঠিন। আমাদের কাছে যে পরিবেশটি স্বস্তির তাদের কাছে তা খুবই অস্বস্তির। স্বাভাবিক আলো, বাতাস বা শব্দও তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠে। কিন্তু তারা এ কষ্ট প্রকাশ করতে পারেনা। ধরুন আপনাকে একটি মাইনাস থার্টি ডিগ্রী টেম্পারেচারের ঘরে রাখা হলো বা প্রচণ্ড তাপের মধ্যে রাখা হলো। আপনি সারাক্ষণ বলতে
চাইছেন আমাকে বাঁচাও বাঁচাও। কিন্তু বলতে পারছেন না। কেউ আপনাকে বুঝবে না। কি নিদারুণ কষ্টের একটি জীবন ভেবে দেখেছেন। বিজ্ঞানীরা অটিস্টিক শিশুদের রহস্যের সন্ধানে রয়েছেন।

টাইম ম্যাগাজিনে ২০০৬ সালে একটি অটিস্টিক শিশুর কথা লেখা হয়। মেয়েটি কথা বলতে পারেনা। লিখতে পারেনা, অনেক চেষ্টা করেও লেখাপড়া শেখানো যায়নি। বাবা-মা যখন তার হাল ছেড়ে দিয়েছে তখন একদিন তার ডাক্তার তার হাতে একটি কি-বোর্ড তুলে দিয়ে বলেন, তুমি কি বলতে চাও? সবাইকে হতবাক করে দিয়ে মেয়েটি লিখে ফেলল “মা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি”। শিশুটি অনেক চেষ্টা করেও তার মাকে এ কথা বলতে পারেনি। মেয়েটি যে ভাষা জানে তা কারও কল্পনাতেও ছিল না। তারপর থেকে কি-বোর্ড দিয়ে সে বাইরের জগতে যোগাযোগ শুরু করল। জানা গেল মেয়েটির ভাষার অনেক দক্ষতা রয়েছে। মেয়েটি কলেজে এলজেবরা আর জীববিজ্ঞান পড়তে শুরু করল। যে মেয়েটি কারও সাথে যোগাযোগ করত না জানা গেল তার অনেক রসবোধ রয়েছে। মেয়েটি এতই মেধাবী ছিল যে শুধুমাত্র শুনে শুনেই সব শিখে ফেলেছে। কিন্তু কিভাবে যোগাযোগ করতে হয় জানেনা বলে কেউ তার খোঁজ পায়নি।

অটিজম নিয়ে বিজ্ঞানীদের এক সময় ভুল ধারণা ছিল তবে তারা এখন বলছেন মস্তিষ্কের গঠনে ভিন্নতা বা অস্বাভাবিকতার কারণই হচ্ছে অটিজম। জন্মের সময় স্বাভাবিক আকার থাকলেও দু বছরের মধ্যেই তা দ্রুত বাড়তে থাকে। দেখা গেছে একটি চার বছরের শিশুর মস্তিষ্ক চৌদ্দ বছরের শিশুর মস্তিষ্কের সমান। মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অংশ তুলনামূলক ভাবে আকারে বড়। যেমন মস্তিষ্কের যে অংশটি বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশটি বড় হওয়ায় তারা স্বাভাবিকদের থেকেও বেশি বুদ্ধিমান। আবার যে অংশটি দুশ্চিন্তা বা ভয় নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য তাদের ভয়, দুশ্চিন্তা অনেক বেশি। কখনো কখনো সৃতি ধারণের অংশটি বেশ বড় হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা তারা বাইরে যোগাযোগ করতে পারেনা বলে সৃতির উপর বেশি নির্ভর করে বলে এ অংশটি বেশি বিকশিত হয়ে যায়।

অটিজমের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। কেউ কেউ শব্দ সহ্য করতে পারেনা। দুহাতে কান চেপে ধরে। কেউ কেউ কথা বলতে পারেনা বা বললেও সীমাবদ্ধ। কিছু কিছু খুব মৃদু (অমিশুক ও দুরন্ত শিশু) আবার অনেক ক্ষেত্রে খুব তীব্র হয় (কিছুই করতে পারে না পুরোপুরি অচল)। অটিজমে এ.এস.ডি. (অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার) শব্দটি দিয়ে এর বিশাল ব্যাপ্তিকে বুঝানো হয়। কেউ কেউ খুব কষ্ট করে সমাজে টিকে থাকতে পারে। কেউ কেউ কখনোই পারেনা। কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবে বড় হতে হতে হটাৎ অটিস্টিক হয়ে যায়। সাধারণত তিন বছর থেকে এ পরিবর্তন শুরু হয়। ছেলেদের এ সম্ভাবনা মেয়েদের থেকে ৪ গুণ বেশি।

অটিস্টিক শিশুদের কিছু বৈশিষ্ট্য হল তারা চোখাচোখি তাকাতে পছন্দ করেনা। ক্রমাগত শরীরের কোন অঙ্গ যেমন হাত বা পা নাড়াতেই থাকে। তারা যে কাজটি শুরু করে তা করতেই থাকে তাই তাদের নির্দিষ্ট বিষয়ে অনেক দক্ষতা থাকে। খেলাধুলা বা হৈচৈ করে আনন্দ প্রকাশ করে না। নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। রুটিনে বাধা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পরে এর ব্যতিক্রম হলে অশান্ত হয়ে পড়ে।

সম্ভব মেধাবী স্যাভান্ট।

মাত্র তিন বছরের শিশুর আঁকা ছবি।

প্রতি ১০০ জন অটিস্টিক শিশুর ভেতর দু একজন পাওয়া যায় যারা অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়। কেউ কেউ শত শত বছরের হাজার হাজার দিনের মধ্যে যেকোনো তারিখ বা সে তারিখে কি বার তা বলে দিতে পারে। কেউ কেউ অস্বাভাবিক স্মৃতি ধারণের ক্ষমতা রাখে। কেউ খুব ভাল ছবি আঁকে। কেউ সঙ্গীতে অসাধারণ প্রতিভা রাখে। কেউ একবার শুনেই পিয়ানোতে তার সুর তুলে ফেলে। এদেরকে স্যাভান্ট (Savant) বলে।

রেইনম্যান ছায়াছবিতে ডাস্টিন হফম্যান এরকম একজন স্যাভান্টের ভূমিকায় অভিনয় করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। আপাত দৃষ্টিতে বুদ্ধিহীন বোধশক্তিহীন অসম্ভব ক্ষমতাধর এই শিশুগুলো বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

কৃতজ্ঞতায়: মুহম্মদ জাফর ইকবালের “অটিজম” প্রবন্ধের আলোকে তৈরি।

আরিফ হোসেন সাঈদ
২রা এপ্রিল ২০১২