ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

 

নববর্ষ দিনে আজ চিত্তে বাজে গভীর সঙ্গীত
নূতন উঠিছে স্ফুরি দিশে দিশে জাগিছে সুন্দর।
নবশ্যাম তৃণ দলে তরু শিরে কাঁপে থর থর
নবীনের আবির্ভাব স্পর্শ করি অন্তর নিভৃত।
– সূফী মোতাহার হোসেন

এই বাংলায় পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য তুলে ধরতে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়না। আবহমানকাল থেকে বাংলায় এ দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। এ দিনটি কোটি বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব। একটি দিন দিয়ে যদি বাংলা আর বাঙ্গালী জাতিকে তুমি চিনতে চাও তবে বাংলা নববর্ষে তোমার নিমন্ত্রণ রইল। গায়ের বধূরা যখন দল বেঁধে মেলায় যাবে বটের ছায়ায় তাদের জন্য অপেক্ষা করো। চারিদিকে যখন সবুজের মেলা তার ভেতর প্রচণ্ড তাপ দাহে পহেলা বৈশাখ বাংলার ঘরে ঘরে এক প্রশান্তির ছাপ নিয়ে আসে।

বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ পালিত হয়। নববর্ষ বাঙ্গালীর এক সার্বজনীন লোকউৎসব। এদিন সরকারী-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

একসময় বাংলায় নববর্ষ পালিত হত আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন কৃষির সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কারণ কৃষিকাজ ছিল বিশেষ ঋতু নির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার জন্যই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন। বাংলা সন কার্যকর হয় তার সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চন্দ্রাসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে “ফসলি সন” নামে ও পরে “বঙ্গাব্দ” নামে পরিচিত হয়।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় আকবরের সময় থেকেই। তারপর থেকে মুগলরা জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতেন। সেসময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখর হয়ে উঠে যা বাংলায় শুভদিন হিসেবে পালিত হয়।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠান আজো পালিত হয়।

নববর্ষ উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রাম বাংলায় মানুষের কাছে এ দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষের দিনে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে সকালে স্নান করে পূত-পবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভাল খাওয়া, ভাল থাকা আর ভাল পড়তে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গল জনক মনে করেন। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবদের আগমন ঘটে। মিষ্টি, পিঠা-পায়েস সহ নানা লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার মাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিময় হয় যা শহরে এখন বহুল প্রচলিত।

নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তুলে বৈশাখী মেলা। অত্যন্ত আনন্দঘন এ মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোক শিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সকল প্রকার হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী পাওয়া যায়। এছাড়া শিশুদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী, বিভিন্ন লোকজ খাবার যেমন চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ইত্যাদি পাওয়া যায়। মেলায় বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গান সহ লোকসঙ্গীত, বাউল, মারফতি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি উপস্থাপন করেন। বায়স্কোপ, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, নাটক, পুতুল নাচ, নাগরদোলা ও সার্কাস মেলার আকর্ষণ। এছাড়া লইলি-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও থাকে।

বৈশাখী মেলার উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো: নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং, মণিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি-বটতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপাড়া, মুজিবনগর ইত্যাদি এলাকা।

ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গির স্নানকাটা মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া দিনাজপুরের ফুলতলী, রাণীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবে রূপ নিয়েছে।

কালের বিবর্তনে অনেক পুরনো অনুষ্ঠান উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে আর তার জায়গা দখল করেছে নতুন নতুন উৎসব। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, পুণ্যাহ, ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো, মুন্সিগঞ্জের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা, ঘোড় দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকা বাইচ, বহুরূপী সাজ ইত্যাদি আর দেখা যায়না। বর্তমানে চট্টগ্রামের বলী খেলা রাজশাহীর গম্ভীরা বেশ জনপ্রিয়।

নগরে পহেলা বৈশাখের উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে নববর্ষের শুরু হয়। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোন বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যূষে নগরবাসী সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা, কপালে টিপ পড়ে। ছেলেরা পাজামা-পাঞ্জাবী আবার কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবী পড়ে। এদিন শহরে পান্তা-ইলিশ খাওয়া ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। শহরে “মেলায় যাইরে” গানটি এ দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এভাবে নগরবাসী ঐতিহ্যকে রক্ষা করে।

“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক-
যাক পুরাতন স্মৃতি
যাক ভুলে যাওয়া গীতি
আশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক”
– শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সকালে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” এর মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করে নেয়। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও চারপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয় যা জাতীয় বন্ধন সৃষ্টি করে। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়ানট এ উৎসব শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে, শহীদ মিনার ও টিএসসি প্রাঙ্গণে উৎসবের ঢল নামে। এছাড়া এদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য মিছিল, বৈশাখী মেলায় কোটি প্রাণের সঞ্চার ঘটে। এছাড়া সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এদিনে বাংলা একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বি.এস.সি.আই.সি), নজরুল একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন সহ দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙ্গালী সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতায় প্রতিবাদ সরূপ বৈশাখের প্রথম দিনে ছায়ানট রমনার বটমূলে নববর্ষ অনুষ্ঠান পালন করে। তারপর থেকে বিপুল জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙ্গালী আদর্শ লালনে বিপুল উৎসাহের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়।

বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি মেলা উপলক্ষে রাঙ্গামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়ির উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সামাজিক উৎসব “বৈসাবি” পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই ও ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য অঞ্চলে তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দুদিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন নিয়ে তিনদিন এ বর্ষবরণ উৎসব “বিজু” পালিত হয়। পুরাতনকে বিদায় এবং নতুনকে বরণ করে নিতে সেই আদিকাল থেকে পাহাড়িরা এ উৎসব আয়োজন করে আসছে। এ উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়। এ দিন মারমারা ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলার আয়োজন করে। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক বিশ্বাসে তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেয়।

তিনটি ধাপে বৈসাবি উদযাপন করা হয়। প্রথম দিনটির নাম ফুলবিজু। এদিনে শিশু কিশোররা ফুল দিয়ে বাড়িঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটির নাম মরুবিজু। এদিনেই মূল অনুষ্ঠান হয়। এদিন নানান রকম সবজি দিয়ে পাজন নামের এক সুস্বাদু খাবার (নিরামিষ) রান্না করা হয়। এদিনে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও মিষ্টান্ন থাকে।

অতিথিদের জন্য এ দিন সবার ঘরের দোয়ার খোলা থাকে।

কৃতজ্ঞতায়: বাংলা পিডিয়া।
আরও দেখুন:
বাংলা বর্ষপঞ্জি