ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

একজন সঙ্গীত অনুরাগী হিসেবে আপনি যদি বাংলা সঙ্গীত সম্পর্কে জানতে চান প্রথমে আপনাকে বাংলাপিডিয়া’র আশ্রয় নিতে হবে। বাংলাপিডিয়া’য় ভারতীয় উপমহাদেশের ‘সঙ্গীত’ সম্বন্ধে প্রথম ও মূল লেখাটির লেখক মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। এটি বাংলাপিডিয়া’য় সঙ্গীতের প্রথম, তথ্যবহুল ও গবেষণাধর্মী একমাত্র পূর্ণাঙ্গ লেখা। যদি জিজ্ঞেস করা হয় উপমহাদেশের একজন সংগীতজ্ঞের নাম বলুন তাহলে বলতে হবে মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী, এখানে আর অন্য কোন সুযোগ নেই। মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীকে যদি বাংলা সঙ্গীত থেকে শুরু করে উপমহাদেশের সঙ্গীতের মহান বিশেষজ্ঞ বা কিংবদন্তি বলা হয় তবেও কম বলা হবে, এগুলো তাঁকে প্রকাশ করার জন্য কোন ভাষা নয় তাঁকে একজন গান পাগল মানুষ বলতে পারেন। আজীবন তিনি গানের পেছনে ছুটেছেন। প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কি.মি গতিতে ছুটে যাওয়া পৃথিবীও জানেনা এমন সন্তান কজন

সে জন্ম দিয়েছিল তাঁর বুকে আরো এমন একটি সন্তান জন্মাবে কিনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের এই প্রতিষ্ঠাতা ১৯৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা, লোক ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের উপর পিএইচডি করেন। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া এই শক্তিমান মহান পুরুষ ১৫ই আগস্ট ২০১১ তারিখ সকাল বেলা বিনা চিকিৎসায় মারা যান!

তাঁর মৃত্যুর কারণ: গত ১৩ই আগস্ট ডায়রিয়া-জনিত কারণে তিনি অসুস্থ হলে পরদিন তাঁর শরীর খুব খারাপ করে। রবিবার তাঁকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীর ল্যাব-এইড হাসপাতালে সকাল ১০ টায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সকাল ১১ টায় তিনি মারা যান। এই এক ঘণ্টা তাঁকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রাথমিক কোন চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানান আনুষ্ঠানিকতার নামে এক ঘণ্টা তাঁকে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখে এবং এই এক ঘণ্টা তাঁকে কোন চিকিৎসা না দেয়ায় দ্রুত তাঁর মৃত্যু হয়।– ডাঃ নির্ঝর ভট্টাচার্য।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: ডায়রিয়া-জনিত কারণে ডাঃ মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর পানিশূন্যতা ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল সঙ্গে তাঁর বমি হচ্ছিল। দ্রুত তাঁর মৃত্যু হয়। বিলম্ব কিছুটা হয়ে থাকলে আনুষ্ঠানিকতার জন্যই হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া: তাঁর মৃত্যুর পর বিকেল তিনটায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। এসময় সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নাসির উদ্দিন ইউসুফ, মফিদুল হক, গোলাম কুদ্দুছ, হাসান আরিফ, আবৃত্তিকার কাজী আরিফ, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী তপন মাহমুদ, সাদী মহম্মদ, সাজেদ আকবর, রবীন্দ্রনাথ রায়, ফকির আলমগির, নৃত্যশিল্পী শর্মিলী বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্বাচন কমিশনের সচিব কবি মোহাম্মদ সাদিক, বিচারপতি মিফতাউদ্দিন রুমি সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ও ডাঃ মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এসময় সেখানে একটি আবেগ ঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

বিশ্লেষণ: প্রতিটি হাসপাতালে একটি জরুরী বিভাগ থাকে এবং সেখানে সবসময় (২৪ ঘণ্টা) ডাক্তার থাকেন এমারজেন্সী (তৎক্ষণাৎ) চিকিৎসা দানের জন্য। প্রতিটি রোগী হাসপাতালে আসার প্রথমেই জরুরী বিভাগে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী বা জরুরী চিকিৎসা দেয়া হয়। জরুরী চিকিৎসার পাশাপাশি চলে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা। এটিই হাসপাতালের নিয়ম। টাকা বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য জরুরী চিকিৎসা কখনো বন্ধ করা যাবে না।

আমি নিজের প্রয়োজনে বহুবার হাসপাতালে গিয়েছি এবং সেখানে টাকা বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য আমার জরুরী বা প্রাথমিক চিকিৎসা কখনো থেমে থাকেনি। সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও এই নিয়ম প্রচলিত।
সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসায় স্যালাইন দেয়া হয় সাথে প্রয়োজন বোধে অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়া হয়। হাসপাতালে দুটি কারণে কখনো টাকা বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা থেমে থাকেনা।

১. প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যয় অতি সামান্য। এ টাকার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিরাট লসের মুখে পড়তে হয়না। তাছাড়া রোগীর আত্মীয় স্বজনরা সামান্য কিছু টাকার জন্য তাঁকে ফেলে চলে যাবে না।
২. ধরে নিলাম মাত্র ২০০ বা ৩০০ বা ঊর্ধ্বে ৫০০ টাকার জন্য রোগীর আত্মীয় স্বজনরা টাকা পরিশোধ না করেই রোগীকে ফেলে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কি করণীয়?

ঔষধ বিজ্ঞানের প্রাক্তন ছাত্র শরীফ হোসেন এ বিষয়ে একটি সুন্দর উত্তর দিয়েছেন। “হাসপাতাল তো কোন কসাইখানা না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই রিস্ক নিয়েই হাসপাতাল চালাতে হবে।”

আমার মত অভাগা যদি পকেটে একটি টাকা না নিয়ে হাসপাতালের জরুরী চিকিৎসা নিতে পারে তবে কি দোষ করেছিল ডাঃ মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী? এটাই কি তাঁর অপরাধ ছিল যেখানে অনেকে নিরাপত্তা, ধর্মীয় বা অন্যান্য কারণে ভারতে চলে যান সেখানে তিনি ভারত থেকে আবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, এ মাটিকে ভালবেসে?

আরিফ হোসেন সাঈদ
৭ই এপ্রিল ২০১২
কৃতজ্ঞতায়: কালের কণ্ঠ, ১৬ আগস্ট ২০১১, বাংলাপিডিয়া