ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

একদল মাঝি নিয়ে একেকটি দল গঠিত হয়। এমন অনেকগুলো দলের মধ্যে নৌকা দৌড় বা নৌকা চালনা প্রতিযোগিতাই হল নৌকা বাইচ। ফারসি শব্দ বাইচ’এর অর্থ বাজি বা খেলা। নৌকার দাঁড় টানা ও নৌকা চালনার কৌশল দিয়ে প্রতিযোগীরা জয়ের জন্য খেলেন বা বাজি ধরেন। সাহসী মাঝিরা নৌকা নিয়ে বাজি ধরতে ভালবাসেন। তারা নৌকা নিয়ে তীরের বেগে ছুটে যান। তখন তাদের দেখলে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ বলে মনে হয়। তাদের চোখে মুখে যে ক্ষিপ্ততা থাকে তা দেখলে যে কারোই জয়ের বাসনা চেপে বসবে। জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার দূরত্ব ৬৫০ মিটার। প্রতিটি নৌকায় ৭, ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝি থাকতে পারেন।

বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা বাইচের দৃশ্য। ছবি: আমানুল হক

নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ আয়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সবকিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংস্করণ আমাদের নৌকা বাইচ। এক সময় আমাদের যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। নৌশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিভিন্ন শিল্পকেন্দ্র। এসব শিল্পে যুগ যুগ ধরে তৈরি হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগর। এভাবে একসময় বিভিন্ন নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

কারুকার্য, গঠন এসবের দিকে তাকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার নৌকাগুলোর মধ্যে বৈচিত্রতা দেখা যায়। একেক অঞ্চলের নৌকা বাইচের জন্য একেক রকমের নৌকার প্রচলন রয়েছে। যেমন ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ এ অঞ্চলগুলোতে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠন সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। কোশা নৌকার সামনের ও পেছনের অংশ একেবারে সোজা। কোশা নৌকা তৈরিতে শাল, শীল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি গাছের কাঠ ব্যবহৃত হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনায় নৌকা বাইচে সরু ও লম্বা ধরনের ছিপ জাতীয় দ্রুতগতি সম্পন্ন নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠনও সাধারণত সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। এর সামনের দিকটা পানির সাথে মিশে থাকে আর পেছনের অংশটি পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এই নৌকায় সামনের ও পেছনের মাথায় চুমকির বিভিন্ন কারুকার্য থাকে। ছিপ জাতীয় বাইচ নৌকা তৈরিতেও শাল, গর্জন, শীল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি গাছের কাঠ ব্যবহৃত হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর আকারও কোশা ও ছিপ জাতীয় বাইচ নৌকার মতই সরু লম্বায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট তবে এর প্রস্থ একটু বেশি ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত হয়। এর সামনের ও পেছনের দিকটা পানি থেকে দু তিন ফুট উঁচু থাকে এবং মুখটা হাঁসের মুখের মতো চ্যাপ্টা হয়। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের জন্য সাম্পান ব্যবহৃত হয়। সাম্পান দেখতে জাহাজের মতো। ঢাকা ফরিদপুরে ব্যবহৃত হয় গয়না নৌকা। গয়না দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০ ফুট থেকে ১২৫ ফুট মাঝখানে ৮ থেকে৯ ফুট প্রশস্ত। এর সামনের দিকটা পানি থেকে ৩ ফুট ও পেছনের দিকটা পানি থেকে ৪, ৫ ফুট উঁচু হয়।

তবে লোকমুখে নৌকা বাইচ আবির্ভাবের ইতিহাস নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। যেমন, আঠার শতকের শুরুর দিকে কোন এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পাড়ে থেকে অন্য পাড়ের ভক্তদের তার কাছে আসার আহ্বান করেন। কিন্তু ঘাটে কোন নৌকা ছিল না। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হল। নদী ফুলে ফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশের যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুতে আসেন। তখন নৌকার সারিগুলো একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছিল। এ থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়। আবার আরেকটি মিথে আছে, শ্রী জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার সময় স্নান যাত্রীদের বহনকারী নৌকাগুলো নিয়ে মাঝি মাল্লারা পাল্লা দিতেন। এতে যাত্রীরা আনন্দ পেতেন যা থেকে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠানের উৎপত্তি ঘটে।
মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহদের আমলে নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌ বাহিনী থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল ছিল নৌ শক্তি। বাংলার বার ভূঁইয়ারা নৌ বলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌ শক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকত। বর্তমানে নৌকা কেন্দ্রিক নৌবাহিনী নেই। নেই সেই দূর্বার গতিতে ছুটে চলা দীর্ঘাকার নৌকাগুলো কিন্তু আজও এদেশের মানুষ নৌকা বাইচ দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়। নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের সমর শক্তির আভাস পায়।

বাংলাদেশে প্রধানত ভাদ্র-আশ্বিন মাসে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হয়। নৌকা বাইচে সকল মাঝি মাল্লারা তালে তালে এক সুরে গান গেয়ে ছুটে চলেন। ঢোল ও করতালের সাথে সাথে সেখানে এক অন্য রকম উদ্যমের সৃষ্টি হয়। সে উদ্যম ছড়িয়ে পড়ে মাঝি মাল্লাদের মাঝে। ক্ষিপ্র গতির এই নৌকাগুলোর বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। যেমন, অগ্রদূত, ঝরের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুন, তুফান মেল, সোনার তরী, দীপরাজ ইত্যাদি।

নৌকায় ওঠার আবার অনেক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সকলে পাক-পবিত্র হয়ে গেঞ্জি গায়ে মাথায় একই রঙের রুমাল বেধে নেয়। সবার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। দাঁড়িয়ে থেকে নৌকা চালান পেছনের মাঝিরা। নৌকার মধ্যে ঢোল তবলা নিয়ে গায়েনরা থাকেন। তাদের গানগুলো মাঝিদের উৎসাহ আর শক্তি যোগায়।

বাংলাদেশের নৌকা বাইচের উন্নয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ বোয়িং ফেডারেশন। সনাতন নৌকা বাইচ ও বোয়িং এর মধ্যে তারা সমন্বয় সাধন করেন। এ ফেডারেশনটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বোয়িং ফেডারেশনের সদস্য। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। নৌকা বাইচকে উৎসাহ প্রদান ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য প্রতি বছর আমাদের দেশে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। যেমন, ড্রাগন বোট রেস, বোয়িং বোট রেস, সোয়ান বোট রেস, কাইয়াক ও কেনীয় বোট রেস ইত্যাদি।

কৃতজ্ঞতা: বাংলাপিডিয়ায় এস. এম. মাহফুজুর রহমানের প্রবন্ধ অবলম্বনে।

আরও দেখুন:
বাংলা বর্ষপঞ্জি
চৈত্রসংক্রান্তি মেলা
এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ