ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

আবু সুফিয়ানের সাথে যেদিন আমার প্রথম দেখা সেদিন তিনি খুব পরিচিত মানুষের মত কথা বলছিলেন। প্রথম দেখাতেই তিনি একটি কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করে বসলেন, “প্রেম করেছিলেন?”। আবু সুফিয়ানের প্রথম গুণ হল তিনি সবার সাথে সহজেই মিশে যান। এমনভাবে কথা বলেন যেন বহু দিনের বান্ধব। একটু পর পর চা খান। আর খুব সুন্দর করে কথা বলেন। আবু সুফিয়ান এমন একজন মানুষ, আপনি তাঁর উপর যতই রাগ করেন তাঁর সঙ্গে দেখা হলেই সব ভুলে যাবেন। উনার একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে। তিনি যেমন চারপাশের মানুষগুলোকে আপন ভাবেন তেমনি চারপাশের মানুষগুলোও তাঁকে খুব আপন ভাবে। সারা ঢাকা শহর তিনি ২৪ ঘণ্টা হেটে বেড়ান। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে কালো বাহিনীর দেখা হয়। তখন তাদের মধ্যে যে ধরণের কথা হয় –
কালো বাহিনী: চলেন আমাদের সাথে।
আবু সুফিয়ান: যদি চা খাওয়ান তবে যেতে পারি।
কালো বাহিনী: খুব ভাল চা খাওয়াব আপনাকে।
আবু সুফিয়ান: হি: হি: সত্যি!
মাথায় রাজ্যের রোদ পিঠে কাল ব্যাক-প্যাক, সস্তার টি শার্ট আর জিন্স পরা কোন চির যুবা পুরুষের সাথে আপনার দেখা হয়ে যেতে পারে। খুব ভাল করে তাকিয়ে দেখবেন আপনার মায়া লাগে কিনা। যদি মায়া লাগে তাঁর কাছে যাবেন। দেখবেন তাঁর ব্যাক-প্যাকটি ছিঁড়া। তিনিই আমাদের সুফিয়ান ভাই। যদি জিজ্ঞেস করেন আপনার ব্যাগে কি আছে। তিনি এক গাল হেসে উত্তর দিবেন – ব্যাগে কিছু নাই।
সোহেল মাহমুদের ফোনে জানতে পারলাম ডয়চে ভেলে’র ব্লগ অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় “রিপোর্টার্স উইথাউট বর্ডার্স অ্যাওয়ার্ড” ক্যাটাগরিতে আমাদের আবু সুফিয়ান ভাই জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এই ক্যাটাগরির পুরষ্কারটি এই প্রথম কোন বাংলা ভাষাভাষী ব্লগার পেল। আনন্দের সংবাদটি আমি প্রথম আমার ছোট বোনকে জানালাম। আমি বললাম – আবু সুফিয়ান … পুরষ্কার পেয়েছেন। সে বলল – পাবেই তো। আবু সুফিয়ানই প্রথম বাংলাদেশী ও প্রথম বাঙ্গালী যিনি ডয়চে ভেলের এই পুরষ্কারটি অর্জন করেছেন। ডয়চে ভেলে’র ব্লগ অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় মোট ১৭ টি ক্যাটাগরির ৬ টি হল মূল ও মিশ্র বিভাগ যেখানে বিভিন্ন ভাষার ব্লগারদের মধ্যে কঠোর প্রতিযোগিতা চলে। তার মধ্যে “রিপোর্টার্স উইথাউট বর্ডার্স অ্যাওয়ার্ড” ক্যাটাগরিতে বাংলা সহ মোট ১১ টি দেশের আরবি, চীনা, জার্মান, ইংরেজি, ফরাসি, ইন্দোনেশীয়, ফার্সি, পর্তুগিজ, রুশ ও স্প্যানিশ ভাষার ব্লগের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১২ জন জুরির বিবেচনায় এ পুরষ্কার পেয়েছেন বাংলার এই আপোষহীন সন্তান।
কেউ হয়তো বলবে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বা কেউ হয়তো বলবে প্রথম বাঙ্গালী হিসেবে আবু সুফিয়ান এই জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। আমরা কিন্তু বলি ‘আমাদের আবু সুফিয়ান ভাই’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। সুফিয়ান ভাইয়ের উপর আমাদের একটি আলাদা অধিকার রয়েছে। আমরা একটি বিশাল শক্তির ছোট পরিবারের সদস্য। আমরা সবাই ন্যায় বিচারের দাবিতে এগিয়ে চলা একটি আন্দোলনের অংশ যার অগ্রভাগে রয়েছেন আবু সুফিয়ান। সুতরাং অন্য সবার থেকে আমাদের আনন্দানুভূতিটা অনেক বেশি। আর এই পুরষ্কার জয়েরও অন্যতম প্রধান কারণ সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদে বিচারের দাবিতে এগিয়ে চলা আমাদের আন্দোলন। সুতরাং জয় শুধু সুফিয়ানের হয়নি জয়ী হয়েছেন অসংখ্য সুফিয়ানরা। যারা স্লোগান দেয় “চলছে লড়াই চলবে – ব্লগাররা লড়বে।”
বাংলাদেশের গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখে চলেছেন ব্লগার ও সাংবাদিক আবু সুফিয়ান। এ বিষয়ে ডয়চে ভেলেতে বলা হয়, “অনুসন্ধানী নিবন্ধ লিখে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন, বার বার। তবুও অন্যায়ের প্রতিবাদে তাঁর অবস্থান অনড়।”
জুরিমণ্ডলীর বাংলা ভাষাভাষী সদস্য ডাঃ শহীদুল আলম মনে করেন, আবু সুফিয়ানকে মূল্যায়ন দেয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হবে। তিনি মনে করেন, এতে সরকারের জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে। বাংলা ভাষাভাষী ব্লগাররা দিন দিন সচেতন হয়ে উঠছে বলেও মনে করেন ব্লগিং জগতের এই পথিকৃৎ।
ডাঃ শহীদুল আলম বলেন, এই পুরষ্কার পাওয়ার পেছনে সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে ব্লগারদের প্রতিবাদ কর্মসূচি একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই পুরষ্কারের ফলে আবু সুফিয়ানের লেখা বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে বলেও মনে করেন এই আলোক চিত্রশিল্পী।
২০০৪ সালে শুরু হওয়া ডয়চে ভেলে’র ব্লগ অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় ২০০৯ সালে বাংলা ব্লগ অংশগ্রহণ করে। ২০১২ সালের পর্বের এই প্রতিযোগিতাটির ভোট গ্রহণ ২রা এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত চলে। ২৬ জুন জার্মানির বন শহরে আয়োজিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে পুরষ্কার বিজয়ীদের মাঝে এই জুরি অ্যাওয়ার্ড তুলে দেয়া হবে।
আরিফ হোসেন সাঈদ,
৩রা মে ২০১২,
তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে