ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১২, ‘বাংলাদেশ-ভারত’ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরার পথে মিজানুর রহমান (৩২) নামের এক বাংলাদেশী যুবককে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ‘বিএসএফ’ নির্যাতন করে চোখ উপড়ে ফেলে এবং বিএসএফ’ এর নির্যাতনের কারণে পরে তিনি মারা যান বলে অনানুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে নিহত মিজানুর রহমান পেশায় একজন রিক্সা চালক ছিলেন। তিনি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার পশ্চিম খোদাইপুর গ্রামের মোঃ মজিবর রহমান ও মোসাম্মৎ গোলসেয়ারা বেগমের ছেলে।

মিজানুর রহমান বিবাহিত। তাঁর স্ত্রীর নাম মোসাম্মৎ ইসমত আরা (২৩)। তাদের পাঁচ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

মিজানুরের স্ত্রী ইসমত আরা জানান, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ বিকাল ৪ টার পর মিজানুর রহমান বাই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে যান এরপর আর ফেরেননি। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২, তিনি জানতে পারেন মিজানুর আহতাবস্থায় হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। মিজানুরের সঙ্গীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মিজানুর সঙ্গীদের সঙ্গে ভারতে যায়। ফেরার পথে আগ্রা ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। সবাই ফিরে এলেও মিজানুর ধরা পরে যায়। এসময় মিজানুরের সঙ্গীরা বিএসএফ কর্তৃক মিজানুরকে আঘাত করার দৃশ্য দেখতে পান। সঙ্গীরা মিজানুরের স্ত্রীকে জানায়, পরে ভোর বেলায় তারা আবারও ঐ এলাকায় গেলে মরণাপন্ন অবস্থায় মিজানুরকে খুঁজে পান। সঙ্গীরাই তাঁকে হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। ইসমত আরা হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জরুরী বিভাগে মিজানুরের লাশ সনাক্ত করেন। তিনি জানতে পারেন, হাসপাতালে আনার পরপরই মিজানুর মারা যান। পরে হাকিমপুর থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা এসে তাঁর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়না তদন্তের জন্য লাশ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠান।
নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে হাকিমপুর থানায় অজ্ঞাত নামা ব্যক্তিদের আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর- ১৬, তারিখ ১৪-০২-১২, ধারা- ৩০২/৩৪ দ- বিধি। মামলাটির তদন্ত চলছে।

যা ঘটেছিল সেদিন-

আবুল মিয়া-৩৪ (ছদ্ম নাম) একজন বাংলাদেশী গরু ব্যবসায়ী। ভারত থেকে গরু এনে সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে বৈধ করে বাজারে গরু বিক্রি করেন। তিনি জানান, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ ভারতের গঙ্গারামপুর জেলার হিলি থানার আবতৈর গ্রামের হাবলু মিয়া ডাক নাম বঙ্গে মিয়া তাঁকে জানায়, বঙ্গে মিয়ার কাছে গরু আছে। আবুল মিয়াকে তিনি রাতেই গরুগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসতে বলেন। নিহত মিজানুর রহমান ও আবুল মিয়াসহ ৫ জনের একটি রাখাল দল গরু নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার সময় আগ্রা ক্যাম্পের ৫ জন বিএসএফ সদস্য তাদের ধাওয়া করে। তাদের মধ্যে মিজানুরকে বিএসএফ সদস্যরা ধরে ফেলে বাকিরা চলে আসতে সক্ষম হন। পরে ঐ ৫ জনের রাখাল দলের সদস্য কাশেম হাওলাদার-২০ (ছদ্ম নাম) আবুল মিয়াকে জানান, তারা ছুটে পালানোর সময় তিনি দেখতে পান বিএসএফ সদস্যরা মিজানুরকে ধরে ফেলেছে আর উপর্যুপরি আঘাত করছে। পরে তারা আবার মিজানুরের খোঁজে ভারতের ঐ এলাকাটিতে গেলে দেখতে পান মিজানুর মরণাপন্ন অবস্থায় পরে আছে তাঁর ডান চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। তাদের ধারণা বিএসএফ সদস্যরা বেয়নেট দিয়ে মিজানুরের চোখ উপড়ে ফেলেছে। তখন কাশেম হাওলাদার ও করিম (ছদ্ম নাম) মিজানুরকে কাঁধে করে বাংলাদেশের ঘাসুড়িয়া গ্রামে নিয়ে আসেন। বঙ্গে মিয়া ভারতে চলে যান। তখন আবুল মিয়া অন্যদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে ভারতের হিলি থানার হাড়িপুকুর গ্রামের দিলদার হোসেন ও বাংলাদেশের হাকিমপুর থানার বাগমারা গ্রামের মোতালেব মিয়া (ছদ্ম নাম) মিজানুরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিলেন।

রাখাল দলের অন্য সদস্য কাশেম হাওলাদার-২০ জানান, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তাঁর সামনেই বিএসএফ সদস্যরা মিজানুরকে হত্যা করে। পুলিশ ও বিজিবি নানাভাবে তাঁকে হয়রানি করছে কারণ দেখিয়ে এর বেশি তিনি জানাতে রাজি হননি।

করিম উদ্দিন-৩৫ (ছদ্ম নাম), পেশায় ভ্যান চালক। তিনি জানান, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ ভোর আনুমানিক ৫টায় বাগমারা গ্রামের মোতালেব মিয়া ও ভারতের হাড়িপুকুর গ্রামের গরু ব্যবসায়ী দিলদার হোসেন এসে তাঁকে ডেকে ঘুম থেকে তোলে। বাইরে এসে তিনি দেখতে পান ঘাসুড়িয়া গ্রামের রাস্তায় একজন আহত লোক মাটিতে পড়ে আছে। ভারতের দিলদার তাঁকে বলেন, এর নাম মিজানুর, বিএসএফ সদস্যরা তাঁকে মেরেছে। তখন তিনি দেখতে পান মিজানুরের চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। দিলদার তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। মিজানুরকে করিম উদ্দিন ভ্যানে করে হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তিনি বলেন সে সময় মিজানুর শুধু বলছিল, ‘আমাকে বাচাও, আমাকে বাচাও’। তিনি ধারণা করেন, হাসপাতালে যাওয়ার পর মিজানুর মারা যান।

হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ড বয় মোঃ মোজাহার আলী জানান, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ আনুমানিক ভোর ৫.৩০টায় দুজন লোক গুরুতর আহত এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি ডাক্তারকে ডাকতে যান। এসে দেখতে পান, আহত লোকটির ডান চোখ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছে। এবং ক্ষতস্থান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। ডাঃ হাসিবুর রহমান এসে লোকটিকে মৃত ঘোষণা করেন। পড়ে আনুমানিক ৬.৩০তায় এক মহিলা এসে লোকটিকে তাঁর স্বামী বলে সনাক্ত করেন। মহিলাটি জানান, তাঁর স্বামীর নাম মিজানুর রহমান।

হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডাঃ গোলামুর রহমান জানান, তিনি এসে মিজানুরকে মৃত দেখতে পান। তাঁর ধারণা মিজানুরের ডান চোখ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছে যার ফলে চোখে আঘাত করার সময় মাথার ভেতরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। পরে হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ আতিকুল হক থানা পুলিশকে বিষয়টি জানান। হাসপাতালের রেজিস্টার খাতায় মৃত ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৪৭৯/০১।

হাকিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাঃ আতিকুল হক তাঁকে জানায়, হাসপাতালে অজ্ঞাত নামা একটি লাশ রয়েছে। খবর পেয়ে তিনি এসআই মোঃ আবু বকর সিদ্দিককে হাসপাতালে পাঠান। এসআই মোঃ আবু বকর সিদ্দিক তখন লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠান। ঐ সময় মিজানুরের ডান চোখ উপড়ানো ছিল এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, বিএসএফ উপর্যুপরি আঘাত করে মিজানুরকে হত্যা করেছে। তিনি জানান, নিহতের স্ত্রী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে এবং ময়না তদন্তের রিপোর্ট তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।

হাকিমপুর থানার এসআই মোঃ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তিনি অফিসার ইনচার্জ মোঃ হেলাল উদ্দিনের কথামত হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডান চোখ উপড়ানো এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুপ্ত আঘাত থাকতে পারে। লাশের সঙ্গে থাকা মহিলাটি নিহতের স্ত্রী পরিচয় দেন এবং অজ্ঞাত নামা ব্যক্তিদের আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

বিজিবি ৩, মংলা বিশেষ ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার হান্নান জয়পুরহাট থেকে বলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ৭টায় এলাকার স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নির্যাতনের খবর শোনে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন আগ্রা ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা রাত আনুমানিক ৩.৩০টায় সীমান্তের ২৮৮ পিলার বরাবর ভারতের ভেতরে মিজানুরকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ উপড়ে ফেলেছে এবং হাসপাতালে মিজানুর মারা যান।

বিজিবি ৩, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ মেহেদী হাসান, জয়পুরহাট থেকে জানান, সীমান্ত ফাঁড়ীর মাধ্যমে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নির্যাতনের খবর তিনি জানতে পেরেছেন।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের লাশের ময়না তদন্তকারী ডাঃ মীর হামদে সামে বলেন, পুলিশ সদস্যরা তাঁকে জানায় বিএসএফ’ এর নির্যাতনে মিজানুর মারা গেছেন। তিনি এবং ডাঃ খায়রুল আলম, ডাঃ আমির উদ্দিনকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি বোর্ড লাশের ময়না তদন্ত করে। ময়না তদন্ত নম্বর ১৮/১২। তিনি জানান, মিজানুরের ডান চোখ ছিল না, ডান চোয়াল, কান, দাঁতের মাড়ি থেঁতলানো ছিল। চোয়ালের গভীর ক্ষত দিয়ে মাথার মগজ বেরিয়ে আসে। মিজানুরের মাথায় আঘাত পাওয়াকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ময়না তদন্তে উল্লেখ করা হয় বলে তিনি জানান।

বি.দ্র.- জানা গেছে সাক্ষ্যদানকারীগণ নানাভাবে বাংলাদেশ পুলিশের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাই তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: অধিকার