ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

রাজধানীর চকবাজার থানা পুলিশ বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উজান চরনওপাড়া গ্রামের এক শিশুকে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উজান চরনওপাড়া গ্রামের সুফিয়া বেগম ঢাকার চকবাজার এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিনি তার নিজ গ্রাম উজান চরনওপাড়ার জালাল উদ্দিনের মেয়ে আকলিমাকে ঢাকার চকবাজারের জয়নাগ রোডের ২২/খ নম্বর বরকত মুন্সীর বাড়িতে ২০০৯ সালের ২০ আগস্ট গৃহকর্মীর কাজ দেন। পরে একই গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে সুমনকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে বরকত মুন্সীর জয়নাগ রোডের ২২/খ নম্বর বাড়িতে আকলিমার সঙ্গে গৃহকর্মীর কাজ দেন সুফিয়া বেগম।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উজান চরনওপাড়া গ্রামের জালাল উদ্দিনের মেয়ে আকলিমার বয়স ৯ বছর এবং একই গ্রামের নুরুল ইসলাম ও রাবেয়া খাতুনের ৬ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট সুমনের বয়স ১১ বছর ৪ মাস।

রাজধানীর চকবাজারের জয়নাগ রোডের ২২/খ নম্বর বাড়ির গৃহকর্তা বরকত মুন্সী (৫৫) ও নয়নী বেগমের (৪৮) বড় ছেলে অনীক (২২) ও ছোট ছেলে অন্তরদের (১৮) বাসায় একই গ্রামের সুমন (১১) ও আকলিমা (৯) গৃহকর্মীর কাজ করত। আকলিমার বাবা জালাল উদ্দিন ও সুমনের বাবা নুরুল ইসলাম দুজন পেশায় দিনমজুর, হত দরিদ্র পরিবার দুটি বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের বরকত মুন্সীর বাসায় গৃহকর্মীর কাজে দেন। জানা গেছে শিল্পপতি বরকত মুন্সীর বড় ছেলে অনীক মাদকাসক্ত।

বরকত মুন্সীর বাড়ির ছাদের একটি ঘরে সুমনের থাকত আর আকলিমাকে থাকতে দেয়া হত রান্নাঘরে।

বরকত মুন্সীর মাদকাসক্ত বড় ছেলে অনীক প্রায়ই সুমনকে মারধর করত। সুমন কান্নাকাটি করত বলে সুফিয়া বেগম গৃহকর্তাকে বলে ২০১০ সালের ১২ই ডিসেম্বর সুমনকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সুমন গ্রামে এসে স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়।

সুমন গ্রামে এসে আকলিমার বাবা জালাল উদ্দিনকে জানায়, আকলিমা সেখানে খুব কান্নাকাটি করে। সে কান্নাকাটি করে তার বাবাকে যেতে বলেছে।

মেয়ে আকলিমাকে দেখতে জালাল উদ্দিন ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর বরকত মুন্সীর চকবাজারের জয়নাগ রোডের ২২/খ নম্বর বাড়িতে যান। সে সময় আকলিমা তার বাবাকে কান্নাকাটি করে বলে, মালিকের বড় ছেলে তার সঙ্গে খারাপ কাজ করে তাঁকে যন্ত্রণা দেয়। এ বিষয়ে জালাল উদ্দিন বরকত মুন্সীর স্ত্রী নয়নী বেগমকে জিজ্ঞেস করলে তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করা হয় যে তার বড় ছেলে অনীক আকলিমার সঙ্গে ঠাট্টা, দুষ্টুমি করে। তারপর তাঁকে ১৫০ টাকা দিয়ে বিদায় করা হলে তিনি একাই গ্রামে চলে আসেন।

আকলিমার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ নিহত আকলিমাকে গৃহকর্তার বড় ছেলে বিভিন্ন সময় উত্যক্ত করত। আকলিমার মৃত্যুর পূর্বে বরকত মুন্সীর বাসায় গেলে, আকলিমা তার বাবাকে এ কথা জানিয়েছিল। আকলিমার বাবা জানান, ‘আকলিমার মৃত্যুর ১ মাসেরও আগে সুমন বাড়িতে চলে আসে। সুমন বাড়িতে এসে তাকে জানায় আকলিমা কান্নাকাটি করে তার বাবাকে যেতে বলেছে।’ জালাল উদ্দিন জানান, তিনি তার মেয়েকে দেখতে গেলে আকলিমা তাকে কান্নাকাটি করে বলে মালিকের বড় ছেলে তাকে যন্ত্রণা দেয়। কান্নাকাটি করে আকলিমা বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসতে চায়। সে সময় বরকত মুন্সীর স্ত্রী জালাল উদ্দিনকে জানায়, তার বড় ছেলে আকলিমার সঙ্গে ঠাট্টা দুষ্টুমি করে। এরপর ১৫০ টাকা দিয়ে আকলিমার বাবাকে বিদায় করে দিলে তিনি বাড়ি চলে আসেন। তিনি জানান, তিনি বাড়িতে আসার পর আকলিমা মারা যায় সেসময় সুমন বাড়িতে ছিল।

২০১১ সালের ৩০ জানুয়ারি আকলিমা মারা গেছে বলে খবর পান জালাল উদ্দিন। গৃহকর্তা বরকত মুন্সী জালাল উদ্দিনকে জানান, রান্নার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আকলিমা মারা গেছে। এ ব্যাপারে বরকত মুন্সীর ছোট ছেলে অন্তর চকবাজার থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে মামলায় মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি শিশু সুমন সে সময় বাসায় ছিল কিনা তাও উল্লেখ করা হয়নি।

লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে ২০,০০০ টাকা সহ আকলিমার লাশ তার গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

আকলিমার মৃত্যুর পর তার লাশের সুরতহাল করেছিলেন চকবাজার থানার উপ পরিদর্শক শেখ আবদুল মোতালেব। সুরতহাল প্রতিবেদনে কি তথ্য এসেছিল এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি তথ্য দিতে অসম্মতি জানান। এসআই শেখ আবদুল মোতালেব আকলিমার লাশের ময়নাতদন্তের জন্য লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠান। আকলিমার লাশের ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডাঃ মোঃ সারোয়ার হোসেন। ৭ মাস পর ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট বের হলে জানা যায়, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে আকলিমাকে হত্যা করা হয়েছে।

রিপোর্ট পেয়ে চকবাজার থানার উপ পরিদর্শক শেখ আবদুল মোতালেব ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ১৬। পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। এ মামলার তদন্ত ভার দেয়া হয় চকবাজার থানার উপ পরিদর্শক নুরুল ইসলামের উপর। তিনি সহ ঢাকা ও ঈশ্বরগঞ্জ থানার একদল পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সুমনকে তার নিজ গ্রামের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসেন। এ সময় বরকত মুন্সী তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সুমনকে গ্রেফতার করে ঢাকায় এনে ফৌজদারির কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি নেওয়া হয়। তারপর থেকে সে টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। সুমনের মামা জানান, সুমনকে ধরে নিয়ে আসার ৪/৫ দিন পর তিনি টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে সুমনকে দেখতে যান। সেখানে সুমন তার মামাকে জানায় পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে এসে প্রচণ্ড মারধর করেছে। তার চোখেমুখে গরম পানি দেওয়া হয়েছে। তার নখের ভেতর পিন ঢুকিয়ে প্লাস দিয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে। পুলিশের অত্যাচারে সুমনের কোমর কেটে যায়। সুমন তার মামাকে কাটা দাগ ও আঘাতের বিভিন্ন চিহ্নগুলো দেখায়। সুমন জানায়, পুলিশ তাঁকে অত্যাচারের পর বলেছে তাকে যা বলা হবে সে অনুযায়ী যেন স্বীকারোক্তি দেয় তা না হলে তাকে আরও অত্যাচার করা হবে। পরে বাধ্য হয়ে সুমন পুলিশের কথানুযায়ী স্বীকারোক্তি দেয় বলে তার মামাকে জানায়।

সুমনকে এ মামলায় অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র দিয়েছেন চকবাজার থানার উপ পরিদর্শক নুরুল ইসলাম। কিন্তু এ বিষয়ে অনেক উত্তর জানা নেই তাঁর। তিনি এ মামলার কোন নথি দেখাতে পারেননি। তিনি জানান, সব নথি আদালতে চলে গেছে। শিশু সুমন ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও কিভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটাল তার উত্তর জানা নেই এই তদন্ত কর্মকর্তার। ‘কি কি আলামত জব্দ করেছিলেন’ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘তার পরনের বস্ত্র।’ আলামতগুলো কি জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘মানুষের বীর্য পাওয়া গেছে বলে সিআইডি বলেছে।’ ‘এই বীর্য কি তার ছিল’ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘ডিএনএ টেস্ট-মেস্ট যেটা করার করবে, আমরা যেটা পাইছি সেটা দিছি।’ একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেন এই তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি তখন বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট প্রমাণ পাইছি, দিছি। এখন যদি আপনাদের কিছু জানার থাকে অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘সে স্বীকার করেছে মারাটা, এই ব্যাপারটার ব্যাপারে আমরা মামলা নিয়েছি।’ ‘তাহলে ধর্ষণ করেছে কে’ এ প্রশ্নের জবাবে এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ধর্ষণ করেছে কে সেটা ডাক্তার প্রমাণ করবে।’ ‘ডাক্তার কি তদন্ত কর্মকর্তা যে ডাক্তার প্রমাণ করবে’এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি উঠে চলে যান।

মামলার এই তদন্ত কর্মকর্তা ২০১১ সালের ২০শে নভেম্বর topbdnews.com কে ও ২৪শে অক্টোবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু ছেলেটি (সুমন) ঘটনার সময় ওই বাসায় ছিল, তাই হয় সে সাক্ষী হবে অথবা আসামি হবে, এই চিন্তা থেকে আমরা তদন্তে নামি। আমরা তাকে গ্রেফতারের পর সে স্বীকার করে যে, এর আগেও সে একবার মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছিল। দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করার সময় মেয়েটি বাড়িওয়ালাকে ঘটনার কথা জানিয়ে দেবে বলে সুমনকে ভয় দেখায়। আর এ কারণেই সে তাকে গলা চেপে ধরে হত্যা করে।’

আকলিমার বাবা জালাল উদ্দিন জানান, আকলিমার মৃত্যুর ৮ মাস পর পুলিশ এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে তিন দিন আটক রাখা হয়। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার মেয়ে ধর্ষণের পর খুন হয়েছে। এসময় তিনি মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেয়নি। এরপর তিনি আদালতে মামলা করলে আদালত তার আরজিটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করার নির্দোষ দেয়। এরপর চকবাজার থানা পুলিশ মামলা নেয়। মামলার নম্বর ১৯। ২০১১ সালের নভেম্বরে আকলিমার বাবা জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২ ঢাকাতে বরকত মুন্সীর বড় ছেলে অনীককে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত ভার ন্যস্ত হয় চকবাজার থানার উপ পরিদর্শক মামুনুর রশিদের উপর। কিন্তু আকলিমার পরিবারের অভিযোগ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের বাঁচানোর জন্যই সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি কারণ তিনি সাক্ষাৎ দিতে রাজি হননি। তিনি লালবাগ উপ পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে কালের কণ্ঠে ২০শে মার্চ ২০১২ তারিখে তিনি বলেন, ‘জব্দ কৃত আকলিমার কাপড়চোপড়ে কার স্পর্শ রয়েছে তা জানতে জন্য ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ মামলাটি ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। তিনিও এ বিষয়ে কোন কথা বলতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমার কথা বলার কোন প্রয়োজন নাই।’ তিনি বলেন, ‘সবকিছু লালবাগ বিভাগ উপ পুলিশ কমিশনার জানেন।’

লালবাগ বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আদালতে মামলা চলায় এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়দায়িত্বই অনেকাংশে বেশি।’

রাজধানীর চকবাজারের জয়নাগ রোডের ২২/খ নম্বর বরকত মুন্সীর ৫ তলার বাড়িতে গেলে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে কথা বলতে রাজি হননি গৃহকর্তা বরকত মুন্সী। তবে কালের কণ্ঠে ২০শে মার্চ ২০১২ তারিখে তিনি বলেন, ‘মেয়েটি মারা যাওয়ার চার-পাঁচদিন পর সুমন চার হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন চুরি করে পালিয়ে যায়। প্রথমে তার আচরণে বোঝা যায়নি। পরে পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে সে হত্যার সঙ্গে জড়িত।’

কোন অপরাধ না করেও যখন সন্তান কারাগারে সে সন্তানের শোকে বিলাপ করে রাবেয়া খাতুন বলছিলেন, ‘আমার ছেলে কই, আমার ছেলেকে এনে দাও।’ তিনি জানান, তার ছেলে বাড়িতেই ছিল। বাড়ি থেকে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, তার নির্দোষ ছেলের এ অবস্থা কেন।

সুমনের বাবা নুরুল ইসলাম জানান, জালাল উদ্দিনের মেয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে একথা জানিয়ে বরকত মুন্সী তাঁকে খবর দিয়ে নিয়ে যায়। তার নয় মাস পর পুলিশ টাকা খেয়ে বরকত মুন্সী সহ বাড়িতে এসে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে মেয়ের বাবা বাড়িওয়ালাদের নামে মামলা দেয়।

আকলিমার মা কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, আমরা গরীব বলে মেয়েকে অন্যের বাসায় কাজ করতে দিয়েছিলাম। তিনি তার মেয়ের এই নিষ্ঠুর পরিণতির বিচার চান।

ঈশ্বরগঞ্জের রাজীবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আকলিমা নিহত হওয়ার অনেক আগেই নিজ গ্রামে চলে আসে সুমন। তিনি বলেন, তার বয়সী শিশু খুন ও ধর্ষণ করতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার পরিষদের লোকজনদের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখেছি এবং এ এলাকার লোকজনও যথাযথভাবে প্রমাণ করেছে এ কাজটি যখন সংগঠিত হয় তখন সুমন তার নিজ গ্রামেই অবস্থান করছিল। এবং ছেলের বয়স এ রকম করার বয়স না। সে আদৌ প্রাপ্ত বয়স্ক নয়। ঐ কাজটির যদি সুষ্ঠু তদন্ত করা হত তবে সুমন ঐ দোষে দোষী হত না।’

ঐ বাসায় সুমনকে যিনি গৃহকর্মীর কাজ দিয়েছিলেন, সেই সুফিয়া বেগম বলেছেন, ‘আকলিমা খুন হওয়ার অনেক আগেই সুমন ঐ বাসা থেকে গ্রামে চলে আসে।’ কালের কণ্ঠকে ২০শে মার্চ ২০১২ তারিখে সুফিয়া বেগম আরও জানান, শিল্পপতির বরকত মুন্সীর বড় ছেলে এলাকায় মাদকসেবী বলে পরিচিত। তিনি ধারণা করছেন অনীকই আকলিমাকে ধর্ষণের পর খুন করেছে। কারণ মাঝে মধ্যে আকলিমাকে তিনি যখন দেখতে যেতেন তখন অনীকের বিরুদ্ধে আকলিমা অভিযোগ করত।

সুমন ও আকলিমার গ্রামবাসীরা বলেন, ‘তারা নিজেরাই খুন করেছে। পরে পুলিশ সহ বরকত মুন্সী এসে সুমনকে ধরে নিয়ে যায়। গ্রামবাসী মনে করছে, এটা গরীবের উপর অত্যাচার। তাদের টাকা পয়সা নেই বলে তাদের এ দুরবস্থার শিকার হতে হচ্ছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাঃ মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘কোন কিছু নিশ্চিত না হয়ে কাউকে অপরাধী বানানো যায় না।

তিনি বলেন, ‘একজন শিশু কখনও অপরাধ করতে পারে না। একটি শিশুর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনের ব্যত্যয় হতে পারে, আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে একজন শিশুর আচরণ। কিন্তু এর ফলে সে কাজ অপরাধ হিসেবে কখনও সংজ্ঞায়িত হতে পারেনা, বিবেচিত হতে পারেনা। যেহেতু একজন শিশু অপরাধ করতে পারেনা। সুতরাং তার শাস্তি পাবারও কোন রকম প্রশ্ন উঠেনা। এটা হচ্ছে আইনের মূল কথা। আমাদের যারা তদন্ত কর্মকর্তারা থাকেন বা যারা deal করেন অনেক সময় তারা আইন সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত না হয়ে শিশুর সঙ্গে একজন অপরাধীর মত আচরণ করেন। এবং আচরণ করে সে শিশুটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নেন। পরবর্তীতে যেটি আর আইনে টেকে না। কিন্তু এরই মধ্যে যেটি হয়ে যায়, শিশু একটি সহিংস আচরণের সম্মুখীন হয়। এমন একধরণের ট্রামর সৃষ্টি হয়ে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে যায়। শিশুর জন্য যেটি কখনও কাম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি সাজানো মামলা হয়ে থাকে তবে এটি খুবই নিন্দাজনক এবং যতদ্রুত সম্ভব এর থেকে শিশুটিকে মুক্তি দিতে হবে। এবং যেহেতু এটি আদালতের উপর চলে গেছে তাই আমরা আদালতের উপর আস্থা রাখতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি আদালত ন্যায় বিচার করবেন। খুব দ্রুত এই আইনি প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে শিশুটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। কিন্তু যারা এটি সাজিয়েছেন, যারা এই শিশুটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আদালত যেন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই বাদীটিও আমরা ন্যায় বিচার প্রশাসনের কাছে রাখবো।’

কৃতজ্ঞতা: ফলো আপ, এটিএন নিউজ, ২১শে মে ২০১২