ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আজ ২৮ মে ২০১২, সোমবার, আজ রাত সাড়ে ৯টার দিকে মহাখালীর আমতলী এলাকায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে কুপিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের তিন কর্মীকে গুরুতর ভাবে জখম ও অন্তত ৮/১০ জন কর্মীকে আহত করেছে। গুরুতর আহতরা হলেন সহসম্পাদক রিফাত নেওয়াজ, প্রতিবেদক সালাহউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতম ও অফিস সহকারী রুহুল আমিন। তাদের রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যা্ব ঘটনাস্থলে আসে। এদিকে হাসপাতালে ভর্তি তিন কর্মীকে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা আশঙ্কামুক্ত ঘোষণা করেছেন।

রক্তাক্ত বিডিনিউজ কার্যালয়

জানা গেছে, অপরাধীদের ধরতে তাৎক্ষণিক ভাবে পুলিশের কয়েকটি টিম মাঠে নেমে পড়েছে। এ ঘটনায় সরকার, বিরোধী দল শোক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টগণ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

রক্তাক্ত বিডিনিউজ কার্যালয়

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে দুর্নীতি যেমন ক্রমশ উপরের দিকে উঠছে তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। দেশের কোন মানুষটি এখন ভাল আছেন বলতে পারেন। পারেন না, কেউ ভাল নেই। ভাবছেন সরকারী ক্ষমতাবানরা তো ভাল আছেন। হ্যাঁ, তারা আছেন, তবে ওনারা তো মানুষ না অমানুষ। অমানুষদের নিরাপত্তা যখন আর প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, অমানুষরা যখন তাদের নিরাপত্তা পেয়ে যায় তখন তারা আর সাধারণ মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন না। আজ দেশে আশঙ্কাজনক ভাবে সাংবাদিকদের উপর হামলা বেড়েছে। হ্যাঁ, সাংবাদিকদের উপর হামলা সবসময়ই ছিল কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিভিন্ন মহল তার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দেশের আর কেউ কোথাও ভাল নেই। নিরাপদে নেই। রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূচক নিম্নমুখী। সাধারণ মানুষদের কথা বাদই দিলাম, ধরে নিলাম ওনারাও মানুষ নয়। আজ চারিদিকে শুধু ভয়। ঘরেও বাইরেও। ঘরে খুন হওয়ার ভয়, বাইরে গুম হওয়ার ভয়। নির্যাতিত হলে কার কাছে প্রতিকার চাইব, সেখানেও ভয়। গ্রামগুলোতে চলছে সমানে ডাকাতি। ক্রসফায়ারের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে গুম সন্ত্রাস। শিক্ষকদের রাস্তায় ফেলে প্রহার করা হচ্ছে। সাংবাদিক হত্যা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার মুখে একটাই বুলি ‘দেশের অবস্থা ভাল না’।

সন্ত্রাসী হামলার শিকার বিডিনিউজ কর্মী

আপনারা কেউ সোহেল মাহমুদের ‘দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব এই বঙ্গে!’ এই লেখাটি পড়েছেন কিনা। লেখাটি আজ ২৮ মে ২০১২, সোমবার, বেলা সাড়ে ১০টার দিকে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটিতে একটি শূন্যস্থান রাখা হয়েছিল। লেখাটি পড়ে আমি প্রথমেই বলেছিলাম শূন্যস্থান পূরণ হতে বেশিদিন লাগবে না। সেই ব্যবধান যে মাত্র কয়েক ঘণ্টার সেটি ভাবিনি।
আজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে যে হামলাটি হল সে ঘটনায় পুলিশ সাথে সাথে নেমে পড়ল, সাথে সাথে নেমে পড়ুক আর দেরিতেই নামুক এতে আসলে সত্যিই কিছু যায় আসে না। এই হামলার তদন্তও হবে, তবে তদন্তের পর বিচার হবে কিনা তা নির্ভর করছে অপরাধীরা কোন দলের তার উপর। যেমন ধরুন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে অপরাধ করলেও কিছুই হবে না। আর এর ব্যতিক্রম হলে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। ঘাবড়াবেন না, আমি কিছু অবাস্তব ফ্যান্টাসি করছিলাম, এই আর কি। আসল ব্যাপার হল সরকার খুবই ভাল। আমি যা বলেছি তার ঠিক উল্টো। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত অপরাধীদের সরকার ছিঁড়ে ফেলে, অন্যদেরই কিছু বলে না। যারা সব অন্যায়, সন্ত্রাস, অবিচার, রাহাজানি, খুন, গুম করে বেড়াচ্ছে তারা বিরোধী দলের পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত। এজন্যই বিরোধী দলের প্রতি নমনীয় সরকার অপরাধীদের কিছু বলছে না। আমাদের সরকারগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ অন্যান্য অরাজকতার জন্য তো বিরোধী দলকেই সবসময় দোষ দেয়। আর গলা ফাটিয়ে বলে সরকার সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করছে। অপরাধ দমন করছে। কিন্তু সমস্যা হল বিরোধী দলই সবচেয়ে বেশি অপরাধ করে তাই অপরাধ দমন হচ্ছে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তাদের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়। কারণ আইনশৃঙ্খলা তো তাদের কথামতই হচ্ছে, সন্তুষ্ট হবেন না কেন!
একটি কথা কিন্তু বাকিই থেকে গেল। কিছু বলতে পারি কিনা দেখি। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশে বেসরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো কিন্তু সাংবাদিকতাকে একধাপ দুধাপ নয় কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়ে গেছে। প্রথম প্রথম বেসরকারি টেলিভিশনগুলো সংবাদ পরিবেশন ও সাংবাদিকতায় সাধারণ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছে। কি সাহস এই সাংবাদিকগুলোর! পুলিশ হোক আর সরকারী দলের লোকই হোক সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে ‘টাকা খেয়েছেন বলে?’। সাংবাদিকদের প্রতি সবার একটা আলাদা শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল। ঘটনাগুলো যদিও সবসময়ই ছিল তবুও একসময় সাধারণ মানুষ তো অবশ্যই প্রশাসন, পুলিশও সাংবাদিকদের সাথে ভেবেচিন্তে কথা বলত। কিন্তু সরকারের অবহেলায়, আমি অবহেলা বলব না, বলব সরকারের অন্যায়ে দিন দিন প্রতিদিন আজ সাংবাদিকরা সবার হাতে মার খাচ্ছে। দিনেদুপুরে এসে খুন করে চলে যায়, কে খুন হল, সাংবাদিক, প্রশাসন নাকে তেল দিয়ে ঘুমোবে। সাধারণ লোকদের ধারণা হল, সাংবাদিকরা তেমন কেউ নয়, তাইলে পুলিশের খবর হইয়া যাইত। কাল কি হল, বাসের ড্রাইভার সাংবাদিকের সাথে বড়াই দেখিয়ে তাঁকে মেরেই চলে গেল। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কি হল। কচু হয়েছে। সাধারণ লোকদের ধারণা হল সেরকম কারো কিছু হলে খবর ছিল। কাল পুলিশ তিন সাংবাদিককে ধরে পাবলিকের সামনে এমন মার দিল, সাধারণ জনগণ চেয়ে চেয়ে দেখে বুঝল সাংবাদিকদের মা-বাপ কেউ নাই, আহারে বেচারা সাংবাদিক। আজ পাড়ার ছিচকা সন্ত্রাসীরাও স্বনামধন্য সংবাদ সংস্থায় এসে সাংবাদিকদের হাড় গুড়ো করে দিয়ে চলে গেল। কাল হয়তো রিক্সা ওয়ালাও সাংবাদিক দেখলে লাথি দিয়ে বলবে, এই সাংবাদিক সরে দাড়া আসছে আমার পাগলা ঘোড়া। এর জন্য দায়ী কে? সরকার, সরকার, সরকার। অতীতে যেসব সাংবাদিকরা খুন হয়েছেন তার ক’টির বিচার হয়েছে? অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সন্ত্রাসীদের হাতে যেসব সাংবাদিকরা নির্যাতিত হয়েছেন তার ক’টির সঠিক বিচার হয়েছে? আমাদের এই সমাজটা বড় নির্মম। এখানে কেউ যদি কারো প্রতি অন্যায় আচরণ করে, অবজ্ঞা করে, অত্যাচার করে তবে সমাজের অন্যরা তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় না। তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় না, বলে না আমরা তোমাদের পাশে আছি। তারাও এসে দেখাদেখি দুটো লাথি দিয়ে যায়।

রক্তাক্ত বিডিনিউজ কার্যালয়

এখন কথা উঠতে পারে তাহলে সব সাংবাদিক হত্যা আর নির্যাতনের জন্যই কি সরকার দায়ী। সব সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের জন্যই হয়তো সরকার প্রত্যক্ষভাবে দায়ী নয়। তবে সরকার অবশ্যই পরোক্ষভাবে সব সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী। প্রথমত, সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। এটি অবশ্যই একটি কারণ, কারণ এখন হত্যা, গুম, খুন, নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে সরকারী ক্ষমতাবানদের জন্য। তারা অপরাধ করলে কিছু হচ্ছে না, তাহলে অপরাধ করবে না কেন? দ্বিতীয়ত, সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে চুপ করে আছে। যখন দেখা যাচ্ছে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে সরকার উদাসীন, তাদের মারলেও সরকার কিছু বলছে না, তখন সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীগুলো সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় সমানে সাংবাদিক খুন ও নির্যাতন করে যাচ্ছে।

রক্তাক্ত বিডিনিউজ কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

সুতরাং বলতে চাই, সরকারের সহায়তাতেই সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন চলছে। যদি না সরকার এগিয়ে আসে তবে এভাবে চলতেই থাকবে। দেখা যাক সরকার এর প্রতিকারে কি ব্যবস্থা নেয়। সরকারের একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের নির্লিপ্ততা সরকারের জন্য কখনোই শুভ ফলাফল বয়ে আনবে না।

ছবিসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

আরিফ হোসেন সাঈদ, ২৮ মে ২০১২