ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

রাতে হাটার অভ্যাস আমার অনেক পুরোনো। আর তার সাথে যদি মন খারাপ থাকে তাহলে তো কথাই নেই ! রাতের ঝলমলে শহর দেখতে একদম খারাপ না। শাহাজাদপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমেরিকান এমব্যাসি ছাড়িয়ে নতুন বাজার মোরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে হল রাতে কিছু খাই নি। ভাবলাম পরোটা খেয়ে নিয়ে আবার হাঁটাহাঁটি শুরু করবো।

হঠাৎই শুনতে পেলাম –
ভাই ১০ টা ট্যাকা দিবেন? সকাল থিকা কিছু খাই নাই !

কেন যেন কথাটা কানে আটকে গেলো। এমনিতে আমি মানুষ হিসেবে দয়ালু না কিংবা হাজী মোহাম্মাদ মহসিনের মতো দানবীরও না। কিন্তু কথাটা শুনে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে যাবার পরও পেছনে তাকালাম একবার। দেখি একটা লোক অসহায় ভাবে দাড়িয়ে আছে। মনে মনে ভাবলাম “আরে ব্যাটা আমি তো জানি এই টাকা চাওয়া টা তোমার অ্যাডভারটাইজিং এর একটা কঠিন পলিসি। আমি বিজনেস এর স্টুডেন্ট। আমার লগে আইছো চালাকি করতে? শাহরুখ খান নিজেরে মুসলিম কইয়া নিজের অ্যাডভারটাইজিং করে ! আর তুমি ভাত না খাওয়ার কথা কইয়া আইছো নিজের অ্যাডভারটাইজিং করতে?

তোমারে টাকা দিয়া আমি আমার মানিব্যাগের ওজন কমাতে চাই না। আর যাই হোক তোমারে আমি টাকা দিতেছি না।

শেষে আবার হোটেলে গিয়ে পরোটা খেয়ে বেরিয়ে আবার হেঁটে হেঁটে মোরের কাছে আসতেই ওই লোকটা আমার চোখে পরে। এবার কেন জানি একটু নিজেকে বেশীই কমার্শিয়াল মনে হয়। লোকটার কাছে যেতেই আবার সেই আকুতি-
ভাই ১০ টা ট্যাকা দিবেন? সকাল থিকা কিছু খাই নাই !

মানিব্যাগে হাত দিয়ে দেখি ভাংতি ১৫ টা টাকা আছে। ওই ১৫ টাকা দিয়েই ওখান থেকে একটু তাড়াহুড়া করে চলে আসি। লোকটা আমাকে ডেকে বলে, “ভাই সত্যিই আমি সকাল থিকা কিচ্ছু খাই নাই। আপনে ট্যাকা না দিলে কিছুই খাইতে পারতাম না। আমার বাড়ি বর্ডারের কাছে। ঢাকা আইছিলাম ডাক্তার দেখাইতে। ট্যাকা, পয়সা, ব্যাগ সব হারায়া গেছে। আমি বললাম, “ভাই আমার কাছে আর ভাংতি টাকা নাই”। বলেই চলে আসলাম।

হাঁটছি আর ভাবছি যে ওই ১৫ টাকা দিয়ে লোকটা এক প্লেট ভাতও খেতে পারবে না। বড়জোর ২টা রুটি খেতে পারবে। শাহবাগ হলে অন্তত এই টাকায় ভাত খেতে পারতো। মেডিক্যালের পরিত্যক্ত ভাত ! এই যুগে হোটেলে এক প্লেট ভাত খেতে গেলেও কমপক্ষে ৩০/৩৫ টাকা লাগে !
পরে এই সব ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। কে খেয়ে থাকলো আর কে না খেয়ে মরলো তাতে আমার কি? কথায় আছে-
নিজে বাঁচলে বাপের নাম !

এইটা কোন কবিতা-গল্প বা সমসাময়িক লেখা না। মাঝে মাঝে নিজের মাথায় অনেক কথা আসে। সেরকম কিছু কথাই লিখলাম।