ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

সকাল ৯ টা বাজে দবির সাহেব প্রতিদিনের মতনই বাজারে গেলেন,চায়ের দোকানে বসে আরামসে চা খাচ্ছেন, এমন সময় পাশের বাড়ির মাতবর সাব হনহন করে দবির সাহেবের দিকে তেড়ে আসলেন…

” দবির সাব আপনার ছেলের বিচার করবেন নাকি করবেন না?!

-কেন বলুন তো!!

“সে আমার আম বাগানের সব আম পাইড়া খাইছে”

– বলেন কী?! এ হতেই পারে না,দাড়ান আইজ তার একদিন কি,আমার একদিন…

পরক্ষনেই দবির সাব খেয়াল করলো বাজার হয়ে তার পুত্রধন স্কুলে যাচ্ছে।দোউড়ে গিয়ে ধরলো তার ছেলেকে,কিছু জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজনবোধ করেনি, ঘাড় চেপে মাতবর সাবের সামনে নিয়ে আসলো…বাজারে অজস্র মানুষের সামনে পায়ের জুতা খুলে বেদম মাইর দিল।একেকটি মাইর দিচ্ছে আর গালি দিচ্ছে।।

আশপাশের কেউই দবির সাবকে থামাতে আসছে না, উল্টো…

-কেউ বলছে ওরে ঘর থেইক্যা বের করে দেন,
-কেউ আবার পুরনো কথা স্মরন করিয়ে দিচ্ছে,
– কেউ বা বলছে “ওরে লটকায়া মারেন”,
– কেউ বলছে ও জীবনেও মানুষ অইবো না।।

বলছে অনেক কথাই…কিন্তু দৃশ্যপটের অন্তরালে দবির সাহেবের ছেলে কতটা কস্ট পাচ্ছে কেউ কী টের পাচ্ছে?!!

বিবেক কে জাগ্রত করতে কখনো শিক্ষিত হওয়া জরুরী না,জরুরী আত্মসন্মানবোধ।দবির সাহেব ভুলে গেছে তার যতটুকু মানসম্মান আছে ঠিক অতটুকুই মানসম্মান তার ছেলেরও আছে।যে কাজটা তিনি জনসম্মুখে করেছেন সেটা তিনি ঘরেও করতে পারতেন।

ফলাফল কী হয়?

দবির সাহেবের ছেলে ঐ রাতেই মাতবর সাহেবের যত গুলো আমগাছ ছিলো বাকি সবকটা আমগাছে হানা দেয়,

দবির সাব আবার মারে…
দবির সাহেবের ছেলে আবার করে,দিনদিন তার ছেলের চরিত্র হয়ে উঠে আরো ভয়ংকর।

একটা সময় দবির সাহেবের ছেলের গায়ে “এসকারাপ” নামে ব্র্যান্ড মার্ক পড়ে যায়।দবির সাহেবের ছেলে খারাপ, এলাকায় এই বাক্যে গুঞ্জরিত,দবির সাব বয়সের ভারে শাষন করতে পারে না,ছেলেকে কিছু বলতে গেলেও ছেলে এখন কঠিন ভাষায় তেড়ে আসে।

কখনো-সখনো বিধাতার কাছে চিৎকার করে ছেলে কে অভিশাপ দিতে থাকে।কখনো স্থবির হয়ে চিন্তা করতে থাকে কী করা যায় ছেলে কে নিয়ে?!

সমাজ তাকে বুদ্ধি দিল,

“ছেলে কে বিয়ে করায়া দেন,দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে”

অবুজ দবির সাব,
ভুলে গেলেন আজ তার ছেলের রন্ধে রন্ধে যে সমস্যা রয়েছে, কীভাবে একটি মেয়ে তার ছেলে কে পাল্টাতে পারবে?!

দবির সাব ছেলে কে বিয়ে করালেন,প্রথম কয়দিন ভালোই কাটে…এক সকাল বেলায় শুনলো ছেলে এখন নতুন সমস্যায় জড়িত।বউয়ের সব গয়না বিক্রি করে “বাবা” খাচ্ছে,টাকা না পেলে বউ কে ইদানিং মারে,নেশার জগতে তীব্র মাত্রায় ঢুকে পড়ে দবির সাহেবের ছেলে,একটা সময় ছেলের বউ কে তার বাবা-মা নিয়ে যায়।

সমাজ বুদ্ধি দিল,ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন,
এবার সমাজ কথায় কান দিলেন না,
দবির সাব স্থির করলেন ছেলেকে মাদক নিরাময়ে পাঠাবেন।ছয় মাসের জন্য ছেলেকে ভর্তি করানো হল।

এই ছয় মাসে দবির সাবকে ছেলের অনুপস্থিতি দারুন আবেগময় করে তুলে,ছেলের খাটে ঘুমিয়ে থাকে,জামা ধরে গায়ের ঘ্রান শুকতে থাকে,ছেলের পড়ার টেবিলে বসে স্মৃতিচারন করতে থাকে,ছেলের জন্য রাত জেগে প্রার্থনা করতে থাকে।

খুব দেরী করে হলেও দবির সাব অনুধাবন করতে পেরেছে

“সমাজের কথা শুনে যা করেছে তা ভুলই ছিলো!!”

এদিকে ছয় মাস ঘনিয়ে আসছে,ছেলেও আসার সময় হয়ে আসছে,অন্যদিকে দবির সাব দাদা হতে চলছেন সব মিলিয়ে কিছুটা খুশীর আমেজ দবির সাহেবের মাঝে।ছেলেও ঘরে ফিরে আসলো,দবির সাহেবের ব্যাবসায় বসালো, দবির সাব দাদাও হলো…

সব মিলিয়ে দবির সাহেবের সুখের গল্প শুরু,দবির সাহেবের ছেলে তার ছেলেকে কোলে নিয়ে দুস্টমী করে,নাতি আর ছেলের খিলখিল হাসি দেখলে দবির সাব অপলক দৃস্টিতে তাকিয়ে থাকেন,ছেলের হাসিমাখা মুখ দেখে অবচেতন মনেই বলে বসে…

” এতো সুন্দর হাসি যার মাঝে ছিলো,তার জীবনটাতো আরো সুন্দর হতে পারতো!!”

_______________

গল্পের শেষ দৃশ্যটা হয়তোবা এমন হয় না।প্রতিটা এলাকায় দেখবেন কিছু কিছু ব্র্যান্ড করা ছেলেপুলে থাকে,যাদের কে আমাদের এলাকায় বলে “এসকারাপ”।বলতে পারেন এরা এসকারাপ হয় কেন?

অধিকাংশ ছেলেপুলে এমন ব্র্যান্ডধারি নাম হওয়ার পেছনে অনেক কারন থাকে তবে প্রথম কারন দবির সাহেবের মতন বাবা-মা,যারা সন্তানের মানসম্মানের কথা একটুও চিন্তা করে না।কান কথা অনেক বিশ্বাস করে,জনসম্মুকে কিংবা ভরা মজলিসে সন্তানকে শাষন করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে,ভুলেই যায় নিজের যতটুকু মানসম্মান আছে ঠিক অতটুকু মানসম্মান তার সন্তানেরও আছে।

ফলাফল কী হয়?

জীবদ্দশায় দবির সাবরা নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুভব করতে থাকে।

দ্বিতীয় কারন সঙ্গদোষ,
ঘরে ভালো পরিবেশ না থাকলে একটা ছেলে খারাপ হতে বেশী সময় লাগে না।প্রতিটা ছেলে জাতির মধ্যেই সুপ্ত বাসনা থাকে যেগুলো সে উড়াতে চায় আর উড়াতে না পারলেই তার খারাপ দিকটা প্রকটভাবে ধারন করে তখন,মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় যাকে বলে ফ্রয়েড।একটা ছেলে তার মনের আকাঙ্খাগুলো কিংবা কস্টগুলো যদি ঘরে প্রকাশ করতে না পারে সেগুলো প্রকাশ করে তার বন্ধুদের সাথে আর সেই বন্ধুই যদি খারাপ থাকে তাহলে তো আর কথাই নাই।

আর তৃতীয় কারন আমাদের সমাজ,এর ব্যাখ্যা মনে হয়না আমার আর দেওয়া লাগবে।

বলতে পারেন এর থেকে তাহলে উপায় কী??

বুঝান…
বুঝাতে থাকেন…
বুঝানোর বিকল্প আর কিছুই নাই।একবার না দুইবার না দশবার বুঝান, মনে রাখবেন আপনার ছেলেটা মানুষ,গরু ছাগল না।একদিন সে ঠিকই বুঝবে।ছেলের ভেতর থেকে আপনারই কথা বের করতে হবে,আপনারই শুনতে হবে, আপনারই সমাধান করতে হবে।বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাবা-মা’দের ছায়া একটা ছেলের জন্য খুব দরকার,যাতে করে ছেলেটা তার অশ্রুশিক্ত নয়ন বাবা নামের রুমালটি দিয়ে মুছতে পারে,মনের কস্টগুলো যেন মা নামের ডাস্টবিনে ফেলতে পারে।

একটা ছেলের জন্য
বাবাদের রুমাল হওয়া দরকার,
মা’দের ডাস্টবিন হওয়া দরকার…