ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সময়কাল-অক্টোবর ২০০৬
সেবার ঈদ উৎসবটা অনেক আগেই শুরু হয়েছিলো। যে উৎসবে বাড়ি ফেরার তাড়া ছিলো না, টিকিট কাটার লাইন ছিলো না ! বাসে ট্রেনে অস্বাভাবিক ভিড়ও ছিলো না!
তবে ঈদের মতোই খুশি ছিলো, আনন্দ ছিলো, ছিলো বিশ্বকে কিছু দিতে পারার গর্ব। একজন বাংলাদেশীর (ডঃ ইউনুস) নোবেল জয় ঈদের ঠিক ১৩ দিন আগেই পুরো জাতিকে এনে দিয়েছিল সার্বজনীন এক আনন্দের উপলক্ষ।

কিন্তু শান্তিতে নোবেল জয় এদেশের মানুষকে আনন্দিত করলেও শান্তি এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো। তাইতো সেসময় রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত হয়েছিলো, রক্তাক্ত হয়েছিলো, রাজপথ। লগি বৈঠার আঘাতে সাপের মতো মরেছিলো মানুষ। মৃত মানুষের লাশের উপর হয়েছিলো উদ্দাম নৃত্য। যে দৃশ্য হার মানিয়েছিল কোন অ্যাকশন-থ্রিলার ছবিকেও। আমি জানিনা কোন ড্রামাক্রিটিক এই দৃশ্যকে কিভাবে নিতেন।

বিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ড্রামাক্রিটিক ছিলেন কেনেথ টাইনান। উপন্যাসিক হিসেবে সমাদৃত এবং নাট্য সমালোচক হিসাবে বিখ্যাত টাইনান কখনো নাটক লেখেননি! কেন নাটক লেখেননি এমন এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-

একজন মানুষ তার জীবনে কলম দিয়ে যা কিছু লিখতে পারে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো নাটক লেখা”।

কঠিন বলেই হয়তো টাইনান নাটককে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি বলে যাননি, আমাদের জীবনটাই একেকটা নাটক, আর সে নাটক এড়ানো সম্ভব নয়! সেটা ব্যক্তি জীবনেই হোক কিংবা জাতীয় জীবনে!

তাইতো ২৮ অক্টোবর’০৬ বাংলাদেশ এড়াতে পারেনি রাজপথের লগি বৈঠার নাটক। কোন মঞ্চ কিংবা টিভি নাটকের সাথে এ লগি বৈঠার নাটকের বৈসাদৃশ্য হলো-
টিভি নাটকে ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে স্ট্যানম্যান ব্যবহার করা হয়। যেখানে রক্ত ঝরে না, ঝরে আলতা। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের সেই লগি বৈঠার নাটকের মানুষগুলো কোন স্ট্যানম্যান ছিলো না। লগি বৈঠার আঘাতে তাদের শরীর থেকে আলতা ঝরেনি বরং রক্তই ঝরেছিলো।

সময়কাল- অক্টোবর ২০১২
আশ্বিন মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে। বাংলা প্রবাদে একটা কথা আছে- আশ্বিন, গা শিন শিন। কিন্তু বৈষয়িক উষ্ণতায়, আশ্বিনে পড়ে না গা শিন শিনে শীত, সব কিছুই যে এখন সুসময়ের বিপরীত। পৃথিবীটাই তো এখন উষ্ণ হয়ে উঠছে!

ধর্ম ও ধর্মীয় নেতাকে অবমাননা করে মুসলিমদের সংবেদনশীলতায় আঘাত করা আমেরিকার “ইনোসেন্স অফ মুসলিমস” মুভিকে কেন্দ্র করে তো উষ্ণতার পারদ শীর্ষে পৌঁছেছে, ইতোমধ্যেই আরব দেশগুলো সহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে বিক্ষোভ হচ্ছে, আমেরিকার দূতাবাসে হামলা হচ্ছে….. লিবিয়াতে হামলায় নিহত হয়েছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত সহ ৪ জন, মিশরে বিক্ষোভ সহিংসতা ছাড়িয়েছে, পাকিস্তানে বিক্ষোভ চলাকালীন সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছে। বাংলাদেশে একদিন হরতাল পালিত হয়েছে, যদিও এ হরতালের ছিল বিক্ষোভের জন্য পল্টন ময়দান নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে।

সুপরিকল্পিতভাবে বিদ্যেশ ছড়ানো নিষ্পাপ নামের কলুষিত প্রজেক্ট “ইনোসেন্স অফ মুসলিমস” এর উষ্ণ উত্তেজনা হয়তো আরো কিছুদিন থাকবে! মুসলিমরাও হয়তো ষড়যন্ত্রকারিদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে এ উত্তেজনার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবে। যার উত্তাপ পুনঃ পুনঃ ছড়িয়ে পড়বে লিবিয়া থেকে মিশর, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ!

তবে ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশের মানুষ এ উত্তেজনার ফাঁদে পা দেয়নি। তাদের বিবেচনাবোধ সঠিক দিকেই ধাবিত হয়েছে, সেটা সচেতনভাবেই হোক কিংবা অসচেতনভাবে। ইতিমধ্যেই সরকার থেকে এ ছবিটির বিষয়ে নিন্দাসহ ছবিটি বাজেয়াপ্ত করতে আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউটিউব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে! সাধারণ মানুষ রাস্তায় মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করলেও তা ছিলো শান্তিপূর্ণ যা কোন সহিংসতার রূপ নেয়নি। যা কিনা আমাকে স্বস্তি দিয়েছে! কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে একটি বিষয় আমার অস্বস্তির কারণ হচ্ছে…..

হলমার্ক কেলেংকারী, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, কুইক রেন্টালে দেশকে কুইক ডেস্ট্রয় নীতি, আইন শৃঙ্খলার ক্রমাবনতি এ সবকিছুতেই সরকার ব্যর্থতায় টালমাটাল! এর যে কোন এক ইস্যুতেই ঝড় উঠতে পারে চায়ের কাপে, উষ্ণ হতে পারে রাজপথ।

কিন্তু আশ্চর্য, এ বিষয়গুলো নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠলেও, তা রাজপথকে প্রভাবিত করেনি। রাজপথ এখন থমকে আছে! আর আমার উৎকন্ঠাটা এখানেই……. ঝড়ের পূর্বেও তো থমকে থাকে আকাশ। রাজপথের থমকে থাকা কি বড় কোন ঝড়ের পূর্বাভাস?

১৬ সেপ্টেম্বর, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়ে স্বাক্ষর করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। এ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তি করা সহ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়।

১৯ সেপ্টেম্বর, প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দলীয় জোট নেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে জানিয়েছেন,

“সংসদ রেখে নির্বাচন হবে না। ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপ অব গভর্নমেন্টে সরকারপ্রধান সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব দেবেন। তিনিই ঠিক করবেন সংসদ কবে ভেঙে দেবেন, কতজনের মন্ত্রিসভা থাকবে। তিনি যে নির্দেশ দেবেন, সে অনুযায়ী নির্বাচন হবে।”

২০ সেপ্টেম্বর, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও ১৮ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন-

“নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার না হলে বিএনপি কোন নির্বাচনে অংশ নেবে না, নির্বাচন হতেও দেবে না”।

এখন যে প্রশ্নগুলো সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে-

আগামী সংসদ নির্বাচন কি আদৌ হবে?
নির্বাচন হলে কার অধীনে হবে?
সরকার কি বিরোধী দলের দাবী মেনে তত্ত্বাবধায়ক ফিরিয়ে আনবে?
বিরোধী দল কি তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে?
যদি নির্বাচনের আগে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতা না হয় তবে কি ২৮ অক্টোবরের ২০০৬ এর মতো রাজপথ আবারো সংঘাতের দিকে যাবে?

আমরা কি এগিয়ে যাচ্ছি, আরেকটি লগি বৈঠার তান্ডবের দিকে?

আমি ভাবছিলাম, ২০০৬ এর প্রশ্নগুলো কি নিদারুণভাবে ২০১২ তে করতে হচ্ছে! ২০০৬ এর অক্টোবর আর ২০১২ এর অক্টোবর একই প্লাটফর্মে রয়েছে। ৬ বছরের ব্যবধানে দেশটার অবস্থান একই স্থানে!

আশ্চর্য!

সেই ১৯৫৮ থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এই দেশে আন্দোলন চলছে। ৭১’এবং ৯০ এ সেই আন্দোলন চরমে পৌঁছেছিল। তারপর কিছুদিন বেসামরিক শাসনের পর আবার কিভাবে যেন ঘুরেফিরে সামরিক কিংবা অসাংবিধানিক সরকারই ফিরে আসছে। ফিরে আসছে অসাংবিধানিক সরকারের আশংকা।

সেই ৯০ থেকে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই দেশে আন্দোলন চলছে। তারপরও প্রতিটি নির্বাচনেই চলছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা। জনগনের ভোটের অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ খেলাই ঘুরেফিরে চলছে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ এ, এমনকি ২০১২ তেও।

আসলে আলোচনা করার জন্য আমাদের চায়ের কাপ উষ্ণ হলেও জীবনটা বড় একঘেয়ে-

একটা রেকর্ডের মাঝেই যেন আটকে গেছে গ্রামোফোনের পিন! বারবার একই সুরে একই কথায় রেকর্ডটা বাজছে। গণতন্ত্রের জন্য, প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবীতে চিৎকার করতে করতেই কি জীবনটা শেষ হয়ে যাবে? দেশটা কি একটুও এগোবে না? আমরা কি এগিয়ে যাবো আরেকটি লগি বৈঠার তা-বের দিকে? রাজপথের নৃশংস হত্যাকান্ডের দিকে? আরেকটি ওয়ান/ইলেভেনের দিকে?

এ সকল অস্থির ভাবনার মাঝে আমি দেখছিলাম, আজকের দিনপঞ্চি-
আজ ২রা অক্টোবর, আন্তর্জাতিক সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস বা আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস।

অহিংসার আলোয় ভালোবাসার মন্ত্র ছড়িয়েছিলেন যে মহাত্মা

১৮৬৯ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অখন্ড- ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনীতিবিদ এবং অখন্ড- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তি মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী।

যিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। যে আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো অহিংস মতবাদ বা দর্শনের ওপর এবং এটি ছিলো ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি। সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার পাওনায় আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা।

মহান এ নেতার স্মরণে ভারত সরকার দিবসটিকে গান্ধী জয়ন্তী হিসাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করলেও ২০০৭ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসাবে পালনের ঘোষণা দেয়।

এ অক্টোবরেই জন্ম নিয়ে মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী অহিংসার যে আলো ছড়িয়েছেন, সে আলো তাকে করেছিলো মহাত্মা আর বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিয়েছিলো ঘৃনার বিপরিতে ভালোবাসার মন্ত্র!!!

আমি ভাবছিলাম, ২০০৬ এর সহিংস অক্টোবর কি ২০১২ তে অহিংস রূপ নেবে? রাজপথে সহিংসতার বিরুদ্ধে, রক্ত ও জীবন নাশের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দেবে অহিংসার আলো !?

যে আলোয় আন্তর্জাতিক সহিংসতা প্রতিরোধ দিবসেই সুষ্ঠু নির্বাচন আর গণতন্ত্র সুরক্ষার আন্দোলনে অহিংস হয়ে উঠবে দীর্ঘকাল রাজনৈতিক সহিংসতার আক্রান্ত এ জাতি।

পুনশ্চ: লেখাটি লেখার পরের দিন, রাজনৈতিক সহিংসতার আক্রান্ত জাতিটি হঠাৎ করে ধর্মীয় সহিংসতায় আক্রান্ত হয়েছে!!! কক্সবাজারের রামু, টেকনাফ, উখিয়া, ও চট্রগ্রামের পটিয়ায় ধর্মের নামে অধর্মের পাশবিক প্রকাশ ঘটিয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু অংশ……লজ্জা….লজ্জা

মন্দির কিম্বা মূর্তি নয়, ভেঙ্গেছে অনুভূতিশীল মানুষের হৃদয়

আমি মনে পড়ছে মুক্তিযুদ্ধের সময় আঁকা নিতুন কুন্ডুর সেই সাড়া জাগানো পোস্টারের কথা ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান আমরা সবাই বাঙালি’,। ভাবছিলাম- ‘আমরা সবাই বাঙালি থেকে কি করে এতো ধার্মিক হয়ে উঠলাম? হিংসার আগুনে কিভাবে পোড়ালাম- ভাতৃত্বের বন্ধন, মানবিকতা, উদারতা, বিশ্বাস, পোড়ালাম বাড়ি, দোকান, মন্দির…………

বুদ্ধের শরির, আর গান্ধির বিবেক পুড়িয়ে সব ভস্স করে দিয়েছি, জানিনা এ পোড়া ছাই থেকে জেগে উঠবে কিনা বিবেকের ফিনিক্স পাখি!!! শুধু জানি, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান আমরা সবাই বাঙালি’,। আমরাই ছড়িয়ে দেব- হিংসার বিপরিতে ভালোবাসার মন্ত্র।