ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

১১ ফেব্রুয়ারী ২০১১, যেদিন থেকে বিডিনিউজ24.কম ব্লগ যাত্রা শুরু করলো, সেদিন থেকে এ ব্লগে যাত্রা শুরু আমারও। কেউ যদি নিতান্তই আগ্রহ ভরে আমার প্রোফাইলে যান, দেখতে পাবেন-আমি ব্লগে যোগদান করেছি, শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১! অর্থ্যাৎ বিডি ব্লগের ইনিংসের শুরু থেকেই আমি ব্লগিং শুরু করেছি….যদিও আমি সে সময় প্রতিষ্ঠিত কোন ব্লগার ছিলাম না, এখনো নই….।

টেস্ট ক্রিকেটে ইনিংসের শুরুতেই কখনো কখনো স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান না নামিয়ে, আনকোরা ব্যাটসম্যান নামানো হয়। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় যাকে বলা হয় নাইটওয়াচম্যান।
ক্রিকেট উন্মাদনায় আক্রান্ত এ জাতির একজন হিসাবে নাগরিক সাংবাদিকতা ব্লগের শুরুতেই আনকোরা এক ব্লগারের যাত্রাতে নিজেকে ব্লগীয় নাইটওয়াচম্যান বলে মনে হচ্ছে। এবং আমি আনন্দিত……এ নাইটওয়াচম্যান এখনো নট আউট! এবং করে ফেলেছে অপরাজিত ৫০ পোস্ট!!!

যদিও জানি এ কীর্তিতে, জাভেদ ওমর বেলিমের ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাট করার রেকর্ডকে হাতছানি দিলেও, দশ নম্বরে নেমে আবুল হোসেনের অভিষিক্ত সেঞ্চুরীর সময়ে, প্রায় ১ বছর ১০ মাসে মাত্র হাফ-সেঞ্চুরী পোস্ট খুব সাদামাঠা লাগবে….।

তবে এ কথা স্বরন রাখতে হবে, আবুল হোসেনরা পেশাদার খেলোয়ার। যাদের পোষাক থেকে শুরু করে খাদ্যাভাস আন্তর্জাতিক মানে নিয়ন্ত্রীত হয়! যারা পড়ে হাজার বিশেক টাকার জুতা, খায় হাজার টাকার জুস, যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রীত গাড়িতে….আর এ নাইটওয়াচ ম্যানকে লিখতে হয় জীবন যাপনের জটিলতা পেড়িয়ে, ঢাউস সাইজের মনিটরের সামনে বসে, মশার কামড় খেয়ে। এ বিবেচনায় ১ বছর ১০ মাসে ফিফটি পোস্ট, নিশ্চই একেবারে মন্দ না……..।

এবার আমার অপরাজিত ব্লগিং এর কথা বলি-
আমার একটি প্রিয় গান- আমি তোমারও সঙ্গে বেধেঁছি আমারো প্রান, সুরেরও বাঁধনে।

ব্লগিং করতে গিয়ে এ গান মিশে গেছে দিনলিপির সাথে- আমি তোমারও সঙ্গে বেধেঁছি আমারও প্রান, লেখনীর বাধঁনে…..এ বাধঁনেই হয়েছে আমার এক একটি পোস্ট, যা আজ হাফ সেঞ্চুরি ছুঁয়েছে। আমায় লেখনীর বাঁধনে বেঁধেছে- আব্দুল মোনেম, জহিরুল চৌধুরী, নুরুন্নাহার শিরীন, হৃদয়ে বাংলাদেশ, প্রবাসী, রীতা রায় মিঠু, বাসন্ত বিষুব, জিনিয়া, আবু সাঈদ আহমেদ, জুলফিকার জুবায়ের, মোত্তালিব দরবারী, মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, ম.সহিদ, মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধূরী, প্রবীর বিধান, বিন্দুবিসর্গ, সত্য কথক, নীলকন্ঠ জয়, মাহি জামান, (আরো অনেকেই…) এ সব লেখকেরা তাদের অসাধারন লেখনীতে এ বাধঁন তৈরি করেছেন, এ প্রাপ্তিকে পূর্ন করেছেন।

আর হারানো???
আমার খুব প্রিয় একজন ব্লগার জাহেদ-উর-রহমান, যিনি হারিয়ে গেছেন। হারিয়ে গেছেন প্রিয় ব্লগার –আবু সুফিয়ান, দুরন্ত বিপ্লব, মোঃ হাসেম, মোসাদ্দিক উজ্জ্বল, আমিন আহম্মদ, রণদীপম বসু, হেলজিনোম২০১০, আকাশের তারাগুলি, মুশফিক ইমতিয়াজ চৌধুরী,(আরো অনেককেই…)। হারিয়েছি নাহুয়াল মিথের লেখনী!

একজন পাঠক হিসাবে, যাদের লেখা আমি মিস করি। যাদের লেখনীতে বিডি ব্লগ হতে পারতো আরো মুখরিত, আরো পরিপূর্ন। তারা কেন হারিয়ে গেলেন? হৃদয়ের বাধঁনকে কি অস্বীকার করা যায়?
আমার আজকের ৫০ উৎযাপনের দিনে হারানো বন্ধুদের বলবো- ফিরে আসুন। আপনাদের লেখনিতে সমৃদ্ধ হোক বিডি ব্লগ, ভালোবাসায় পূর্ন হোক হৃদয়।

আমি আশা করছি, গ্রামীনফোনের বিজ্ঞাপনের মতো- বন্ধুরা ঘরে ফিরবেই। হারানো অতৃপ্তি লেখনীতে পূর্ন করবেই।

যদিও জানি, একজন বন্ধু আর কখনোই ফিরবেন না! প্রিয় সাইফ ভূঁইয়া যে চলে গেছেন না ফেরার দেশে(৫জুলাই,২০১২)। ব্লগার সাইফ ভূঁইয়ার স্মৃতির প্রতি জানাচ্ছি বিনম্র শ্রদ্ধা……।

এভাবেই আমার অপরাজিত ব্লগিংয়ে লেখক হিসাবে কখনো স্টাইকে থেকে কখনো পাঠক হিসাবে ননস্টাইক প্রান্ত থেকে দেখেছি, দেখছি হৃদয়ের বাঁধনে বাঁধা মানুষ গুলোর আসা- যাওয়া…..এর ফাঁকেই গড়ে উঠেছে অনেক ভালো লাগা মন্দ লাগা….লেখালেখির বাহিরেও গড়ে উঠেছিলো নানা অর্জন। যে অর্জনের নেতৃত্ব দিয়েছে উদ্দোমী ব্লগারেরা। আমি স্বরণ করছি সে অর্জনের রোলিং পয়েন্টগুলো-

এক.- অন্তর্জালের এ সম্পর্ককে মানবীয় রুপ দিতে জাহেদ-উর-রহমান এবং আইরিন সুলতানার উদ্যোগে হয়েছিলো ব্লগারদের আড্ডা। যার একটির নাম ছিলো “কৃষ্ণচূড়া আড্ডা”। শুধু আড্ডায় নয় নামেই যেটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়……

দুই.- মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে আর্ত মানবতার সেবায় সুলতান মির্জার ডাকে ব্লগারেরা মানবিক সাহায্য নিয়ে ছুটে গিয়েছিলো চট্টগ্রামে। স্বরণকালের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিতে, পাহাড়ী ঢল, পাহাড় ধস ও সৃষ্ট বন্যার পানিতে নদী ভাঙ্গনে প্রাণ হারায় ১১৯ জন। এবং বহু পরিবার হারায় তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ….ব্লগ পরিবার দাঁড়িয়েছিল সে সব অসহায় পরিবারের পাশে, তাদেরই একজন হয়ে……

তিন.- ব্লগের লেখাকে বইয়ে পরিনত করতে ম.সহিদের উদ্যোগে একুশে বইমেলা-২০১২ তে প্রকাশিত হয় ব্লগারদের লেখার সংকলন নগর নাব্য। যাত্রা শুরুর এক বছরের মাথায় এমন সফল সংকলন নিঃসন্দেহে অনেক বড় পাওয়া। আনন্দের কথা এ বছরও এমন সংকলন বের হতে যাচ্ছে, আরো পরিনত হয়ে, উৎকর্ষতা ছাপিয়ে….।

চার.- “মোল্লার দৌড় নাকি মসজিদ পর্যন্ত আর ব্লগারদের দৌড় কীবোর্ড পর্যন্ত” কথাটিকে ভুল প্রমান করে সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদে আবু সুফিয়ানের উদ্যোগে ব্লগারেরা নেমেছিলো রাজপথে….।

পাঁচ.- বিডি ব্লগের ব্লগার আবু সুফিয়ান, অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে ব্লগিংকে দেন নতুন মাত্রা এবং এ বছরই তিনি জার্মানির আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম ডয়চে ভেলের বেস্ট অব দ্য ব্লগস প্রতিযোগিতায়, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ক্যাটাগরিতে সেরা ব্লগারের পুরষ্কার পান….

ছয়.- আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন যে মুক্তিযুদ্ধ, যে মুক্তিযুদ্ধ একি সাথে বেদনার ও গৌরবের। সে বেদনা আর গৌরবের দালিলিক প্রমান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের বেদনাময় গৌরবগাঁথা ইতিহাসের অংশ হতে মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধূরীর উদ্যোগে নির্মানাধীন স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দুটি স্বারক ইট কেনেন ব্লগারেরা।

উদ্দোমী ব্লগার আর অনুকুল ব্লগ পরিবেশের কারনেই সম্ভব হয়েছে এসব আলোকিত অর্জন।
অভিনন্দন উদ্যোক্তা এবং সহায়তাকারী ব্লগারদের…..আমি গর্বিত আপনাদের সহযাত্রী হতে পেরে।
অভিনন্দন বিডিনিউজ24.কম ব্লগকে..আমি গর্বিত এখানে ব্লগিং করতে পেরে।
তবে এতো ভালো লাগা আর অর্জনের মাঝে কিছু কষ্ট কিম্বা হতাশা যে নেই তা নয়……।

এক.- পোস্ট এবং মন্তব্য প্রকাশে অনেক সময়ই মডারেটরদের বিরক্তিকর বিলম্বের কারনে মনঃসংযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়েছে…।
দুই.- স্বাধীন চিন্তা ও নিজেকে বিকশিত করার এ প্লাটফর্মে অনেক সহযোদ্ধাকে দেখেছি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত লেখায়, লেখক নামের লাঠিয়াল হতে! অন্ধ আবেগ আর নীতিহীন বিদ্দেশে যারা লেখা এবং মন্তব্যকে কুলষিত করছে…।
তিন.- মডারেশন প্রকৃয়ার সাথে যুক্ত(সম্ভবত) থাকার কারনেই কিনা জানি না, ব্লগে আইরিন সুলতানা, কৌশিক আহম্মেদের অনিয়মিত পদচারনা দুঃখজনক! অথচ তাদের নিয়মিত লেখনি, আমাদের সমৃদ্ধ করতে পারতো…।
এমন ভালো লাগা-মন্দ লাগা, মুগ্ধতা আর অর্জনেই চলছে আমার ইনিংস। আশা করছি চলবে আউট নয় বরং রিটায়ার্টহার্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত…..।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে- এই অর্ধ সেঞ্চুরী করার দিনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে, নতুন ব্লগার সর্বপরি সকল ব্লগারদের জন্য আমার পরামর্শ কি???
এ পরামর্শ দেবার আগে একজন নতুন অথচ সম্ভাবনাময় ব্লগারকে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই-

বোতল বাবা
ব্লগে যোগদান করেছেন: রবিবার, ৪ নভেম্বর ২০১২
পোস্ট করেছেন: ৪টি
মন্তব্য করেছেন: ১৪০টি

তার পোস্ট এবং মন্তব্যের সংখ্যাটি লক্ষ্য করুন। আমাকে শুধু তার লেখা এবং মন্তব্যের ভাষাই আকৃষ্ট করেনি, আকৃষ্ট করেছে এ সংখ্যাটিও….শুধু পোস্টের সংখ্যায় নয় বরং অধিকতর মন্তব্যের সংখ্যাও একজন সু-ব্লগারের পরিচয় বহন করে, প্রমান করে আপনি অন্য অনেক লেখা পড়ছেন এবং নিজের চিন্তাকে সে লেখার সাথে যাচাই করছেন…..।
আমি কয়েকজন জনপ্রিয়, সু-ব্লগারের উদাহরন দিচ্ছি-

জহিরুল চৌধুরী- পোস্ট করেছেন: ৮৪টি। মন্তব্য করেছেন: ১,০৫৬টি।
নুরুন্নাহার শিরীন- পোস্ট করেছেন: ১৭৪টি। মন্তব্য করেছেন: ২,০৪৭টি।
হৃদয়ে বাংলাদেশ- পোস্ট করেছেন: ২৮টি। মন্তব্য করেছেন: ২,৩৪৬টি।
জিনিয়া- পোস্ট করেছেন: ৫২টি। মন্তব্য করেছেন: ১,৬৬৭টি।

সু-ব্লগারদের এ বিশেষ দিকটি মাথায় রেখে আপনারা নিজের প্রোফাইলের পোস্ট আর মন্তব্যের সংখ্যা দেখুন, এবং নিজের মূল্যায়ন করুন…….নিয়মিত পোস্ট পড়ুন, লিখুন এবং মন্তব্য করুন। শুধু নিজের ব্লগে পাওয়া মন্তব্যের প্রতি মন্তব্য নয়, অন্য ব্লগেও মন্তব্য করুন, অন্যের চিন্তার সাথে নিজের চিন্তার স্বমন্নয়ে শুদ্ধ চিন্তার জন্ম দিন। এবং অতি অবশ্যই নিজের বিবেকের কাছে দ্বায়বদ্ধ থাকুন……।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, শুভ ব্লগিং……..।

এ নাইটওয়াচম্যানকে অবশ্য এখন ফিরতে হবে মাঠে…এক একটি পোস্ট যার নিজের এক একটি রান, এক একটি মন্তব্য যার কাছে দলীয় অর্জন…..যে অর্জনেই আমরা একতাবদ্ধ হৃদয়ের বাঁধনে……