ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

বাংলাদেশের শীতকাল…..।
নাতিশীতষ্ণ দেশের শীতও সহনীয়। তাইতো হিম শীতলতা থেকে বাঁচতে সদূর সাইবেরিয়া থেকে এ দেশে আসছে পরিব্রাজক পাখিরা। অতিথি পাখি নামে যারা নীড় খুঁজে ফিরছে হাওরে-বাওরে, খেতে-খামারে, কোনো বাঁশ ঝাড়ে কিম্বা গাছের ডালে…।
এ বছর শীতে বাংলাদেশে নীড় খুঁজে ফিরছে একজোড়া বিশেষ পরিব্রাজক! সাইবেরিয়া নয় বরং রুপকথা থেকে এসেছে অতিথি পাখি ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী!
দীর্ঘ ভ্রমনের ক্লান্ত ডানা, নীড় না পাবার হতাশা আর প্রচন্ড শীতের কাঁপাকাঁপিতে তারা ভাবছিলো- এ দেশে আসা কি তাদের ভুল হয়েছে?
বাংলাদেশে এ বছর শীত তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৯৬৮ সালের পর এবারই তাপমাত্রা ৩.২ এ নেমেছে! ফুটপাত হয়ে শীত কাঁপাচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের অনিরাপদ বেডরুম! পাখিদের মধ্যে অবশ্য বিত্ত ভেদ নেই, প্রচন্ড শীতে কাঁপছে সবাই…কাঁপছে দেশী পাখি, সাইবেরিয়ান পাখি কাঁপছে, কাঁপছে রুপকথার ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীও!
ব্যঙ্গমা অবশ্য তার ক্লান্ত ডানাতেই শীত থেকে আড়াল করছিলো ব্যঙ্গমীকে। ঠোঁটে ঠোঁট ঠুকড়ে, গলার পালকের নিচে ঠোঁটের আচড় কেটে উষ্নতা খুঁজছিলো, উষ্ন করছিলো ব্যঙ্গমীকে…যে উষ্নতার মধুময়তায় পার হয়ে যাবে শীতের কষ্টকর রাত, হয়তো এ উষ্নতাতেই আসছে বসন্তে ডিম দেবে ব্যঙ্গমী। চারিদিকে ফোঁটা ফুলের মতোই রঙ্গিন হয়ে উঠবে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর নীড়।
হঠাৎ অনাগত ডিম আর তা ফুটে বেড়োনো ছানার জন্য হাহাকার করে ওঠে ব্যঙ্গমার বুক! এ দেশের এক কবি হয়তো এমন হাহাকারেই লিখেছিলেন-

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

ব্যঙ্গমা তদ্রুপ হাহাকার নিয়েই ভাবছিলো- তার ছানা কি পারবে, থাকতে পোকামাকড়ে?
যেভাবে ক্ষেতে-খামারে, ফলবতী গাছে কীটনাশক ব্যবহার শুরু হয়েছে! পোকামাকড় হীনতায় তার ছানাকে তো থাকতে হবে অনাহারে-অর্ধাহারে, বেড়ে উঠতে হবে পুষ্টিহীনতায়!
অনাগত সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষৎ’এর হতাশায় ব্যঙ্গমার গলা ধরে আসে। যে গলা দিয়ে বেড়োয় না- “ছানার জন্য এ পৃথিবী বাসযোগ্য করার অঙ্গিকার”।
বেড়োবেই বা কি করে! তাদের নিজেদের বসবাসের জন্যইতো এখনো নীড় গড়তে পারেনি!

এই প্রথম মানুষ্যকুলের প্রতি হিংসা হয় ব্যঙ্গমার! স্বীকার করে, শারিরিক দূর্বলতায় উড়তে অক্ষম মানুষ্যকুল বুদ্ধিতে বেশ টনটনা! পাখিরা হয়তো নীড় গড়তে নিপুন কিন্তু মানুষ্যকুল নিদারুন! তারা কি বিষ্ময়কর ভাবেই না, একটার ওপর আরো অনেকটা উচু উচু নীড় গড়ে তুলছে! পাখিরা যদি এমনটা পাড়তো, তবে রুপকথা থেকেই ব্যঙ্গমা এবং সাইবেরিয়া থেকে অন্যান্য পাখিরা ডেভেলপার পাখিদের কাছে নীড়ের বুকিং দিতে পারতো! ফলে এদেশে এসেই তারা রেডী নীড়ে উঠতে পাড়তো!

কিন্তু হায়!! পাখিরা নীড় গড়তে নিপুন হলেও, মেধায় মানুষের মতো অসাধারন নয়। তাই বাঁচার জন্য দীর্ঘ কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে এ দেশে এসেও তাদের নীড় খোঁজা বা তৈরীর জন্য কষ্ট করতে হচ্ছে…।

ব্যঙ্গমা আক্ষেপ নিয়ে ভাবছিলো- পাখিরা কেন মানুষের মতো হয় না?
নিজো মনের এ আক্ষেপ ঘোচায় ব্যঙ্গমা স্মৃতিময় যুক্তিতে- এইতো সেদিন, যখন তারা এ দেশে আসছিলো…বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ইন্ডিয়া দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় অবধারিত ভাবেই তাদের আসতে হয়েছিলো ইন্ডিয়ার ওপর দিয়েই। দিল্লি অতিক্রম করার সময় তারা দেখেছিলো- চলন্ত বাসে ধর্ষনের ঘটনা! শুধু ধর্ষনই নয়, গনঘর্ষন শেষে চলন্ত বাস থেকে ধর্ষকেরা অসহায় তরুনীকে ফেলে দেয়, পরবর্তিত মৃত্যু হয় নির্যাতিত তরুনীর!

মানব সমাজের এ অমানবিক আচরনে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর মন ভারাক্লান্ত হয়, তবে দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়ার ক্লান্তিতে মানব চরিত্রের এ অসৌন্দর্য্য তাদের মন থেকে হারিয়েও যায়…..
তাদের ভাবনায় শুধু সেই অপরুপা দেশ………যে দেশ সম্পর্কে কবি বলেছেন-

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি

বাংলাদেশের সৌন্দর্য্য তারা ছিলো মোহবিষ্ট একই সাথে কাজ করছিলো সংকোচপূর্ন অপরাধবোধ! তাদের কারনেই কি, সুন্দর দেশটি বিভিষিকায় পরিনত হবে?
যে দেশে অতিথি নারায়ন। পরিব্রাজক নারায়নের সাথে কি সে দেশে যাচ্ছে পরিব্রাজক অসুর? অতিথি পাখির আড়ালে কি আসছে অনাকাঙ্খিত বার্ডফ্লু?
এ বছর, বাংলাদেশে নিপাহ্ ভাইরাস ভয়াবহ আকার ধারন করেছে! ইতিমধ্যেই ৮ জন মারা গেছে! লক্ষ্যনীয় নিপাহ্ ভাইরাস ছড়াচ্ছে দেশী বাদুড়। পরিব্রাজক পাখিদের দ্বারা এখনো কোন ফ্লু ছড়ায়নি, যা কিনা ব্যঙ্গমাকে স্বস্তি দিচ্ছে কিন্তু আরেকটি ফ্লু তাকে নিদারুন অস্বস্তিতে ফেলেছে………এ দেশে এসেই সে খেয়াল করছে- ধর্ষনের প্রকোপ অসাভাবিক হারেই বেড়ে গেছে! এমনকি দিল্লির মতোই ধর্ষন হয়েছে চলন্ত বাসে! অর্থ্যাৎ এ শীতে বাংলাদেশ বার্ডফ্লুতে আক্রান্ত না হলেও আক্রান্ত হয়েছে রেপফ্লুতে!!!

ব্যঙ্গমা ভাবছিলো- ভাগ্যিস পাখিরা মানুষের মতো হয় নি! পাখিরা যদি মানুষের মতো হতো, তবে মানুষের এ অমানবিক দোষে পাখিরাও দুষ্ট হতো! যখন দিল্লিতে কিংবা বাংলাদেশে চলন্ত কিংবা উড়ন্ত অবস্থায় একাকি কিংবা দলবদ্ধ নির্যাতনে ব্যঙ্গমী ধর্ষিত হতো! ধর্ষন শেষে তাকে ছুড়ে ফেলা হতো আকাশ কিংবা গাছের ডাল থেকে! ফলে মৃত্যু হতো ব্যঙ্গমীর আর সারা জীবন বিপত্নীক হয়ে একাকি কাটাতে হতো ব্যঙ্গমার!
ব্যঙ্গমা ভাবে- পাখিরা মানুষ থেকে অনেক উত্তম! পাখিরা গান গেয়ে, ভালোবেসে সঙ্গীকে আকৃষ্ট করে। মানুষ নামের অমানুষ হয়ে জোর করে না! মানবিকবোধের বিরুদ্ধাচারনে দানব হয়ে কিংবা অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহন করে কাউকে জীবন্ত হত্যা করে না!

হঠাৎ করেই মানুষ্যকুলের প্রতি আর হিংসা নয় বরং করুনা হয় ব্যঙ্গমার!
সভ্যতার উৎকর্ষতায় মানুষ্যকুল শুধু সুউচ্চ নীড়ই গড়তে পেরেছে! কিন্তু তাদের বোধকে প্রতিথ করছে অসভ্যতার অতল গহব্বরে…।।