ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

(নোটস- “পরিব্রাজক ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী” লেখার পরই এটা ধারাবাহিক করার এ প্রচেষ্টা। ইচ্ছা আছে পরবর্তিতেও ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীকে রুপকথা থেকে পোস্টে নিয়ে আসার।-ধন্যবাদ)

সংসদ ভবনের যে পাশটায় খেজুর বাগান! যার একপাশে খামারবাড়ী, অন্যপাশে চন্দ্রিমা উদ্যান……সেখানেই নীড় গড়ে তুলছে পরিব্রাজক ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী।
যদিও নীড়ের জন্য তাদের প্রথম পছন্দ ছিলো চন্দ্রিমা উদ্যান! লুই কানের নকশা অনুযায়ি যে জায়গাটি পাখির চোখে চাঁদের মতো লাগে। কল্পনারাজ্য রুপকথার পাখি জুটির কাছে এ স্থানটা যেন কল্পনার নীড়!

কিন্তু চাঁদের যেমন কলংক আছে! রাজনৈতিক হীনমন্যতায়, কলংক চন্দ্রিমা উদ্যানেরও রয়েছে! উদ্যানের বাতিগুলো অধিকাংশই নষ্ট, বাতির সাথে দেশাত্ববোধক মিউজিক সিস্টেম ছিলো তা নষ্ট। লেকের পানি নোংরা এবং এর ওপরের সুদৃশ্য ব্রীজের দু’পাশের ফোয়ারা আর চলে না! সন্ধ্যার পর যেখানে সেখানে মুত্রত্যাগ, ভাম্যমান বনিতাদের ঘোরাফেরা, গন্জিকা সেবনকারীদের নিরাপদ সেবন স্থান সহ অব্যবস্থাপনার সাক্ষী হয়ে ঝুলে আছে সংযোগবিহীন সিসিটিভি ক্যামেরা!

ব্যঙ্গমী ভাবছিলো, যেখানে রয়েছে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এ দেশের সফল একজন রাষ্ট্রনায়কের কবর, যার একপাশে সংসদ ভবন আর অন্য পাশে মসজিদ একই সরলরেখায় রয়েছে। রাজনৈতিক কারনে এর চেহারার জীর্ণতা মেনে নেয়া যায় কিন্তু কামবিলাস কখনোই নয়!!!

এখানকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা কি করছে?

আর সাধারন মানুষের(কেউ কেউ) সেন্সটাও কত নিচে নেমে গেছে! একটি কবর আর মসজিদ পাশে রেখেই যারা টাকায় কিনছে বক্ষবন্ধনীর নিচে হাত দেবার অধিকার কিংবা কাঁপিয়ে চলছে, ঝোঁপঝাড়!!

এসব দেখে ব্যঙ্গমী বিরক্ত হয়। কিছু বিকৃত মনের মানুষ আছে যারা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে কিংবা ভিডিওতে পশু-পাখির কামলীলা দেখে মজা পান! আর তাই ইউটিউভে এ সকল সাইট গুলোতে হিটও হয় প্রচুর। কিন্তু পশু-পাখিরা, মানবিক না হলেও এতটা বিকৃত মানষিকতা তাদের নেই। দো’পেয়ে মানুষের কামলীলা তাদের কাছে প্রকৃতির চাহিদা, চোখের উপভোগ্য ক্ষুধা নয়! আর তাই বিরক্ত ব্যঙ্গমী চন্দ্রিমা উদ্যান ছেড়ে নীড় গড়ছে খেজুর বাগানে, যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় স্থপতি লুই কানের অপূর্ব ও অমর স্থাপনা “জাতীয় সংসদ ভবন”।

পাখিদের মধ্যে অবশ্য এমন কোনো প্রফেশনাল স্থপতি নেই। প্রকৃতিগত ভাবেই তারা সবাই নীড় গড়ার নিপুন কারিগর এবং অসাধারন স্থপতি। ব্যঙ্গমী জানে, তার পতিও অসাধারন স্থপতি…তাদের জন্য গড়ে তুলবে অনন্য এক নীড়, যেখানেই চলবে তাদের সুখ-দুঃখের খুনসুটি…।

ব্যঙ্গমীর মনটা সে নীড়ের ভাবনায় স্বপ্নকাতর হয়। নীড়ের অপূর্নতা আর ব্যঙ্গমার অসহায়তায় বুকটা খাঁ খাঁ করে!!!
ব্যঙ্গমী জানে- মানুষই হোক কিংবা পাখি, ঘরই হোক কিংবা নীড়, তার পরিপূর্নতা আসে সন্তানে….।

ব্যঙ্গমী ভাবছিলো-অধিকাংশ রুপকথা শুরুর কমন অনুচ্ছেদ-

অনেক অনেক দিন আগের কথা, এক দেশে ছিলো এক রাজা। রাজার ছিলো হাতিশালায় হাতি, ঘোড়াশালায় ঘোড়া। কিন্তু রাজার মনে এবং রাজ্যে শান্তি ছিলো না! রাজা ছিলো আটকুড়ে…..।

রুপকথার রানী এ পাখিটি চায় না, আটকুড়ের অসহায়তা ও অশান্তি তার ব্যঙ্গমা রাজাকে স্পর্শ করুক…।
হঠাৎ মা হবার তীব্র আকাংখা জাগে ব্যঙ্গমীর। মাতৃত্বের ফ্যান্টাসিতে ইচ্ছা জাগে, এই মুহুর্তে একটি টকটকে লাল মরিচ খেতে! মাতৃত্বের এ চিরন্তন ফ্যান্টাসিতে আক্রান্ত হয় মানুষ্যকুলও! তখন নারীরা খায় আচার কিংবা টক জাতীয় কিছু….।

কিন্তু বাংলাদেশে এই মুহুর্তে, ব্যঙ্গমীর মাতৃত্বকে চমৎকৃত করা টকটকে লাল মরিচ পাওয়া সম্ভব নয়!!! কারন লাল মরিচ এখন আর চমৎকারে নয় বরং বলাৎকারে ব্যবহার হচ্ছে! সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথের আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশের তৃনে যোগ হয়েছে নতুন অস্ত্র-“মরিচের গুড়া স্প্রে”! যেটি ব্যবহার হচ্ছে- বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করা অসহায় শিক্ষকদের চোখে, জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করা বামদের মুখে! ব্যবহার হচ্ছে, এ সকল ছবি তুলতে যাওয়া সাংবাদিকদের ক্যামেরার লেন্সে এবং অতি অবশ্যই সরকার বিরোধীদের মিছিল, সমাবেশ, হরতালে। আর তাই লাল মরিচ এখন দুষ্পাপ্য, সব চলে গেছে পিপার স্প্রে তৈরির কারখানায়!

ব্যঙ্গমী ভাবছিলো- চমৎকার করা লাল মরিচের বলাৎকারের মতো, তার সামনে থাকা লুই কানের গনতন্ত্রকে চমৎকৃত করা এ ভবন কি নির্মম পরিহাসেই না, রাজপথে গনতন্ত্রকে বলাৎকার করছে!
হঠাৎ ব্যঙ্গমী আবিষ্কার করে- তাদের নীড় আর সংসদ ভবন, এ দুই স্থাপনার অপূর্ব এক সাদৃশ্য! এ দুটাই কল্পনায় প্রাগন্যান্ট করে দেয়!
নীড়ের স্বপ্নে মা হতে চায় ব্যঙ্গমী। আর সংসদের স্বপ্নে আবারো মা হতে চায় খালেদা জিয়া! আবারো মা হতে চায় শেখ হাসিনা!

ব্যঙ্গমী ভাবে- ক্ষমতাও এক প্রকার মাতৃত্ব, যেখানে পুরা জাতির মা হতে হয়। আর তাই আবারো ক্ষমতায় যাবার আকাংক্ষা আর মাতৃত্বের আকাংখার মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই নিশ্চই। এ আকাংখা দোষেরও নয় নিশ্চই। কিন্তু দোষটা তখন হয় যখন মাতৃত্ব কিংবা ক্ষমতার এ পবিত্র আকাংখা বহুগামিতায় গড়ায়!

জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস। পতি, পরমেশ্বর।
কিন্তু ক্ষমতা আকাংখার বহুগামিতাতেই, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে এদেশে হস্তক্ষেপ করার আহবানে আর্টিকল প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া! মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া দল ক্ষমতাকাংখায় সঙ্গ নেয় রাজাকারের!
এমন আকাংখার বহুগামিতাতেই, জনগনের ওপর আস্থা হারানো শেখ হাসিনা ক্ষমতা হাতে রেখেই নির্বাচন করার বন্দোবস্থ করেন! মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী, গনতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকারী দল ক্ষমতাকাংখায় সঙ্গ নিয়েছিলো(১৯৯৬) রাজাকারের! সঙ্গ নিচ্ছে স্বৈরাচারের!

দীর্ঘকাল গনতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা জাতির জন্য এ এক নিষ্ঠুর নিয়তি! গনতন্ত্রের স্বপ্নে গড়া দৃষ্টিনন্দন সংসদ ভবনের সৌন্দর্য্যের জন্য এ নির্মম পরিহাস!
ব্যঙ্গমী উপলব্ধি করে- স্থাপনা শুধুই স্থাপনা! নীড়ই হোক কিংবা সংসদ ভবন। এর সৌন্দর্য্য মনোমুগ্ধকর হতে পারে কিন্তু দিনশেষে এটি শুধুই ইট,কাঠ আর খড়কুটোর বুনন, নিপুন তবে প্রানহীন। যেখানে প্রান প্রতিষ্ঠা করাই স্বার্থক সৌন্দর্য্য।

যে স্বার্থক সৌন্দর্য্যর টানেই, অপূর্ব নীড় গড়ে তোলা ব্যঙ্গমার দিকে এগিয়ে যায় ব্যঙ্গমী। ঠোঁটে ঠোঁট ঠুকড়ে প্রান খুঁজে ফেরে…যে প্রানের স্পন্দনেই জীবন্ত হয়ে উঠবে তাদের নীড়! নিজের বুকে-পেটে ব্যঙ্গমার উষ্নতা অনুভব করে ব্যঙ্গমী। সুখানুভুতির সাথে সে উষ্নতা সঞ্চিত করে ব্যঙ্গমী, আসছে বসন্তে দেয়া ডিমের তায়ের জন্য…।

কৃতজ্ঞতায়ঃ জিনিয়া
যে বিশেষ শুভাকাঙ্খী, ব্যঙ্গমীর মনের খবর জানতে চেয়েছিলো।