ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

সারাদিনের মেঘলা আকাশ পেরিয়ে শ্রাবনের সন্ধ্যাটা জমে উঠেছে গ্রামের বাহির বাড়ির খানকা ঘরে। সব মিলিয়ে গোটা বিশেক মানুষ, অন্য সময় হলে এসময় তারা কাটাতো কোন চা’য়ের দোকানে টিভি দেখে অথবা ক্যারাম খেলে। কিন্তু গ্রামের সনপাতার ছাউনি চা’দোকানে বৃষ্টি হলেই পানি চুয়ায়, তাই ক্যারাম বন্ধ। বৃষ্টির সাথে বাতাসের সাপটা জোরে হলেই কারেন্ট চলে যায়, তাই টিভিও বন্ধ। টিভি, ক্যারাম ছাড়া চা দোকানে বসার কোন অর্থ হয় না। তাইতো এ মানুষগুলো ঠাই নিয়েছে এ খানকাঘরে। এখানে অন্তত বসে গল্প করার বিনিময়ে একটু পর পর মিষ্টি গরমপানি গিলে পকেটের টাকা খসবে না…

কয়েক দশক আগে হলেও এখানে জমতো আষাঢ়ে গল্প। কিন্তু অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগেও যেখানে গ্রামের দুই বাঁশের খোলা পায়খানার ওপর দিয়েও বয়ে গেছে ক্যাবল নেটওয়ার্কের তার। সেখানে কল্পিত আষাঢ়ে গল্পের জায়গা নিয়েছে বাস্তবতার এমন সব ঘটনা যা আষাঢ়ে গল্পকে আষাঢ়ে থৈ থৈ করা খাল-বিলে ডুবিয়ে দিয়েছে।

গত ক’দিন আগের ফ্রান্সের সন্ত্রাসী ঘটনা, তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান, তনু-মিতু-এসপি বাবুল থেকে, সহিহ আর ভ্রান্ত ইসলাম, সবই আলোচ্যসূচিতে থাকে। যদিও গুলশান এবং শোলাকিয়ায় হামলার পর সকল আগ্রহ ও আলোচনা সে বিষয়েই।

গ্রামের এই দরিদ্র মানুষগুলো যাদের অধিকাংশের ছেলে মাদ্রাসায় পরে, ইসলামকে অপরাধকরন করার সময়ে এ নিয়ে তাদের মধ্যে যে লুকায়িত সংকির্ণতা, তা অনেকটা প্রকাশিত উচ্ছাস হিসাবে ধরা পরে হামলাকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়া পরিচয় দেখে!

শহরের এসি রুমে বসে সুশিল ভেকধারীদের ভাষায় এ উচ্ছাসকে পৌশাচিক উচ্ছাস বলা সহজ, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ধর্মীয় পরিচয়ের যে বন্চনা মনোসমিক্ষন, এসি রুমে শীতল বাতাস ঢুকলেও এটা কখনোই ঢোকেনি! ঢোকেনি, না রুমে, না তাদের চিন্তাজগৎ-এ

চিন্তা জগৎ-এর এ বদ্ধতায় শুধু শহুরে সুশীল নয় আক্রান্ত গ্রামের মানুষগুলোও। যাদের মাথায় ধরে না- সিঙ্গারার মধ্যে কি করে গরম আলু এলো? চিন্তায় খেলে না- বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ধনীর দুলালেরা কেন জঙ্গিবাদে আত্মঘাতি হলো? এ কি শুধুই হুরপরীর লোভ, আর বেহেস্তের দরজা খোলার আকাংখা? যাদের দুনিয়ার পরিদের অভাব ছিলো না! সোনারগাঁ, রেডিসনের দরজা খোলাতে সমস্যা ছিলো না! তারাই কিনা পরকালীন মোহে জীবন দেবে?

আলোচনা এই জায়গাতে এসে রাজনৈতিক মোড় নেয়। বিশেষত শেকের বেটির জাতীয় ঐক্য হয়ে যাওয়ার ঘোষনা, হুরপরি আর বেহেস্তের দরজা খোলার কথাটাই উঠে আসে। ঐকের ঘোষনাকে বাস্তবিক বাতিল করে গোটা বিশেক মানুষই বিভক্ত হয়ে পরে! কেউ বলে- মৌলবাদীদের সাথে কিসের ঐক্য? ওরা বাদে সবাই ঐক্যবদ্ধ.. অন্যরা বলে- এটাই তো তোদের চরিত্র, সরকারে আসতে ভোটের দরকার হয় না, অটো নির্বাচনের মতো অটো জাতীয় ঐক্য হয়ে যায়…

হঠাৎ এক দৃঢ় কন্ঠে সবাই থেমে যায়- “সোনা বুনলে সোনা ফলে”। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না, কিন্তু বিবেক সুলভ কন্ঠে সবাই সম্মোহিত হয়ে পরে। তিনিও বলে চলেন-

সে অনেকদিন আগের কথা। রাজ্যে বেপরোয়াভাবে চুরি বেড়ে গেছে। চুরি রোধে শাস্তি শূলে চড়ানোর ঘোষনা দেয়া হয়েছে। তবুও চুরি কমছে না! হঠাৎ করে একদিনে ধরা পড়লো তিন চোর। রাজ্যে উৎসবের আমেজ পরে গেলো, তিন চোরকে শূলে চড়ানো হবে। নির্দিষ্ট দিনে লোকে লোকারন্য, চুরির প্রতি ঘৃনায় সবাই সুবিচার দেখতে এসেছে। তিন চোরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শূলের দিকে, রাজাকে অতিক্রম করার সময় হঠাৎ এক চোর বলে উঠলো- ‘সোনা বুনলে সোনা ফলে’! রাজা চমকে উঠলেন। চোরকে ডেকে জানতে চাইলেন- আসলেই কি তাই? বিশ্বাসের সাথে চোর বললেন- জী, মহারাজ।

রাজা যে লোভী ছিলেন, তা নয়। তবে তিনি কৌতুহলী ছিলেন। সে কৌতুহলেই তিনি শূল রদ করলেন। উৎসুক জনতা হতাশা নিয়ে ফিরে গেলো বাসায়। তবে তারা আবার জমায়েত হলো সেদিন, যেদিন জমিতে সোনা বোনা হবে! ইতিমধ্যেই জমির মাটি চাষে চাষে হয়েছে মিহি।

চোর রাজার কাছে গিয়ে বললেন- মহারাজ, আমি তো চোর। আমি বুনলে সোনা ফলবে না। এমন কাউকে বুনতে হবে যে জীবনে চুরি করেনি। তাই আপনি বুনুন। রাজা হচকিত হয়ে গেলেন- রাজপুত্র থাকা অবস্থায় তিনি কত চুরি করেছেন। রাজা তাকালেন মন্ত্রীর দিকে, যিনি করেন রাজকোষ সাফাই। তারপর উজির, নাজির পাইক, পেয়াদা হয়ে রাজ্যে এমন একজন মানুষ পাওয়া গেলো না, যে জীবনে কখনো চুরি করেনি!

চোর এবার রাজাকে প্রশ্ন করলো- মহারাজ আমরা না হয় পেটের দায়ে চুরি করি কিন্তু আপনারা কিসের দায়ে চুরি করেন?

গল্পটা এখানেই শেষ। সবাই এমন ভাবে চুপ হয়ে গেছে যেনো সবার মধ্যে হয়ে গেছে জাতীয় ঐক্য। হঠাৎ বজ্রপাতের ঝলকানিতে স্পস্ট বোঝা গেলো সবাই সবার চোখে চোখাচোখি করছে! হয়তো সে চোখে উত্তর খুঁজছে- জঙ্গিরা তো হুরের লোভে মানুষ হত্যা করে, সে হত্যা কি অনেকে করেনি পুলিশ লেলিয়ে গুলি করে, গুম করে? তারাও কি ধর্মীয় বিপথগামী জঙ্গিদের মতোই গঠনতন্ত্রের বিপথগামী নয়?

গল্প শেষ করে কিছুসময় নিরব থাকা বিবেক আবারো কথা বলে উঠলেন- সোনা বুনলে সোনা ফলবে, তবে সে জন্য সোনার মানুষ হতে হবে। সোনার বাংলা গড়তেও রাজনৈতিক ক্ষোভ, বিদ্দ্যেশ ভুলে জাতীয় ঐক্যের পথে হাটতে হবে। কথাটি সবার কানে গেলো কিনা বোঝা গেলো না! বৃষ্টি ছেড়েছে, তাই সবাই হাঁটা দিয়েছে যে যার বাড়ির পথে…।