ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বাংলা বাউল সংগীতের কিংবদন্তী সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম জন্ম গ্রহন করেন ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের উজান ধলের কালনী নদীর তীরে। যিনি মাঠের টানে, মাটির গানে নিজেকে সমর্পন করেছিলেন। কালনীর ঢেউ ও বাতাস যাকে সাধক পুরুষে পরিনত করেছিলো। সহজ ভাষায় সুরের ইন্দ্রজাল তৈরি করে মানুষের হৃদয়ে যিনি স্থান করে নেন। ছোটবেলায় যে রাখাল বালক কালনীতে চলা নৌকা দেখে মুগ্ধতায় গেয়েছিলেন-

“কোন মেস্তরি নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করেরে ময়ূরপঙ্খী নাও”

লক্ষ্যনীয়, শাহ্ আব্দুল করিম একজন মরমী সাধক ছিলেন এবং উল্লেখিত গানে তিনি নৌকাকে শুধু নাও না বলে ময়ূরপঙ্খী নাও বলেছেন। তবে কি তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নদীমাতৃক এ দেশ একদিন আন্তর্জাতিক নদী আগ্রাসনের শিকার হবে? আর এ দেশের দোসরেরা নদীকে নিয়ে ব্যবসায় মেতে উঠবে! যখন নাও পানিতে নয় বরং ময়ূরপঙ্খী হয়ে ভাসবে আকাশে!
মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন-

“আমি মরে গেলে আমার হাড়গুলো নিয়েও বানিজ্য হবে”

তিনি কি বুঝেছিলেন, বাঁধ দিয়ে নদীকে হত্যার পরও সে নদী নিয়ে বানিজ্য হবে? তিনি কি কখনো কল্পনা করেছিলেন কালনীর ঢেউ একদিন থেমে যাবে, যেদিন বাংলাদেশে আর কোন নদী থাকবে না!
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বরে মারা যান এ বাউল সম্রাট। তার মৃত্যুর পর সত্যি তার হাড় বা তার গানগুলি নিয়ে বাজেভাবে ব্যবসা চলছে। যেমন ব্যবসা চলছে বাঁধ দিয়ে হত্যার পরও বড়াল নিয়ে!

শাহ্ আব্দুল করিমের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর আরেক শাহ্(চাটমোহরের ইউএনও ফিরোজ শাহ্) হয়তো নদী, মৃত্যু নিয়ে কল্পনা আর উপলব্ধি দিয়ে সাধক পুরুষ হবার চেষ্টা করছেন! ১ জুন সাপ্তাহিক নয়া আন্দোলন পত্রিকায় প্রথম কলাম রিপোর্টে এসেছে- ৩০ মে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলনায়তনে আর্সেনিকোসিস রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষন ওয়ার্কশপে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন- একসময় আসবে যখন আমাদের দেশে কোনো নদী থাকবে না………..! যদিও জনাব শাহ্ এ কথার পেছনে কোনো তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেননি! হতে পারে তার এ বক্তব্য পরিসংখান নির্ভর নয় বরং আত্মিক। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শাহ্ আব্দুল করিম, লালন শাহ্ মরমী সাধকদের মতো ফিরোজ শাহ্’র এ আত্মিক সাধনা প্রকৃতি ও স্রষ্টার প্রতি নাকি এ আত্মিক বন্ধন বড়াল ব্যবসায়ীদের সাথে?
আমি ভাবছিলাম,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে করা সেই ঐতিহাসিক সঙ্গতি-

“যতোদিন রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা সুরমা বহমান,
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবর রহমান”

রুপক অর্থে ব্যবহৃত কথাটি এটাই বোঝায় যে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব ততদিন থাকবে যতদিন নদী থাকবে আর বাংলাদেশের অস্তিত্ব যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধুর কীর্তি ততো দিন থাকবে। তবে কি ফিরোজ শাহ্’র মতে- একসময় আসবে যখন আমাদের দেশে কোনো নদী থাকবে না, সেদিন কি পদ্মা মেঘনা যমুনা বহমান না থাকায় বঙ্গবন্ধুর কৃর্তিও থাকবে না? সে সময় কি বাংলাদেশের অস্তিত্বও থাকবে না?

আমি ভাবছিলাম, এক সময় বাংলাদেশে কোন নদী থাকবে কি থাকবে না তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, যখন বদ্ধ বড়াল প্রবাহমান হবার স্বপ্ন দেখছে, যখন বড়ালকে নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তখন মি. শাহ্’র এমন বক্তব্য কি ষড়যন্ত্রকারীদের স্বার্থ রক্ষা করছে না? তাকে বুঝতে হবে, কারো মা চিরকাল বেঁচে থাকেনা তাই বলে সন্তান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে মার জন্য কাফনের কাপড় কেনে না! বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে মাকে বাচানোর চেষ্টা করে। তাই একসময় নদী থাকবে কি থাকবে না তার চেয়ে বড় কথা নদীমাতৃক বাংলাদেশে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে নদী বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।

একই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য উপজেলা চেয়ারম্যান এড. একেএম সামসুদ্দিন খবির বলেন- বড়াল নদী উন্মুক্ত করে জনগনের কতটুকু স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে তা দেখতে হবে। খালি মিছিল মিটিং ও মাইকিং করা হচ্ছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। যদিও উপজেলা চেয়ারম্যান বলেননি কোনটা সত্য আর কোনটা ভ্রান্ত? কারা ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি আর কারা বিভ্রান্ত?

সত্য তো এটাই, বড়ালে যখন বাঁধ দেয়া হয় তখন তিনি এ এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। এ অপকর্মের দায় তিনিও কি এড়াতে পারেন? তিনি কেনো সেদিন বাধা দেননি?
সত্য তো এটাই, তিনি নিজেও বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলনের মিছিল মিটিংএ অংশ নিয়েছেন! বড়ালে বাঁধ ভেঙ্গে সুদৃশ্য ব্রীজ করার ঘোষনা তিনিই দিয়েছিলেন! বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলনের মিছিল মিটিং যদি বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, তাহলে তো তিনিও একদিন বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। বড়ালে বাঁধ ভেঙ্গে ব্রীজ করার ঘোষনা কি বিভ্রান্ত করা ভোটের রাজনীতি?

অথচ তিনিই দোষ চাপাচ্ছেন বিভ্রান্ত করার! শাহ্ আব্দুল করিম হয়তো এজন্যই গেয়েছিলেন-

“আমি তোমার কলের গাড়ি তুমি হও ড্রাইভার, তোমার ইচ্ছায় চলে গাড়ি দোষ কেনো পড়ে আমার”?

সত্যি আমরা জনপ্রতিনিধিদের কলের গাড়ি! তাদের ইচ্ছায় এ গাড়ি চলবে, তাদের ইচ্ছায় নদীতে বাঁধ হবে, ব্রীজ করার ঘোষনা হবে, নদীর মধ্যে বাঁধ দেয়া হবে, বড়াল নিয়ে ব্যবসা হবে। অথচ দোষ হবে……..!
আজ বড়ালের কান্না শোনার লোক নেই, বড়াল পাড়ের মানুষের আক্ষেপ বোঝার লোক নেই। বড়ালে কান পাতলেই হয়তো শোনা যাবে সে বাস্তবতা, কালনী পাড় থেকে ভেসে আসা শাহ্ আব্দুল করিমের গান-

“শুনবে কি বুঝবে কি ওরে মন ধুন্ধা, এ দুনিয়া মায়ার জালে বান্ধা”

সত্যি বড়াল আজ অনেকের ব্যবসায়িক ধান্দা, যারা মায়ার জালে, স্বার্থের জালে বান্ধা। ১০ জুন’১১।