ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

(নোট’স- কথিত আছে, পাখিরা সঙ্গী বাছাই করে জীবনের জন্য। তাই কখনো কোনো সঙ্গী মারা গেলে, পাখিরা নতুন সঙ্গী না খুঁজে একাকী জীবন কাটিয়ে দেয়।)

বসন্তের প্রথম দিনে আমার বান্ধবীকে নিয়ে বসেছি একটি চেইন ফুডশপে। গতরাতে কোনো কোকিলের ডাক আমি শুনিনি, তবে বান্ধবীটি আমায় ডেকেছিল- মিষ্টি ডাক, প্রেমের ডাক, ভালোবাসার ডাক। যে ডাকে হৃদয় ব্যাকুল হয়। আর তাই ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে আমি হাজির হয়েছি তার দোরগোরায়, যেমন মেয়ে কোকিলের ডাকে সারা দেয় তার পুরুষ সঙ্গীটি। বর্তমান বৈষয়িক উষ্ণতায়, আবহাওয়ার ওপর যে প্রভাব পড়েছে তাতে বিলুপ্ত হচ্ছে কোকিল, হারিয়ে যাচ্ছে ঋতু বৈচিত্র। তবে কোনো তরুনের কাছে কোকিলের ডাক হতে পারে- কোনো তরুণীর কণ্ঠ, আর ঋতু বৈচিত্র ধরা দিতে পারে কোনো ঋতুবতীর পোষাক ফ্যাশানে। যদিও দুধের সাধ ঘোলে মেটে না, তবুও আমি বসন্ত অনুভব করছিলাম বান্ধবীর বসন্ত সাজে- ও পড়েছে বাসন্তি শাড়ি সঙ্গে লাল ব্লাউজ, খোঁপায় হলুদ গাঁদা।

আমি ভাবছিলাম, কাল ভালোবাসা দিবসে ওর সাথে কি আমার আবার দেখা হবে! যেমন প্রথম দেখা হয়েছিলো তিন বছর আগে। আমি দিনটির কথা মনে করতে পারছি, বেশ ভালো ভাবেই পারছি। ও এসেছিলো একই সাজে শুধু হাতে লাল গোলাপ। সে সময় ক্ষমতায় ছিলো একটি সেনা সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকার। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে যারা ভাতের পরিবর্তে আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলো। তৎকালীন সরকারের সমর্থক না হয়েও আমরা সেদিন খেয়েছিলাম ফ্রেঞ্চফ্রাই। সময়ের আশ্চর্য সাদৃশ্য- আজো ও পড়েছে বাসন্তি শাড়ি, অর্ডার করেছি ফ্রেঞ্চফ্রাই, সে দিনের মতো আজো চালের দাম আকাশ চুম্বী। তবে ইন্টারেষ্টিং বৈশাদৃশ্য হলো আজ কোন অসাংবিধানিক সরকার নেই, ওর হাতেও কোনো গোলাপ নেই।

ইতিমধ্যে সার্ভ করা হয়েছে ফ্রেঞ্চফ্রাই, সস এবং পানীয়। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে মিউজিক বাজছে, মমতাজের “আগে যদি জানতাম রে বন্ধু তুমি হইবা পর….। পটেটো স্টিকে সস মাখাতে মাখাতে আমি বললাম-

ঃ তুমি কি আগেই জানো আমি হবো পর, আর সে জন্যই কি আজ কোনো গোলাপ আনোনি?
ঃ (মুচকি হেসে) আসলে মনপুরা ছবির গানটির মতো ছবিটাও আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে। আর আমি যদি আগেই জানতাম তাহলে তোমাকে কাছে পাবার জন্য মনপুরার নায়িকার মতো তোমার বাড়ির সামনে নদীর ওপারে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
ঃ তাহলে তোমার আর আমার মিলনতো হতোই না বরং বদ্ধ বাড়ালেই সলিল সমাধি হতো দু’টি প্রাণের। যদিও প্রেমের মরা জলে ডোবেনা, তবে ডুবলে তো আর জীবনও বাঁচে না।
ঃ তোমার ইনফরমেশন আপডেট করা দরকার, কারণ- মনপুরায় নায়ক ছিলো জীবিত এবং নায়িকা আত্মহত্যা করেছিলো বিষপানে। তাই নায়িকার সমাধি মাটিতে এবং প্রেমিক হৃদয়ে হলেও সলিল সমাধি কখনোই হয়নি।

ঃ তা হয়তো হয়নি, কিন্তু তুমি কি জানো মনপুরার এই কাহিনী ধার করা। চতুর্থ শতাব্দীর কবি মিউজিয়াউজ, হিরো ও লিয়েন্ডারের করুন রসের প্রেম গাঁথা নিয়ে একটি কবিতা রচনা করেন। মনপুরার এ কাহিনী সেখান থেকে ধার করা হতে পারে। যেখানে হেলেন্সপন্ট নদীর একপাশে বাস করতো হিরো-অন্যপাশে লিয়েন্ডার। গভীর প্রেমে আসক্ত দু’জন অভিসারে মিলিত হতো রাতের অন্ধকারে। রাতে হিরো মশাল হাতে নদীর ধারে অপেক্ষা করতো, লিয়েন্ডার সে মশালকে অনুসরণ করে চলে আসতো প্রেমিকার কাছে। কিন্তু এক ঝড়ের রাতে হিরোর মশাল নিভে যায়, ফলে আলো দেখতে না পেয়ে অথৈ নদীতে পথ হারিয়ে ডুবে মারা যায় লিয়েন্ডার। এবং এই খবর পেয়ে হিরোও আত্মহত্যা করে নদীতে ডুবে। ফলে সলিল সমাধি ঘটে দু’টি প্রাণের।

: তবে আমাদের ক্ষেত্রে এমন ঘটার সম্ভবনা কম। কারণ- অনেক আগেই বাড়ালে বাঁধ হওয়ায় বড়াল আর খরস্রোতা নয়, তাই তোমার পথ হারানোর সম্ভবনা কম, আর হারালেও তুমি খুঁজে পেতে পারো কোনো বাঁধ, তখন হেঁটে চলে আসতে পারো আমার কাছে। আর যদি মারাই যাও, আমি চতুর্থ শতাব্দীর মেয়ে হিরো নই আমি এ যুগের মেয়ে তাই তোমার মৃত্যু শোকে আমি নদীতে ঝাঁপ নয় বরং ঝাঁপ দেবো নতুন কোনো তরুনের প্রেমে (খানিক হেসে)।
: বিষয়টি এমন ঘটার সম্ভবনা কম, বরং হতে পারে তার উল্টো (আমার মুখে রহস্যের হাসি)।
: মানে (কৌতুহল নিয়ে)।
: হিন্দু পুরানের প্রেম কাহিনী “সাবিত্রী-সত্যবান”। স্বল্পায়ু সত্যবানের জীবন হরণ করতে আসেন যমদূত। কিন্তু প্রেমিকা সাবিত্রী শুরু করেন ক্রন্দন। তিনি কিছুতেই স্বামীর জীবন হরণ করতে দেবেন না। কোনো ভাবেই বাকপটু সাবিত্রীকে যমদূত বোঝাতে পারছিলেন না। সাবিত্রীর কথায় সন্তুষ্ট হয়ে যমদূত সাবিত্রীকে স্বামীর প্রাণ ছাড়া একটি বর চাইতে বললেন। বর পুরণ হলেও সাবিত্রী যমদূতের পিছু ছাড়লেন না। সাবিত্রীকে থামাতে যমদূত তার চারটি বর পুরণ করলেন। যমদূত তার চতুর্থ বরে এসে ফেঁসে যান। চতুর্থ বরে এসে সাবিত্রী সত্যবানের ঔরসে শতপুত্র কামনা করেন, সেটিতেও যমদূত “তথাস্তু” বলে দেন। তখন সাবিত্রী বিনয়ের সাথে স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে বলেন নইলে সাবিত্রী সত্যবানের ঔরসে পুত্রের জননী হবেন কিভাবে! তখন যমদূত নিজের কথা রাখতে ফিরিয়ে দেন সত্যবানের জীবন। তাই আমি যদি বাড়ালে ডুবে মারাও যাই, তুমি নিশ্চয়ই আমার ঔরসে শতপুত্র কামনায় যমদূতের কাছ থেকে জীবন ফিরিয়ে আনবে। আমি তো বাঁচলাম, কিন্তু আমার শত পুত্রের জন্ম দিতে গিয়ে তুমি বাঁচবে কিনা সন্দেহ। তখন তোমার রেখে যাওয়া সন্তানদের লালন পালন করতে আমার তো আরেকজনকে বেছে নিতেই হবে।
: (হতাশায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে)আসলে মানুষ কেন পাখির মতো হয়না!
: তুমি কেন আজ ফ্রাইড রাইচ অর্ডার করলে না?
: কেন?
: বাজারে এখন চালের দাম আকাশ চুম্বী, আর আলুর দাম তুলনামূলক কম। স্বভাবতই ফ্রাইড রাইচে বিক্রেতার লাভ হবে কম, তুলনায় ফ্রেঞ্চফ্রাইয়ে লাভ হবে বেশি। বিক্রেতার কম লাভ যেহেতু ভোক্তা বা ক্রেতার জন্য আদর্শ তাই এ দুর্মূল্যের বাজারে তোমার অর্ডার করা উচিৎ ছিলো ফ্রাইড রাইচ।
: কিন্তু এটা তো আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তাই নয় কি?
: হ্যাঁ, উত্তরটা এখানেই। মানুষ পাখির মতো হয়না, কারণ মানুষের রয়েছে ইচ্ছা-অনিচ্ছার এক আশ্চর্য ক্ষমতা, যা মানুষকে অন্য সবার থেকে স্বতন্ত্র করেছে। তাই মানুষের তুলনা পাখি কেনো অন্যকারো সাথেই হবে না। মানুষের তুলনা শুধুই মানুষ।
: (দীর্ঘ নিঃশ্বাস শেষে) প্রেমিকেরা কেন শাহজাহানের মতো হয়না?
: তাহলে হয়তো মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতো, আর পৃথিবী পরিণত হতো স্থাপনার নগরীতে।
: মানে!
: আসলে পৃথিবীর তিনশ’ কোটি প্রেমিক পুরুষ যদি একেকজন শাহজাহান হতো, তিনশ’ কোটি মমতাজ নিশ্চয়ই মারা যেতো এবং তৈরী হতো তিনশ’ কোটি তাজমহল। একই সাথে নারী না থাকায় প্রজনন এবং বংশবৃদ্ধি হয়ে যেতো বন্ধ।
: আরে বুদ্ধু! আমি আসলে শাহজাহানের হৃদয়ের কথা বলেছিলাম।
: তুমি কি জানো, শাহজাহান একটা ফ্রড। তাই প্রেমের রেফারেন্সে শাহজাহানকে আনা মোটেই উচিৎ নয়। প্রেমিকার মৃত্যুতে শাহজাহান কষ্ট নয় বরং খুশি হয়েছিলেন। তার স্বপ্ন-তাজমহল তৈরীতে এ মৃত্যুর দরকার ছিলো। তবে মমতাজের মৃত্যুতে শাহজাহান যে কষ্ট পাননি তা নয়। মমতাজ বিরহে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আর কোনো দিন মদ ও নারী স্পর্শ করবেন না। সে প্রতিজ্ঞা তিনি রেখেছিলেন তবে মাত্র তিনদিন। এখনো কি তুমি বলবে, সব প্রেমিকেরা কেন শাহজাহানের মতো হয়না? তবে শাহজাহান এটি প্রমাণ করে দিয়েছেন, “প্রেমিকার জন্য তাজমহল গড়া সহজ কিন্তু আজীবন বিশ্বস্ত থাকা কঠিন”।

অনেকক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। বান্ধবীটি ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো সে চোখের ভাষায় বুঝতে চাচ্ছে আমি তার জন্য তাজমহল না গড়ি, কিন্তু আজীবন বিশ্বস্ত থাকতে পারবো কিনা। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে মিউজিক বাজছে “ফলবান নিরবতাই প্রার্থনা, স্বার্থক প্রার্থনা বিশ্বাস, আর সকল বিশ্বাসের অপর নাম প্রেম”। দীর্ঘক্ষণ নিরব আমি অনুভব করলাম সত্যি ওকে আমি অনেক ভালোবাসি।
-পহেলা বসন্ত’১৪১৭।