ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

বসন্তের প্রথম দিনেই কোকিলের ডাক শুনেছিলাম……
কুহু কুহু, কুহু কুহু।।
মিষ্টি ডাক, ভালোবাসার ডাক, প্রেমের ডাক।

হয়তো প্রকৃতির এ ডাকে সারা দিতেই পহেলা ফাল্গুনে বাসন্তি রং শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পড়ে মেয়েরা, যাদের গলায় কিম্বা হাতে থাকে গাঁদা ফুলের মালা। পরের দিন ভালোবাসা দিবসে বাসন্তি রং এর পাশে যোগ হয় গোলাপের লাল রং, সাথে ভালোবাসার ডাক। যে ডাকে হৃদয় ব্যাকুল হয়!

এ দিনে আমায় কেউ ডাকলে, আমি সোজা হাজির হতাম তার দোরগোড়ায়! এ সময় ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে আমি চাইবো- ফাগুনের এই আগুন ঝড়া দিনে বাসন্তি রং শাড়ি শারিহিতা কোন মেয়ে বলবে- “ভালোবাসি”। যার এক হাতে থাকবে লাল গোলাপ, অন্য হাতে ‘ফেরারো রশার’ ইটালিয়ান চকলেট।

কিন্তু একটি জাতি এ সময় ব্যাকুল হয়ে কি চাইতে পারে?
যদিও এ চওয়াটা স্হান এবং কাল ভেদে আলাদা হতে পারে! এটা হতে পারে স্বাধীনতা, হতে পারে গনতন্ত্র কিম্বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি। যেহেতু সময়কাল বসন্ত, আর ষড়ঋতুর বাংলাদেশ। তাই আইকন হিসাবে বাংলাদেশকে রাখা যেতে পারে! যে দেশ লড়েছে ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য, লড়েছে গনতন্ত্রের জন্য।

কোন এক বসন্তের ২১শে ফেব্রুয়ারীতেই রাজপথে রক্ত আর শিমুল ফুল একাকার হয়েছিলো। যে দেশ জিতেছিলো ভাষার যুদ্ধে, স্বাধীনতা যুদ্ধে, জিতেছিলো গনতন্ত্রের যুদ্ধে। এবং প্রায় ১৫ বছর হয়েছিলো নিরবচ্ছিন্ন গনতন্ত্রের চর্চা! তারপর হঠাৎ ছন্দপতনে রাজপথে সাপের মত লাঠিপেটায় মরেছিলো মানুষ, মরেছিলো গনতন্ত্র! সুশাসনের ওঝা হয়েছিলো সেনা সমর্থিত এক অসাংবিধানিক সরকার, যারা দেশ রক্ষার নামে গনতন্ত্রের কফিনে ঠুকতে চেয়েছিলো মাইনাস-টু পেরেক! কিন্তু গনতন্ত্রকামি এদেশের মানুষের সুতীব্র আকাক্ষায় ব্যর্থ হয় মাইনাস-টু। এক নেত্রী দেশে ছিলেন, আরেক নেত্রী দেশে ফেরেন….দেশে ফেরে গনতন্ত্র! যদিও গনতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনটা হয়েছিলো রাজসিক, কিন্তু এখন গনতন্ত্র পথ চলছে খুঁড়িয়ে এবং যথারীতি দূর্বলভাবে…!

এখন পাঠক হিসাবে আপনাকে প্রশ্ন……
এ সময়ে ব্যাকুল হয়ে বাংলাদেশ কি চাইতে পারে?

আপনার উত্তরটা যদি হয়, ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতি’ তাহলে বলবো দূর্ভাগ্য পাঠক আপনার! দূর্ভাগ্য বাংলাদেশের! আপনি সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আর বাংলাদেশ গনতন্ত্রকে সুসংহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনো, তিন-চতুর্থাংশ মেজরিটির দাম্ভিক মহাজোট আর সাংগঠনিকভাবে দূর্বল এবং কর্মকান্ডে অথর্ব চারদলের গনতন্ত্রকে অকার্যকর করার টম এন্ড জেরীর খেলায় ডালপালা মেলছে অসাংবিধানিক সরকারের আশংকা!!! মানুষ পুঁজি হারাচ্ছে শেয়ার বাজারে, জীবন হারাচ্ছে সীমান্তে ও রাজপথে, মধ্যবিত্ত সঞ্চয় হারাচ্ছে দ্রব্যমূল্যে। পুন্জিভূত হচ্ছে ক্ষোভ, আস্থা হারাচ্ছে রাজনীতি।

তবে এ বসন্তে কোকিলের ডাক শুনে আপনি হতে পারেন ব্যাকুল আর বাংলাদেশ হতে পারে আশাবাদি। যে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৮৭% মুসলিম, যার বেশীর ভাগই সুন্নি। ধর্মভীরু এ মানুষগুলো মনস্তাত্বিক ভাবেই আরবমুখী। যে আরব-ইরান মুখীতায় ক্ষেপে গিয়ে মধ্যযুগে কবি আব্দুল হাকিম করেছিলেন অমর কতিপয় পক্তি-

“যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”।

এ আরবমুখিতার ফলে সমভূমির এ দেশে এসেছে মরু সংস্কৃতি। যে প্রান্তরের মানুষেরা লক্ষন বিচার করে চলে…চলে আকাশ দেখে, বাতাশ দেখে, সূর্যের উচ্চতা দেখে। নির্দিষ্ট একটি পাখি দেখলে বোঝে, আশে পাশে নির্দিষ্ট ধরনের সাপ রয়েছে। কোন এক ধরনের ঝোপ দেখলে বোঝে, কাছাকাছি রয়েছে পানির উৎস। তবে পূর্ণের আশায় মরু সংস্কৃতি পালন করা এদেশের মানুষ লক্ষন বিচারে অনুপ্রানিত হতে পারে। ফলে এ বসন্তে কোকিলের ডাক হতে পারে গনতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষন।
যদিও বসন্ত চিনতে দ্বিধাহীন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন-

“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত”

অবশ্য এবার বসন্তে ফুলও ফুটেছে, পাখিও ডেকেছে। তাই লক্ষন বিচারে পাখির ডাক গনতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষন হলে ফুল ফোঁটা হতে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষন! যদিও এ দেশটা একসময় অনেক সমৃদ্ধ ছিলো, গোলা ভরা ধান ছিলো, গোয়াল ভরা গরু ছিলো, পুকুর ভরা মাছ ছিলো! শায়েস্তা খানের আমলেতো টাকায় আটমন ধান পাওয়া যেত! শুনতে অনেকটা রুপকথার মতো শোনায়। আমি কিন্তু একে রুপকথাই বলবো!!! এর গল্পকারেরা কি আমায় বলবেন, এতো কিছুর মধ্যেও কেন মানুষ না খেয়ে মরতো? টাকায় আট মন ধান পাওয়া যেতো ঠিক, কিন্তু সে ধান কেনার মতো একটি টাকা কজনার কাছে ছিলো? বরং প্রকৃত সত্যতো এটাই, গোলা ভরা ধান তাদেরই ছিলো, যাদের ধান রাখবার জন্য গোলা ছিলো। আর সে ধান গোলাতে তুলে দিতো গফুরেরা, যাদের খাবার ধান দুরে থাক, চালে দেবার মতো কিম্বা মহেষকে খাওয়াবার মতো নুন্যতম খড়টুকুও জুটতো না! ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোক কুবেরেরা মাছ ধরতো ঠিকই কিন্তু তাদের আমিষের চাহিদা মিটতো আঁশটের গন্ধে! বুলবুলিতে সামান্য ধান খেলেও, খাজনার টাকা দিতে যাদের অপেক্ষা করতে হতো পরবর্তি রসুনের ওপর! কোথায় ছিলো গোয়াল ভরা গরু! গোলা ভরা ধান! আসলে এগুলো ছিলো একটা বিশেষ শ্রেনীর হাতে। সমৃদ্ধিটাও এই বিশেষ শ্রেনীর কাছে বন্দি।

কিন্তু বসন্ত কোন বিশেষ শ্রেনীর জন্য আসেনি, ফুলও শুধু তাদের জন্য ফোঁটেনি। যদিও নজরুলের প্রিয়ার মতো করে কেউ আপনাকে বলবেনা,

“বেল ফুল এনে দাও চাইনা বকুল, চাইনা হেনা আনো আমেরি মকুল”

তাই তাকে দিতে পারেন গোলাপের পাশাপাশি অর্কিড এবং তার চুলের ছোঁয়া পাবার পাশাপাশি স্বর্গিয় স্পর্শ নিতে খোপায় গুজে দিতে পারেন ল্যাভেন্ডার। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ভূলতে পারেন আপনার আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা। পাশাপাশি, বসন্তে কোকিলের ডাক শুনে ভূলতে পারেন দেশের তলা বিহিন ঝুড়ির অর্থনীতি হবার কথা কিম্বা দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ হবার কথা! বিষ্ময় নিয়ে ভাবতে পারেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অশান্তিকর ঘটনা, ব্যপক দুর্ণীতি এবং একটি প্রায় অকার্যকর পলিটিক্যাল সিষ্টেম যেখানে সরকার ও বিরোধী দল দুই মেরুতে অবস্থান করছে তা সত্বেও দূর্বল গনতন্ত্রের সময়ে বাংলাদেশের বিষ্ময়কর অগ্রগতির কথা। যেখানে বাংলাদেশের ভালো বাস্তব অবস্থা ডেভেলপমেন্ট থিওরির কিছু মূল মতবাদকে অগ্রাহ্য বা অসার প্রমান করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নতির খুব জরুরি পূর্ব শর্ত হচ্ছে- রাজনৈতিক স্হিতিশীলতা এবং কার্যকর শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ন ১৬ কটি মানুষের এ দেশ সেসব ছাড়াই চোখে পড়ার মতো উন্নতি করছে। দক্ষিন এশিয়াতে বাংলাদেশ অধিকাংশ সামাজিক খাতগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যে সব খাতে এ অঞ্চলে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে তার অন্যতম হলো নারী শিক্ষা ও দারিদ্র বিমোচন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমেছে। আর দক্ষিন এশিয়াতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেটি দারিদ্র দূরীকরনে জাতিসংঘের স্থির করা লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (Millenium Development Goals) নামে জাতিসংঘের দেয়া লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র অর্ধেকে কমিয়ে ফেলতে হবে। দক্ষিন এশিয়াতে বাংলাদেশই সেদিকে ঠিকমত এগিয়ে যাচ্ছে……শেয়ার বাজারে অব্যাহত দরপতন, মুদ্রাস্ফিতি, জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সর্বপরি একটি অকার্যকর পলিটিক্যাল সিষ্টেম স্বত্তেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যার প্রধান চালিকা শক্তি- বাড়ন্ত রপ্তানি খাত, শক্ত সামর্থ গারমেন্টস খাত এবং প্রবাসিদের পাঠানো রেমিটেন্স। ফলশ্রুতিতে বিশ্বের ৫০ টি গরিবতম দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগামী ১১ টি দেশের মধ্যে পড়েছে। বিশ্বের ৪ টি শক্তি যারা ইকোনমিক মিরাকল ঘটাচ্ছে- ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া ও চায়নার পেছনে উন্নয়নশীল ৭ টি দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।(গোল্ডম্যান স্যাকস এর মতে)।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র, দুর্ণীতি ও সহিংসতায় আক্রান্ত একটি জাতির জন্য যা কিনা বিষ্ময়কর! আর সেটা সম্ভব হয়েছে এদেশের মানুষের লড়াকু মানষিকতা এবং দূর্বল তবে অব্যাহত গনতন্ত্রের ফলে। এটা ঠিক আমাদের গনতন্ত্রে অনেক ত্রুটি আছে। আবার এটাও ঠিক, গনতন্ত্র দূর্বল করে কিম্বা গনতন্ত্র রোধ করে এ ত্রুটি দূর করা সম্ভব নয়। অব্যাহত ও অধিকতর গনতন্ত্র চর্চার ফলেই এ ত্রুটি দূর করা সম্ভব।
আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি?

আপনি যদি বসন্তে ফুল ফোঁটা দেখে সমৃদ্ধির বিষয়ে নিশ্চিত হন তাহলে জেনে রাখুন, ফুল ফোঁটা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষন হতে পারে কিন্তু সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে না! অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আমাদের সকলকে বিভেদের উর্ধে থেকে স্ব স্ব কাজ যথাযত ভাবে করতে হবে। আর যে কাজের পরিবেশের জন্য চাই গনতন্ত্র, প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর শাসন ব্যবস্থা। তাই এ বসন্তে বাংলাদেশ চাইতে পারে সুসংহত গনতন্ত্র। আর তা হতে পারে সকল দলের ও মতের সদিচ্ছা ও সহবস্থানের মাধ্যমে। কোকিলের ডাক শুনে এ জাতি ভাবতে পারে, শান্তিপূর্ন রাজনীতি ও কার্যকর সংসদের কথা।

কিন্তু কোকিলের ডাক আমাকে করেছে ব্যাকুল! আমি ভাবতে চাই, বাসন্তি রং শাড়ি পরা সেই অধরা মেয়ের কথা। আমি তাকে না ছুলেও যে আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে। সে ডাকলে আমি সোজা হাজির হতাম তার দোরগোরায়। আমি জানি সে একদিন ডাকবে….। আমার হাতে গোলাপ আর ফেরারো রশার তুলে দিয়ে বলবে “ভালোবাসি”। আমি বলবো, ভালোবাসি আমিও।