ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

লালন শাহ কে নিয়ে করা মনের মানুষ ছবি দেখে বুঝেছিলাম- নানা চড়াই উৎরাইয়ের সাধক জীবনে লালন তার মনের মানুষের সন্ধান পাননি। তাই তো তিনি গেয়েছেন-

মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে..

আমি ভাবছিলাম- কোন ব্যাক্তির মতো, দেশেরও কি মন আছে? দেশকে আমরা বলি দেশমাতৃকা। অর্থ্যাৎ দেশ তো মা। তাই দেশমাতারও মন আছে নিশ্চয়ই! আছে মনের মানুষ! আচ্ছা, স্বাধীনতার ৪১ বছরে বাংলাদেশ কি সন্ধান পেয়েছে তার মনের মানুষের? অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তরে রাজনৈতিক ও ব্যাক্তি কেন্দ্রিক ঝগড়ার সূত্রপাত হতে পারে! তাই বাংলাদেশ মনের মানুষের সন্ধান পেয়েছে কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ! তবে আলোকিত মানুষের সন্ধান যে পেয়েছে তা প্রশ্নাতীত।

সন্ধান পাওয়া সেই আলোকিত মানুষ, যিনি আলোকিত মানুষ গড়ারও কারিগর। তিনি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। যিনি আগুনের পরশমনি নিজে ছুঁয়েছেন এবং বই পড়া আন্দোলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারা দেশে।

অথচ কি আশ্চর্যজনক ভাবে, তার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে অপমানসূচক ভাষায় তার মতো সজ্জন সাদামনের মানুষের গায়ে অশালীন আক্রমনে কালিমা লেপন করা হলো!!! লোডশেডিং এর দেশে এ আলোকিত মানুষকে আঁধারে ঢেকে ফেলা হলো!!!

শনিবার (৩রা জুন) টিআইবির আলোচনা সভায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘সাংসদ ও মন্ত্রীরা চোর-ডাকাতের মতো আচরণ করেন এবং শপথ ভঙ্গ করেন’– এই বক্তব্য দেন বলে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়। ওই বক্তব্য ধরে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে সংসদে অনির্ধারিত আলোচনার সূত্রপাত করেন স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম। এরপর মুজিবুল হক চুন্নু ও শেখ সেলিম এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।
তাদের বক্তব্যের সারকথা ছিলো- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বক্তব্য অযাচিত, দুঃখজনক, দায়িত্বহীন। এটা গণতন্ত্র ও সংসদের ওপর আঘাত। সংসদের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বুদ্ধিজীবীরা অনেক উপদেশ দিতে পারেন। বিপদে তাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। উনারা কী করেন, এত টাকা কোথা থেকে খরচ করেন? এদের টাকার উৎস কোথায়? প্রতি সপ্তাহে একটা-দুইটা সেমিনার করেন, এত দামি গাড়িতে কী করে চড়ে!!!

স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী আলী আশরাফ সাংসদদের বক্তব্যকে যথার্থ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন- সংসদকে অবমাননার মাধ্যমে দেশের জনগণ ও সংবিধানকে অবমাননা করা হয়েছে। এতে সাংসদদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সে জন্য তাঁকে (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) বিশেষ অধিকার কমিটির মাধ্যমে নোটিশ করে আমরা এ সংসদে তলব করতে পারি। কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

তথ্যসুত্র১ এবং তথ্যসুত্র২

আমি ভাবছিলাম- চোর ডাকাতদের মত বলায় সংসদকে অবমাননা করা হল, সংবিধানকে অবমাননা করা হল আবার সাংসদদের বিশেষ অধিকারও ক্ষুণ্ণ হল সর্বোপরি সাংসদদের জাত চলে গেল! লালন কি এমন পরিস্থিতিতেই গেয়েছিলেন-

জাত গেলো, জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখানা…
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কি ক্ষতি হয়!
লালন বলে, জাত কারে কয়?

সতিৎ, জাত কারে কয়? চোর ডাকাতের মতো বলায় জাত যায়! কিন্তু যারা দিনে দুপুরে পুকুর চুরি আর রাতে নদী-সমুদ্র ডাকাতি করে, তাতে জাত যায় না? কিছু দিন আগেই সংসদে শাম্মি আখতার-আশফিয়া পাপড়ি, নারী সাংসদদের কোলে বসিয়ে- পাজকোলে তুলে দিলেন তাতে জাত যায় না? সংসদেই যখন সাংসদেরা মারতে তেড়ে যান, বাপ তুলে কথা বলেন তখন জাত যায় না? কিন্তু গনমানুষের মনের কথা শুনলে তাদের জাত যায়!!!

তবে এ ন্যক্কারজনক ঘটনার আরো বড় বিষ্ময় লুকিয়ে ছিলো! যা কিনা সাংসদদের মর্যাদা কিম্বা জাত রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট। কারন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সেদিন সাংসদদের অধিকার ক্ষুণ্ন তো দূরের কথা, সেদিনের বক্তব্যে তিনি সাংসদ শব্দটি উচ্চারণই করেননি। তাঁর ওই বক্তব্যের রেকর্ড থেকে জানা যায় তিনি বলেছিলেন-

‘চোর যে চুরি করে, ডাকাত যে ডাকাতি করে, সেটি কি দুর্নীতি? আমার ধারণা, এটা দুর্নীতি নয়। কারণ, দুর্নীতি শব্দের মধ্যে আরেকটি শব্দ লুকিয়ে আছে। শব্দটি হলো ‘নীতি’। চোর বা ডাকাতের কাজ ঠিক দুর্নীতি নয়। কারণ, তাদের কোনো নীতিই নেই। সুতরাং, দুর্নীতি সেই মানুষটি করে, যার নীতি আছে। একটা উদাহরণ দিই। যেমন—যদি একজন মন্ত্রী এই বলে শপথ নেন যে তিনি শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ না করে সবার প্রতি সমান বিচার করবেন, কিন্তু পরে তিনি সেটি না করেন, সেটা হবে দুর্নীতি।’

তথ্যসুত্র

আমি ভাবছিলাম, এখন কি বলবেন, ইনকিলাব পত্রিকাওয়ালারা? কি বলবেন, আমাদের বিশেষ অধিকারওয়ালা সাংসদেরা? যারা কোনরূপ যাচাই বাছাই না করেই, একজন আলোকিত মানুষকে অপদস্থ করে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। এখন তারা কি স্যারের কাছে ক্ষমা চাইবেন? আমার মনে হয়না তারা ক্ষমা চাইবেন!!! কারন সায়ীদ স্যারের ব্যর্থতা সম্ভবত এটাই যে, যে আলো তিনি সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন, সে আলো আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে পৌঁছেনি, সম্ভবত কখনো পৌঁছাবে না!

সায়ীদ স্যারের ঘটনায় এক বুক কষ্ট নিয়ে শুনছিলাম- লালন শাহ্’র গান! ভাবছিলাম আধ্যাত্মবাদ সম্পর্কে! বাড়ীর পাশে আরশি নগর সম্পর্কে! স্রষ্টা তো মানবের মাঝে বিরাজ করেন।
আমার মাঝে আমি অনুভব করছিলাম এক স্রষ্টার উপস্থিতি!

আমি তাকে বললাম- প্রভু, মানির মান তো তুমিই রাখো। তাহলে সায়ীদ স্যারের মতো মানুষকে অপদস্থ করলে কেন?

প্রভু বললেন- সে তো সাংসদ ও মন্ত্রীদের চোর-ডাকাত বলেছে। সে কি জানে না, কানাকে কানা বলিতে নাই, ন্যাংড়াকে ন্যাংড়া বলিতে নাই তেমনি চোর-ডাকাতদেরও চোর-ডাকাত বলিতে নাই।

– কিন্তু তিনি তো তা বলেন নাই। আমি বিষ্ময় নিয়ে প্রতিবাদ করলাম

প্রভু বললেন- ছোট লোকের স্বভাব কি জানো?

-কি? আমি প্রশ্ন করলাম

-তারা যে কোন কথাকেই নিজের দিকে টানিয়া লয়। প্রভু জবাব দিলেন।