ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

 

আর দশটা বাঙালি শহুরের মত আগ্রহ থেকেই প্রতিবছর বাজেট এর প্রস্তাবনা পড়ারঅভ্যেস আছে। সেটা অর্থনীতির মারপ্যাঁচকে বুঝতে পারার যতটা আগ্রহ নিয়ে শুরু হয় তার থেকে কোন অংশেই কম থাকে না বুঝতে না পারার সীমাবদ্ধতা। আর সে জন্যই হয়ত আর দশটা সাধারন মানুষের মত আগ্রহ চাপা পড়ে যায় বাজেট বাস্তবায়ন শুরুর আগেই, শুধু মাত্র কী কী জিনিষের দাম কমতে আর বাড়তে পারে সেই ফর্দের মাঝে। তারপরও আগ্রহ থেকে যায় সবার।

খুব বেশি স্বপ্নবিলাশি না হলেও প্রবৃদ্ধির প্রায় এক অসম্ভব লক্ষ্য নিয়ে মূলত “কর”-নির্ভর এক বাজেট এসেছে এবার । মোটের উপর প্রায় কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া এবারের বাজেট প্রস্তাবনাতে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ রাখা হয়ছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য। গত অর্থবছরে মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ রাখা হয়েছিল শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য। আনুপাতিক হারের বিবেচনায় এবারের প্রস্তাবনায় বরাদ্দ কমেছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ । এটা ঠিক বাজেটের আকার বৃদ্ধিকে আমলে এনে অংক কষে এটা দেখান সম্ভব যে এবার আনুপাতিক বরাদ্দ কমলেও টাকার অংকে বাড়ছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের আকার। কিন্তু মূল্যস্ফিতিকে আমলে এনে এবারের বরাদ্দ আসলে প্রকৃত বৃদ্ধি কিনা সেই প্রশ্ন খুব সহজেই সামনে চলে আসে।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত একটি মিশ্র খাত যেখানে শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ আছে, ঠিক তেমনি ভাবে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে তেমনি একটি বিভাগ “প্রযুক্তি” । দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য দুটো বিভাগেরই আছে সমান গুরুত্ত।

“ডিজিটাল বাংলাদেশ” – এর স্বপ্নদ্রষ্টা এই সরকারের বাজেট কততা তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব সেটা দেখার কিছুটা প্রয়োজনীয়তা আছে ।

১. কর অবকাশ
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০১৯ শাল পর্যন্ত রয়েছে কর অবকাশ তথা TAX HOLIDAY সুবিধা। এবারের (২০১৫-২০১৬) সালের বাজেটে সেই সুবিধাকে বাড়িয়ে ২০২৮ শাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

২. মোবাইল সেবা ব্যবহারে অতিরিক্ত শুল্ক
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী পাঁচ শতাংশ শুল্ক আরপের প্রস্তাব করা হয়েছে সিম ও রিমের মাধ্যমে প্রাপ্ত সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পাঁচ শতাংশের চাপ পরবে ১২ কোটি ৪৭ লাখের সাবসক্রাইবার বেস তথা প্রান্তিক ভোক্তার কাছে। একথা মানতে হবে কয়েকটি প্রধান শহর বাদ দিয়ে দেশের সব শহর ও গ্রামে ইন্টারনেট এর চাহিদার বিপরীতে গুনগতমান বজায় রেখে যোগান দিচ্ছে মোবাইল সেবা প্রদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলো । অনেক জেলা শহরের বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও অফিস নির্ভর করে মোবাইল ইন্টারনেট এর উপর, এমনকি বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পতেও রয়েছে মোবাইল ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীলতা । জেলা শহরের যে যুবক বা যুব মহিলা রাত জেগে কাজ করছে আউট-সোর্সসিংয়ের তার জন্য কম মূল্যে ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে দেশের মূল কানেক্টিভিটির অনেকখানি (কারো মতে ৮০ শতাংশ , কারও হিসাবে আরো বেশী) অব্যবহিত সেখানে মোবাইল সেবার উপর ৫% শুল্ক ইন্টারনেট ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করবে বলেই অনুমান করা যায়। একই সাথে মোবাইল ব্যাংকিং এর প্রসারের ক্ষেত্রে ৫% অতিরিক্ত খরচ কতটা সহনশীল সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

৩. নতুন সিমের শুল্ক হ্রাস
নতুন মোবাইল সিমের শুল্ক হার ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০০ টাকা করার প্রস্তাব রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। নিঃসন্দেহে টেলেডেন্সিটি বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে সম্ভব এই পদক্ষেপ। তবে নতুন মোবাইল সিমের উপর আদতে কোন শুল্ক রাখার প্রয়োজন আছে কিনা সেটা এখন প্রশ্নের। শুন্য শুল্ক সন্দেহাতীত ভাবে উপকৃত করত মোবাইল অপারেটর কম্পানিএবং ব্যবহারকারি উভয়কে।

৪. হাই-টেক পার্কে কর মওকুফ
২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটে সংযোজন কর মওকুফের প্রস্তাব ছুয়ে গেছে হাই-টেক পার্ককে। বর্তমানে দুটি হাই-টেক পার্ক (কালিয়াকৈরে হাই টেক পার্ক স্থাপনসহ যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক) ও বারটি আইটি ভিলেজ প্রতিস্থার যে প্রকল্পগুলো আছে সরকারে সেগুলকে আরো বেগবান করতে সেই সাথে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হাই-টেক পার্কের ডেভলপারদের বিদ্যুৎ বিল এবং ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীদের যোগানদার সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্যে সংযোজন কর (মূসক) মওকুফের প্রস্তাবনা এসেছে এবারের বাজেটে। এই প্রস্তাবনা হাই-টেক পার্কের ইনভেস্টরদের বিনিয়োগ ব্যয় (ক্যাপিটাল এক্সপেনদিচার) ও পরিচালনা ব্যয় (অপারেটিং এক্সপেনদিচার) উভয়ই হ্রাস করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

৫. ডেভেলপারদের জন্য সু-সংবাদ
সিস্টেম সফটওয়্যার এবং ডেভেলপমেন্ট সফটওয়্যার ব্যতিত অন্যান্য সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে এবারের বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের। এর ফলে বিনা শুল্কে আমদানি করা যাবে অপারেটিং সিস্টেম, ডাটাবেজ, মিডলওয়্যার ও ডেভেলপমেন্ট টুলস। কিন্তু কাস্টমাইজ করে সফটওয়্যার আমদানি করার ক্ষেত্রে গুনতে হবে ৫ শতাংশ শুল্ক । আপাতদৃষ্টিতে ডেভেলপারদের জন্য এটি সু-সংবাদ। দেশীয় সফটওয়্যারের বাজার বিকাশের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়।

৬. সেমিকন্ডাকটরের উপর শুল্ক
বেশ কিছু আমাদানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে শুল্ক আরোপের ফলে । এই পণ্যের তালিকায় আছে সেমিকন্ডাকটর বা অর্ধ-পরিবাহী কাঁচামাল। যেহেতু আমাদের দেশে হার্ডওয়্যার উৎপাদন শিল্প খুব বেশী বিকাশিত নয়, সেই কারনে অর্ধ-পরিবাহী কাঁচামালে শুল্ক আরোপ তেমন কোন প্রভাব রাখবে এমনটা আশঙ্কা করা যায় না। তবে বর্তমানে দেশের ও বিদেশের বাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত বা বাংলাদেশে সনযুক্ত এমন ইলেক্ট্রনিক্স ও কম্পিউটার পণ্যের সংখ্যা খুব একটা কম না। এমন অবস্থায় অর্ধ-পরিবাহী কাঁচামাল বা সেমিকন্ডাকটরের উপর শুল্ক মওকুফ হতে পারত নতুন একটি শিল্প খাতের জন্য উৎসাহব্যাঞ্জক ।

৭. মাল্টিমিডিয়া ও নিরাপত্তা খাতে উৎসাহ
এবারের বাজেটে কর হ্রাসের কথা বলা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যবহার করা ক্যামেরার উপর থেকে। ফলে দাম কমতে পারে সিসিটিভি, আইপি ক্যামেরা ইত্যাদির যেগুলো মূলত ব্যবহার করা হয়ে থাকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম হিসাবে, একই সাথে দাম কমার তালিকাতে থাকছে ওয়েবক্যাম যা ব্যবহৃত হয় মাল্টিমিডিয়া ও কমুনিকেশন অ্যাপারেটাস হিসাবে। তবে সাউন্ড রেকর্ডিং বা রিপ্রোডিউসিং অ্যাপারেটাসের শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব মাল্টিমিডিয়া খাতকে নিরুৎসাহিত করার আশঙ্কা তৈরি করে।

৮. আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের মূসক প্রত্যাহার
আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে উৎসাহিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সুপারিশের ছিল কিছু যন্ত্রাংশের উপর থেকে আমদানি মূসক প্রত্যাহারের। সেই সুপারিশকে আমলে এনে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন আইসিটি ইনফ্রাইস্ট্রাকচারে ব্যবহার্য্য পণ্যের উপর থেকে পনের শতাংশ মূল্য সংযোজন কর মওকুফের। যার ফলে আমদানি ব্য্য কমবে মাল্টিপ্লেক্সার, অপটিক্যাল ফাইবার প্ল্যাটফর্ম, এনএমএস ইত্যাদির।

৯. কারিগরি শিক্ষায় বিশাল বরাদ্দ

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ। প্রতিশ্রুতি আছে ১০০টি উপজেলায় একটি করে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপনের। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে গার্লস টেকনিক্যাল স্কুল চালু করার। ২৩টি উপজেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের। ৪টি বিভাগীয় শহরে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্প শুরু করার সকল বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের।
যদি প্রতিটি কারিগরি বিদ্যালয়ে বা ইনস্টিটিউটে আইসিটি সংক্রান্ত একটি করেও কোর্স থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর পর আমরা পেতে পারি কিছু তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কিছু জনবল।

১০. সর্ব মোট বরাদ্দ
ভাগাভাগির অঙ্কে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা আর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ করার প্রস্তাবনা দেখার যায় ২০১৫-১৬ শালের বাজেট প্রস্তাবে। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বরাদ্দ তিন হাজার পাঁচ শত সাতাশি কোটি টাকা । টাকার অঙ্কটা নেহাত কম নয়।

পরিশেষে, যদি মোটা দাগে দেখা হয়, কেমন হলো তথ্য-প্রযুক্তির জন্য এবারের বাজেট তাহলে বলতে হয়, আশাবাদি হবার মত অনেক কিছু আছে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোগতাদের জন্য। তবে আমজনতার তথা ভোক্তাদের জন্য নেই সেরকম কোন সু-সংবাদ। সামস্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মুখ্য করে রচিত আয়-ব্যয়ের প্রস্তাবনায় তথ্যপ্রযুক্তির জন্য রাখা বরাদ্দ ও পরিকল্পনাগুলো আনতে পারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যার সুফল হয়ত ভোগ করা যাবে নিকট ভবিষ্যতে।

 

***

মূল লেখা : http://www.banglatribune.com/news/show/100796