ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

প্রথমেই কিছুটা কমিয়ে আনা যাক আলোচনার সীমারেখা । পুরো লেখাটিতে মাতৃভাষা বলতে বুঝবো কোন শিশুর জন্মের সময় তার মা যেই ভাষাকে নিজের ভাব প্রকাশের প্রাথমিক ভাষা হিসাবে নির্দেশ করেন, বাংলা ভাষা হল সেই ভাষা যা বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি কর্তৃক স্বীকৃত এবং যা বুননগত দিক থেকে ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা শ্রেনির অন্তর্গত।

বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দারা ব্যবহার করেন এমন কতগুলো ভাষা আছে সেই প্রশ্নের যেমন কোন দাপ্তরিক উত্তর নেই, নেই কোন হিসেবনিকেশ, তেমনিই বাংলাদেশে এই পর্যন্ত (অন্তত স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত) তার কতগুলো ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে (লৈখিক বা মৌখিক রূপ থেকে) তার কোন সরকারী হিসেব নেই। তবে সোজা-সাপ্টা হিসাবে যদি বলি, তাহলে বাংলাদেশে পঞ্চাশ বা তার কিছু বেশি প্রচলিত ভাষা থাকা কথা। এবং যার মাঝে একমাত্র “বাংলা” ভাষা ছাড়া অন্য প্রায় সবগুলো ভাষাইগুলো বাংলাদেশের ভৌগলিক সিমারেখায় বিলুপ্তপ্রায় বা সঙ্কটাপন্ন । যেহেতু বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে আদিবাসী (“ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” বা “উপজাতি” যে আগ্রাসি শব্দে বলা হোক না কেন) গোষ্ঠীর সংখ্যা ছাপ্পান বা তারবেশি, সেই হিসাবে বাংলাদেশে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা পঞ্চাশ বা তার বেশি এটি ধরে নেয়া খুব বেশি যুক্তিহীন বলে মনে হয় না।

বাংলা ভাষা যেখানে, দাপ্তরিক ভাবে অনেকাংশে অস্তিত্তের সংকটে ভুগে, সেখানে “আদিবাসী”দের ভাষার অস্তিত্তের সংকট গাণিতিক হিসাবে কিছুটা স্বাভাবিক । দাপ্তরিক ভাবে সকল প্রকার সরকারী মাধ্যমে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও অনেকাংশে কিছুটা বৈসাদৃশ্য আমরা দেখে থাকি । যেমন নিম্ন আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন থাকলেও, উচ্চ আদালতে দৃশ্যটা অন্যরকম, সেখানে ইংরেজীর ব্যবহার একচেটিয়া । এমনকি আদালতের শুনানি, রায় সবকিছুই ইংরেজীতে। হাতেগোনা দু’য়েকটি মামলা ছাড়া এখন পর্যন্ত এই অবস্থার খুব বেশি কোন উন্নতি দেখা যায় না । যদিও ১৯৮৭ শালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কে আমালে এনে ২০১১ সালে আইন কমিশন উচ্চআদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেয়।

অন্যদিকে আদিবাসীদের মাঝে পঞ্চাশটি বা তার বেশি ভাষার প্রচলন আছে দাবি করলেও, আধুনিক ব্যকরণের নিয়ম-নীতি ও ভাষা তত্তের পুস্তকি মানদণ্ডে অনেক ভাষাকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে, হয়তো বা সেটা কোন কোন বহুল প্রচলিত ভাষার আঞ্চলিক রূপ বলে ধরে নেয়া হবে। আবার কোন কোন ভাষার লৈখিক রূপ নেই । এমনিতেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব প্রান্তিক সংস্কৃতির উপাদানসমুহকে একের পর এক হুমকির মুখে ফেলে দেয়, আর সেই সাথে অভিবাসন প্রক্রিয়া ভাষার ব্যবহারকে অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস করে (যদিও বা অনেক তাত্ত্বিক অভিবাসন প্রক্রিয়াকে ভাষার বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসাবে দেখেন, মূলত প্রান্তিক সংস্কৃতির লালন-পালনগত মাপকাঠি এই তর্কগুলকে উজ্জীবিত করে ক্রমাধারে)।

বাংলাদেশে আদিবাসীভাষাগুলোর মাঝে ব্যকরনগত স্বীকৃতি আছে বম, চাক, ম্রো ইত্যাদি ভাষার ।এগুলর মাঝে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, খাসী সহ অনেকগুল ভাষা আছে যেগুলো বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত বা মায়ানমার এ প্রচলিত। সমস্যার শুরুটা হল বাংলা ভাষার বিস্তার নিশ্চিত করার সময়, আদিবাসীভাষাগুলোর সংরক্ষনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়া। এসব ভাষার বেশিরভাগের জন্য নেই প্রাতিষ্ঠানিক পাঠব্যবস্থা, নেই প্রচলিত সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য কোনো উদ্যোগ। ফলাফল ভাষার বিলুপ্তি। (অস্বীকার করব না, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তাল মেলাতে দুয়েকটি ভাষায় কিছু পাঠ্য-পুস্তক রচনার প্রচেস্থা দেখা যায়, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।)