ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

আমরা আজকে অনেকেই লিনাক্সের নাম জানি বা জানি না। সে যাই হোক আমার আজকের লেখা শুধুই লিনাক্স নিয়ে। যা নিয়ে আজকে গুগল মোবাইল কম্পিউটিং এ আধিপত্ব তৈরি করে নিয়েছে। যা দিয়ে আজকে পৃথিবীর ৯০% এর ও বেশি সার্ভার চলছে। আমাদের অনেকের ধারনা লিনাক্স একটি অপারেরিং সিস্টেম, কিন্তু এটি ভুল। লিনাক্স কোন অপারেটিং সিস্টেম নয়। এটি একটি কার্নেল।

সংক্ষেপে
লিনাক্স (ফিনীয়: Linux লীনুক্স, আ-ধ্ব-ব: /ˈliːnuks/) একটি ইউনিক্স সদৃশ কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম যা ফ্রি এবং মুক্তসোর্স সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং বিতরন মডেলের অধীনে তৈরি। মূলত লিনাক্স কোন অপারেটিং সিস্টেম এটি একটি কার্নেলের নাম। কার্নেল হল একটি অপারেটিং সিস্টেমের প্রাণের সমতুল্য। প্রাণহীন মানুষ যেমন শুধুই রক্ত মাংশের একটি পিন্ড ঠিক তেমনে অপারেটিং সিস্টেম ছাড়া একটি কম্পিউটার বা যে কোন ডিজিটাল ডিভাইস আর কার্নেল ছাড়া অপারেটিং সিস্টেম একই পর্যায়ে পরে। এটি ১৯৯১ সালের ৫ই অক্টবর লিনুস তোরভাল্দ্‌স কর্তৃক মুক্তি পায়। একটি লিনাক্স ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম তার কাজের ধরন এবং এর সাথে থাকা সফটওয়্যার অনুযায়ী আলাদা হয়ে থাকে।

ইতিহাস
লিনাক্স জন্মের আগে যে কোন অপারেটিং সিস্টেম ছিলো না তা নয়। কিন্তু সেই অপারেটিং সিস্টেম কোনটাই একটি কম্পিউটারের সম্পূর্ণ শক্তি ব্যবহার করতে পারতো না। লিনাক্সকে বলা হয় ইউনিক্স সদৃশ কিন্তু ইউনিক্স নয়। তাহলে আগে জেনে নেই ইউনিক্স কী? ইউনিক্স একটি প্রপাইটরি অপারেটিং সিস্টেম। যা ১৯৬৯ সালে এটি&টি বেল ল্যাবের কিছু কর্মচারী দ্বরা ডেভলপ করা হয়। এটি পৃথীবির সবচেয়ে শক্তিশালী অপারেটিং সিস্টেম হিসাবে এখন সমাদৃত।

১৯৮৩ সালে রিচার্ড স্টলম্যান গনু প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন। গনু প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিক্স-সদৃশ অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা। ৯০-য়ের দশকের শুরুর দিকেই গনু এই অপারেটিং সিস্টেমের প্রায় সমস্ত দরকারী উপাদানগুলো বানাতে বা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। উপাদানগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন কোড লাইব্রেরি, কম্পাইলার, টেক্সট সম্পাদক (টেক্সট এডিটর), একটি ইউনিক্স-সদৃশ খোলস (শেল), এবং আরও অন্যান্য সফটওয়্যার। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তখনও বাকি ছিল, আর তা হল কার্নেল।

১৯৯১ সালে, লিনুস তোরভাল্দ্‌স নামের এক ফিনীয় ছাত্র ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিংকি-তে পাঠরত অবস্থায় শখের বশে একটি কার্নেলের ওপর কাজ শুরু করেন। এই কার্নেলটিই পরে লিনাক্স কার্নেলে রূপ নেয়। লিনুস প্রথমদিকে মিনিক্স নামের একটি সরলীকৃত ইউনিক্স-সদৃশ অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে কাজ শুরু করেন। মিনিক্সের রচয়িতা ছিলেন এন্ড্রু টানেনবম, এক প্রখ্যাত অপারেটিং সিস্টেম ডিজাইন প্রশিক্ষক। তবে টানেনবম তাঁর মিনিক্স সিস্টেমের ওপর সরাসরি কাজ করে উন্নতিসাধনের অনুমতি দিতেন না। ফলে লিনুসকে মিনিক্সের সমতুল্য একটি সিস্টেম বানাতে হয়। লিনুস প্রথমে আইএ-৩২ এসেম্বলার ও সি-এর সাহায্যে একটি টার্মিনাল এমুলেটর রচনা করেন ও এটিকে কম্পাইল করে বাইনারি আকারে রূপান্তরিত করেন, যাতে এটি যেকোনো অপারেটিং সিস্টেমের বাইরে ফ্লপি ডিস্ক থেকে বুট করে চালানো যায়। টার্মিনাল এমুলেটরটিতে একসাথে দুইটি থ্রেড চলত। একটি থ্রেড ছিল সিরিয়াল পোর্ট থেকে ক্যারেক্টার পড়ার জন্য, আর অন্যটি ছিল পোর্টে ক্যারেক্টার পাঠানোর জন্য। যখন লিনুসের ডিস্ক থেকে ফাইল পড়া ও লেখার প্রয়োজন পড়ল, তখন তিনি এই এমুলেটরটির সাথে একটি সম্পূর্ণ ফাইলসিস্টেম হ্যান্ডলার যোগ করেন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি এটিকে একটি সম্পূর্ণ অপারেটিং সিস্টেম কার্নেলে রূপ দেন, যাতে এটিকে পজিক্স-অনুগামী সিস্টেমসমূহের ভিত্তিরূপে ব্যবহার করা যায়। লিনাক্স কার্নেলের প্রথম সংস্করণ (০.০.১) ইন্টারনেটে প্রকাশ পায় ১৯৯১ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর। কিছুদিন পরেই ১৯৯১-এর অক্টোবরে এর দ্বিতীয় সংস্করণটি বের হয়। তখন থেকে সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার ডেভেলপার লিনাক্সের এই প্রজেক্টে অংশ নিয়েছেন। এরিক রেমন্ড-এর লেখা প্রবন্ধ The Cathedral and the Bazaar-এ লিনাক্স কার্নেলের (ও অন্যান্য সমজাতীয় সফটওয়্যারের) উন্নয়নপ্রক্রিয়ার মডেল সম্পর্কে আলচনা করা হয়েছে।

নামকরন
“লিনাক্স” নামটি কিন্ত লিনুস তোরভাল্দ্‌সের দেওয়া নয়। লিনাক্সের নামকরণের কৃতিত্ব আরি লেমকের। লেমকে হেলসিংকি ইন্সটিটিউট অফ টেকনলজিতে ftp.funet.fi নামক একটি এফটিপি সার্ভারের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সার্ভারটি ছিল ফিনীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা নেটওয়ার্ক-এর একটি অংশ, আর এই নেটওয়ার্ক-এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ছিল লিনুসের ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিংকি। লিনুস যখন তার অপারেটিং সিস্টেম প্রকল্পটি এই সার্ভারটিতে রক্ষা করার জন্য লেমকে-কে দেন, লেমকে তখন তা একটি ডিরেক্টরিতে রাখেন ও ডিরেক্টরিটির নাম দেন “লিনাক্স”, অর্থাৎ “লিনুসের মিনিক্স” কথাটির সংক্ষিপ্ত রূপ। লিনুস অবশ্য নিজে প্রকল্পটির নাম “ফ্রিক্স” (freax) রাখতে চাচ্ছিলেন, যা ছিল “ফ্রি” (বিনামূল্য) ও ইউনিক্সের শেষ অক্ষর “এক্স”-এর সম্মিলিত রূপ। শেষ পর্যন্ত লেমকের দেয়া লিনাক্স নামটিই টিকে যায়।

মাসকট
লিনাক্সের ম্যাসকট ও লোগো হচ্ছে টাক্স নামের পেঙ্গুইন। ১৯৯৬ সালে ল্যারি ইউয়িং-এর আঁকা একটি ছবি থেকে টাক্স আঁকার অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। টাক্স ছাড়াও ওএস-ট্যান ও আরও কিছু লিনাক্স প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র রয়েছে, তবে এগুলো খুব প্রচলিত নয়।

লাইসেন্স
লিনাক্স কার্নেল ও বেশির ভাগ গনু উপাদান GNU General Public License (জিপিএল)-এর আওতাধীন। জিপিএল-কৃত কোড-উৎসের সব সংশোধন ও এর থেকে উদ্ভূত সব কাজও জিপিএল-এর আওতাধীন হয়। লিনুস এ-সম্পর্কে ১৯৯৭ সালে বলেন, “লিনাক্সের জিপিএল-করণ নিশ্চিতভাবেই আমার করা সেরা কাজ।“ লিনাক্সের অন্যান্য সহযোগী ব্যবস্থাগুলো অন্য লাইসেন্স ব্যবহার করে, যেমন অনেকগুলো কোড লাইব্রেরি এলজিপিএল ব্যবহার করে, আর এক্স-উইন্ডো ব্যবস্থা এমআইটি লাইসেন্স ব্যবহার করে।

কি কাজে ব্যবহৃত হয় এই লিনাক্স
লিনাক্স মূলত একটি শখের ফসল। এর নির্মাতা শখের বসে এটি বানিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য পিসির সম্পূর্ণ ব্যবহার। কিন্তু জন্মের পর থেকেই লিনাক্স ব্যবহার হতে থাকে সার্ভার কম্পিউটারগুলো তে। কিন্তু এখন লিনাক্স ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় সকল ডিজিটাল ডিভাইসে। একটি ছোট ক্যামেরা বলুন আর সুপার কম্পিউটার বলুন, মোবাইল বলুন আর একটি ওয়েব সার্ভার বলুন লিনাক্সের পদচারনা সকল জায়গাতেই বিরাজ মান। যেমন
*ইন্টেল/এএমডি x৮৬
*x৮৬-৬৪ (এএমডি’র এএমডি৬৪ এবং ইন্টেলের ইএম৬৪টি)
*আইএ-৬৪
*এআরএম
*ডিইসি আলফা
*ইএসএ/৩৯০
*মোটোরোলা ৬৮কে
*মিপ্স
*পিএ-রিস্ক
*পাওয়ারপিসি
*সুপারএইচ
*স্পার্ক
কমিউনিটি
লিনাক্স একটি ওপেন সোর্স প্রজেক্ট। আর যে কোন ওপেন সোর্স প্রজেক্টের মূল হল কমিউনিটি। লিনাক্স এর ব্যতিক্রম নয়। লিনুস লিনাক্স কার্নেল তৈরি করলেঔ এর উন্নয়নের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান কমিউনিটির।

বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে, স্থানীয় সহযোগী যারা লিনাক্স ইউজার গ্রুপ (লাগ) নামে পরিচিত তারা তাদের পছন্দের ডিস্ট্রিবিউশন প্রচারণার কাজ করে, সেই সাথে ফ্রি সফটওয়্যার নিয়েও প্রচার চালায়। তারা দেখাসাক্ষাতের আয়োজন করে, প্রদশর্নী, প্রশিক্ষণ, কারিগরী সহায়তা এবং অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটলে নতুন ব্যবহারকারীদের সাহায্য প্রদান করে। বিভিন্ন ইন্টারনেট সম্প্রদায়ও লিনাক্স ব্যবহারকারী এবং ডেভেলপারদের সহায়তা প্রদান করে। বেশিরভাগ ডিস্ট্রিবিউশন, ফ্রি/মুক্তসোর্স প্রজেক্টের রয়েছে নিজস্ব আইআরসি চ্যাটরুম অথবা নিউজগ্রুপ, অনলাইন ফোরামসমূহও সহায়তার একটি ক্ষেত্র, উল্লেখ্যযোগ্য উদাহরন হিসাবে- linuxquestions.org এবং বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউশনভিত্তিক সহায়তা ও সম্প্রদায় ফোরাম, যেমন- উবুন্টু, ফেডোরা, গেন্তু ইত্যাদি ফোরাম। লিনাক্স ডিস্ট্রিবিউশনগুলোর রয়েছে মেইলিং লিস্ট; সাধারনত সেখানে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় যেমন, একটি প্রদত্ত তালিকার উন্নয়ন এবং ব্যবহার নিয়ে।

লিনাক্স এবং বর্তমান বিশ্ব
বর্তমান বিশ্বে লিনাক্স ছাড়া অনেক কিছুই কল্পনা করা যাবে না। যেমন ইন্টারনেট। লিনাক্সের কল্যাণে আজ কে ইন্টারনেট জগৎ আজকে অন্য রকম। মোবাইল মার্কেটেও আজ লিনাক্সের জয়জয়কার। গুগল তো একটি লিনাক্স ডিস্ট্রো তৈরি করেছে এবং এটি বাণিজ্যিক ভাবে সফল। স্যামস্যাং তাদের নিজেশ্ব মোবাইল অপারেটিল সিস্টেম তৈরি করছে যেখানে লিনাক্স এবং ওপেন বিএসডি কার্নেল ব্যবহার করা হচ্ছে। নোকিয়া লিনাক্স ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করছে আরও একটি মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম।

সূত্র