ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

জ্বালরে, জ্বাল – আগুন জ্বাল; ভাঙ্গরে, ভাঙ্গ – গাড়ি ভাঙ্গ; লড়াই-লড়াই, লড়াই চাই, লড়াই করে মরতে চাই; মানুষ ধর গুম কর, আখেরাতের পথ ধর। এগুলো আমাদের দেশের রাজনীতির তপ্ত/উৎতপ্ত বাক্য সদাসদ্য আওড়ান সভা/সমাবেশে নেতা/নেত্রীদের গোচরে/অগোচরে। এ ছাড়াও হরতালে এসব তপ্ত বাক্যগুলোই মাঠের চালিকা শক্তি, সাথে উপভোগ্য পিকেটিং আর পুলিশের সাড়াশি তান্ডব। এগুলো বাদ দিয়ে রাজনীতি কেমন যেন শুষ্ক মরীচিকা; ভিডিও ক্যামেরা অথর্ব, খবরের কাগজে কাটতি কম ও মিডিয়া নিষ্ক্রিয়!

সচরাচর রাজনৈতিক মিছিলে বা হরতালে অংশ নেয় ১০ বছরের বাচ্চা (পিকেটিং এরা পারদর্শী) থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বৃদ্ধ/বৃদ্ধা। উৎতপ্ত বাক্য পাঠ করতে-করতে গরম সরিলে বাচ্চা-বৃদ্ধ/বৃদ্ধা সবাই একাকার হয়ে যায় (গাহি সাম্যের গান); সামনে যা আসে তাই নিঃশেষ মুহুর্তে। লাখ টাকার গাড়ি নির্মূল সেকেন্ডে (১০০ টাকার জন্য গাড়ীতে আগুন দেই – কালের কন্ঠ ৮ জুলাই ২০১১), আর পথচারী মৃত মুহুর্তে (হরতালে মৃত্যু – কালের কন্ঠ ৫ মার্চ ২০১১)। বলা বাহুল্য, মানুষ মারা বা গুম করা এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অংশ বা সংস্কৃতি হয়ে গেছে (অবরুদ্ধ বাংলাদেশ – কালের কন্ঠ ২৪ এপ্রিল ২০১২)! নিখোজ মানুষের সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে, বিরাজ করছে গুম/নিখোঁজ আতঙ্ক। সমাজের টপ টু বটম পর্যন্ত এগুলোর সাথে এখন পরিচিত, কিন্তু জনগণ জড়িত নয় (ইউএনডিপি’র এক গভেষনায় বেরিয়ে এসেছে যে, দেশের ৯৫% সাধারণ মানুষ কোন অবস্থাতেই দেশে অরাজকতা চায় না – কালের কন্ঠ ২৭ জুন ২০১২)। যদি ১০/১২ বছরের একটা বাচ্চা’কে জিঙ্গাসা করা হয় ‘রাজনীতি কি’? (সত্য ঘটনা; আমি আমার ১১ বছরের ভাতিজা’কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম) ঝটপট উত্তর দিবে ‘মিছিল, গাড়ি ভাঙ্গা, বাসে আগুন দেয়া, হরতাল, মানুষ গুম করা, লড়াই করা আর – – -’। পলিটিক্যাল সাইন্স’র মতে Politics is the activity through which people make, preserve and amend the general rules under which they live. এজন্য অবশ্য সাধুবাদ দেয়া উচিত আমাদের দেশের ট্যালেন্ট রাজনীতিবিদদের কারণ ক্লাসিক মোশান থেকে বেরিয়ে রাজনীতির একটা কোয়ান্টাম ডেফিনেশন খুজে পেয়েছে। কেমন যেন একটা মার-মার, কাট-কাট আর ফাট-ফাট ভাব! ভাবটা এমন, এ না হলে যেন তারুন্য বৃথা, রাজনীতি অচল!!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক রাজনীতিক (বয়স চল্লিশেও ছাত্র ছিল – নিজের বাচ্চারা কলেজ পড়ত) বলতেন সন্ত্রাস যদি শিল্প হয়, তবে এর স্রষ্টা আমি কারণ ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের হাতেখড়ি আমার হাতে। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব অনেক আগে থেকেই চলে আসছিল, কিন্তু ১৯৯০ এর দশকে এর পরিধি বিস্তৃত হয় আলগা অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, মারা যায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ। এসব ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সব ঘটনাগুলোই কিন্তু এক সুত্রে গাথা – রাজনীতির প্লাটফর্ম। এসব ব্যাপারগুলো সুস্থ্য মাথায় চিন্তা করা জরুরী কারণ এগুলো সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিন্ম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। যেমন, বাচ্চারা রাজনীতি বলতে এখন বুঝে মার-মার, কাট-কাট আর ক্যাম্পাস সংস্কৃতি বলতে বুঝে সন্ত্রাস (টেন্ডার সন্ত্রাস – কালের কন্ঠ ৬ মে ২০১০)! আমি যদি এর একটা বায়োগ্রাফি তৈরী করি তবে ব্যাপারটা এমন দাড়ায়ঃ ছেলেবেলা থেকে একজন বিস্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রী দেশ সম্পর্কে যা জনেছে তা সব নেতিবাচক যার বিরাট অংশ জুড়ে রাজনীতির কালো অধ্যায়; গঠনমূলক বা পজিটিভ কোন ধ্যাণ ধারণার জন্ম নেয়নি অন্ততঃ রাজনীতি থেকে। এটাই আমাদের ট্যালেন্ট রাজনীতিবিদদের সার্টিফিকেট ফর নেক্সট জেনারেশনস।

পুকুর চুরি’র নূতন সংস্করণ দূরনীতি। দূরনীতি’র কারণে ভাঙ্গা-চুরা রাস্তাঘাট আর বড়-বড় ইমারতের শহরে প্রতিদিন গচ্চা যাচ্ছে জনগণের হাজার-হাজার কোটী টাকা। সম্ভাবনাময় পদ্মা সেতু তৈরী বন্ধ হল দূরনীতির চাকায় যার চালকও আমাদের ট্যালেন্ট রাজনীতিবিদ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির নীতি বলতে আমাদের ইয়ং জেনারেশন বুঝে গাড়ি ভাঙ্গা, বাসে আগুন দেয়া, হরতাল, মানুষ গুম করা আর দূরনীতি করা। উল্লেখ্য, এক পরিসংখানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশে মোট হরতাল হয়েছে ১৮৮ বার, মারা গেছে শতশত মানুষ। এখন, এই যদি হয় রাজনীতির চেহারা, তবে আর ৫/১০ বছর পর কোথায় দাঁড়াবে আমাদের নেক্সট জেনারেশন!

আমি বলতে পারি নেক্সট জেনারেশন রাজনীতি বিমুখ হবে উন্নত বিশ্বের মানুষের মত, আর ঘৃণা করবে রাজনীতিবিদদের; দেশ ভুগবে রাজনীতি শুন্যতায়। এ দাবানল এখানেই থেকে থাকবে না, ছড়িয়ে যাবে আরো অনেক দুর। ভেবে দেখুন, ছেলেমেয়েরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তারা ভোট দানে বিরত থাকবে, বাধ্যতামূলক করতে হবে ভোটাধিকার। দুংখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা অদুর ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তারা ভোট খুজে মিছিলে আর টাকার অংকে। অর্থাৎ আজকের রাজনীতিবিদরা ভোটার দেখে তাদের মিছিলের আগে আর পিছে যারা আছে, মাঝে বিশাল শুন্য যা কাউন্ট করে না। রাজনীতিবিদদের ধারণা সামনের আর পিছনের চাপে ভ্যাকুয়াম পূরণ হবে, ঢালা যাবে কাড়ি-কাড়ি টাকা! সত্যি বলতে কি, মিছিলে যাদের দেখা যায়, তারা সবাই ১০০-২০০ টাকার ভাড়ায় আসে অথবা জোর করে আনা। এটা বুঝতে চাইলে সারোয়ার ফারুকীর ৪২০ নাটক দেখুন! মানুষ এখন অনেক সচেতন, টাকা বা মেরেধরে ভোটে পাস করার দিন ফুরিয়ে আসছে যার জ্বলন্ত প্রমাণ নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১১। তাই মিছিলের লোক দিয়ে আর ভয় দেখিয়ে ভোটে পাস করা যাবে না কারণ ৮ কোটি ভোটের ৯৫% রাজনীতির বাইরে (ইউএনডিপি’র গবেষনা)।

জনগণকে সচেতন করতে আরো মিডিয়া দরকার সরকারী ও বেসরকারি পর্যায়ে। কোন সোসাইটি বা পরিবেশকে সচেতন করার জন্য মিডিয়া অপরিহার্য। বলে রাখি, বিদেশে এমপি হতে হলে শপিং মলের পাশে এসে হাত-পাত’তে হয় ভোটের জন্য। অবস্থা বুঝে জবাব দেয় জনগণ; চোখে-মুখে ফুটে উঠে তাদের কর্মের ফল। ফলে, আমাদের দেশের রাজনীতিরা যদি এখন থেকেই এ জন্য তৈরী না হয় তবে পস্তাবে শেষে। যদি এমন হয় যে, আমাদের দেশের জনগণ প্রধান দু’দলের নেতা-নেত্রী নির্বাচন করবে টিভি বিতর্কের মাধ্যমে, তবে সেজন্য তারা প্রস্তুত আছে কি? এরজন্য মিডিয়া কতোটা শক্তিশালী? আমি দেখেছি বিদেশে মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী; বিশেষ করে ভোটের সময় বাঘা-বাঘা সাংবাদিক নেতা-নেত্রীদের প্রশ্ন করেন। একেবারে ছিলে ফ্যালে প্রশ্নবাণে। আমার সংশয় আমাদের দেশের মিডিয়া এ ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা! কারণ সাগর-রুনির হত্যাকান্ড নিয়ে যেমনি কাদা-ছড়াছড়ি করলো নিজেদের মধ্যে তাতে জাতীয় পর্যায়ে তারা কতোটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে তা নিয়ে সন্দিহান।

আমার মতে দেশের মিডিয়া আর ঢাকা’তে দরকার নেই, ডিসেন্ট্রালাইজেশন জরুরী; পাঠাতে হবে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে। মিডিয়া যত মানুষের কাছে যাবে, দেশ তত টেকনিক্যালি উন্নত হবে। এখন প্রশ্ন হল, হালের রাজনীতিবিদরা এটা চাই কিনা? রাজনীতির সঠিক সঙ্গায় তাদের আস্তা ফিরাতে চায় কিনা? যদি না চাই, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারবে কারণ রাজনীতি সিকেয় উঠবে আগামীতে (সন্ত্রাস ও দূরনীতির বিরুদ্ধে ভোট – কালের কন্ঠ ১০ ডিসেম্বর ২০১১)। আর যদি চায়, তবে রাজনীতির সুফল তারাই পাবে, সুযোগ পাবে সোসাইটিতে প্রতিনিধিত্ব করতে (সময়ের প্রতিধ্বনি – কালের কন্ঠ ৭ জুলাই ২০১০)। ফলে এটা এখনই তাদের ভাবতে হবে, হতে হবে সূদুর প্রসারী; বন্ধ করতে হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি। রাজনীতির কোয়ান্টাম সংজ্ঞা থেকে ক্লাসিকে পদার্পণ করতে হবে যেন নেষ্টক জেনারেশনস রাজনীতির উপর ভরসা রাখতে পারে। এজন্য নূতন করে হরতাল করতে হবে – এবারের হরতাল বাংলাদেশ বাচানোর হরতাল, রাজনীতির সঠিক প্লাটফর্মে ফেরার হরতাল।

মেল্বোর্ণ ১০ জুলাই ২০১২