ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

ছেলেবেলায় বাবাকে প্রায়ই শুনতাম গুনগুন করে একটি গান গাইতে।

“আমার ভেতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে…”

বাবার কন্ঠে গানটি শুনতে বেশ ভালোই লাগতো। মনে হতো গানের কথাগুলোয় কি যেন একটা আছে! কে লিখেছেন এই গানটি? শুনলাম যিনি লিখেছেন তিনি নাকি খুব বড় একজন কবি। নাম রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বস্তুত রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নামটির সাথে আমার পরিচয় শৈশবের সেই ক্ষণটি থেকেই। কৈশোরোত্তরকালে পরিচয় ঘটে রুদ্রের কবিতার সাথে। বলাই বাহুল্য, কবি নির্বিবাদে স্থান করে নেন আমার অন্যতম পছন্দের কবিদের তালিকায়। পরবর্তীতে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে নিয়ে একটি প্রবন্ধও লিখি। লেখাটি প্রকাশিত হয় আমারই সম্পাদিত কবিতার লিটিল ম্যাগাজিন “স্বপ্নগ্রস্তে”। যৌথ প্রয়াসে রচিত ঐ প্রবন্ধে সহসৈনিক ছিলেন “স্বপ্নগ্রস্তের” আরেক সম্পাদক কবিবন্ধু ইমরান হাসান।

প্রেম ও দ্রোহের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন বাংলা কাব্যসাহিত্যের এক ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ। উসকো-খুসকো, আউল-বাউল একমাথা চুল এক প্রতিবাদী স্বর, যিনি দ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে হৃদয়ে পুষেছেন বিপ্লবের বারুদ। সামাজিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে কলম হাতে গর্জে ওঠা এক চির প্রতিবাদী কন্ঠের নাম রুদ্র। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী এই কবি অমর হয়ে আছেন তাঁর কিংবদন্তী সব কবিতার মাধ্যমে। যুদ্ধোত্তর দেশের ওপর শত্রুর লোলুপ দৃষ্টির প্রতি জাতিকে হুঁশিয়ার করেছেন তার দৃঢ় উচ্চারণে, “জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন”। রুদ্র সেই কবি, যিনি স্বাধীনতাকে দেখেছেন তার অনেক স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন হিসেবে। রুদ্রই সেই কবি, যিনি ধর্ষিতা বোনের শাড়িতে এঁকেছেন তার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।

বক্ষে সঞ্চিত বারুদ নিয়ে রুদ্র কলম ধরেছিলেন নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে। অনাহারী, দরিদ্র মানুষ, নষ্ট শশার পচনের মতো গলিত জীবন যাদের, তাদের বেদনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সমাজের একশ্রেণী যখন মত্ত আনন্দ-উল্লাস-উপভোগে, রুদ্র তখন জ্বলে উঠেছেন কবিতায়-

“জ্ব’লে ওঠা জীবনের দ্বিতীয় স্বভাব
জন্মদোষে আমি শুধু সেটুকু পেয়েছি,
অস্থিতে মেধায় তাই সেই বোধ খেলা করে সমস্ত প্রহর”

দ্রোহের সিম্ফোনি যেনো ছিলো রুদ্রের প্রতিটি রক্তকণিকায়। সমাজ-ভীরু পিতার কাছে পুত্রের প্রতিটি নিয়ম ভাঙার প্রয়াস যেনো ঠেকেছিলো অশ্লীল, অসামাজিকতার মতো। তাই রুদ্র তার জীবনদর্শন সম্পর্কে ধারণা দিলেন ১৯৭৩ সালে “দৈনিক আজাদ” পত্রিকায় তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা “আমি ঈশ্বর আমি শয়তান” এর মাধ্যমে! সামাজিক অচলায়তন, শাসকগোষ্ঠীর চোখ-রাঙানিকে উপেক্ষা করে রুদ্র লিখে গেছেন একের পর এক কালজয়ী কবিতা। স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক পটভূমিকায় রুদ্রের মতো প্রভাবশালী কবি আর ছিলেন না। তিনি স্পর্ধায় নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন কবি নয়, একজন শব্দশ্রমিক হিসেবে। স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলো রুদ্রের কলম-

“তোমার হাতের ভেতরে তখন শোষকের হাত
তোমার আঙুল, সে তখন খুনী জান্তার আঙুল
তোমার সুশিক্ষিত পা, সে-তখন স্বৈরাচারের পা
তোমার চোখ তখন এক তখন এক ঘাতকের চোখ
তোমার জিভ তখন এক ঘৃণ্য দুর্বৃত্তের জিভ।
দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো- কোন পক্ষে যাবে”?

রুদ্রের কবিতার অন্যতম অনুসঙ্গ হয়ে এসেছে প্রেম, নিঃসঙ্গতা, সুগভীর জীবনবোধ। “তোমার থাকাকে বুক ভ’রে চাই, না-থাকা কিছুকে চাই না” এমনি ছিলো রুদ্রর প্রেম। প্রেমকে, নারীকে তিনি অনুবাদ করেছেন শব্দে, বাক্যের কাঠামোয়। প্রেমিকাকে কখোনোই দিতে চাননি পরাজিত প্রেম। রুদ্রের প্রেমের তীব্রতা প্রকাশিত হয়েছে এভাবেই-

“চ’লে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবনে আছো”।

শব্দের প্রবাহমানতায় রুদ্রের কবিতায় এসেছে নিঃসঙ্গতা। কবিতারা ডুকরে কেঁদে উঠেছে, “কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই”। কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে একাকিত্বের এক ম্লান স্বীকারোক্তি-

“হাত বাড়ালেই ফুটে থাকা রক্তিম গোলাপ-
তবু যে যার কাঁটার কাছে ফিরে যায় একদিন,
একদিন যে যার নিঃসঙ্গতার কাছে”।

রুদ্রের গভীর জীবনবোধ পরিলক্ষিত হয় তার “জীবনযাপন” শিরোনামে রচিত কবিতাগুলোয়। জীবনবোধের দিক থেকে রুদ্র ছিলেন এক অসাধারণ স্বাপ্নিক, যার স্নায়ু জুড়ে আন্দোলিত স্বপ্নের স্বদেশ। ব্যক্তিজীবনে ভীষণ অপরিমিত ছিলেন আজন্ম বোহেমিয়ান এই কবি।
রুদ্র তার জীবদ্দশাতেই পেয়েছেন পেয়েছেন তার সাহিত্যের সম্মাননা। ভূষিত হয়েছেন অসংখ্য পুরস্কারে, ছিলেন সমসাময়িক কবিদের ঈর্ষার পাত্র, তরুণ কবিদের আদর্শ। তার স্ত্রী তসলিমা নাসরিনও ছিলেন একজন কবি। তাদের পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে বিয়ে-বিচ্ছেদের মাধ্যমে। রুদ্রর হৃদয়ে ভালবাসার কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু একথাও সত্য যে, তথাকথিত সাংসারিক মায়াজালে আবদ্ধ হবার মানুষ রুদ্র ছিলেন না।

মাত্র ৩৪ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটে এই কিংবদন্তী কবির। রুদ্রের অপরিমিত জীবন যাপনও এর জন্য অনেকটাই দায়ী। কালের করাল আঘাতে হয়তো বিলুপ্ত হয়েছে কবির শারীরিক অস্তিত্ব, কিন্তু রুদ্র অমর, অক্ষয় হয়ে আছেন তার কালজয়ী সব কবিতার মাধ্যমে। তিনি তার ক্ষুরধার কবিতার মাধ্যমে এদেশের তরুণদের চিনিয়ে গেছেন মুখোশের মুখ, বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রু। তারুণ্যের রক্তস্রোতে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন দ্রোহের আগুন-

“কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত
রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই
চাই কিছু লাল তীব্র আগুন”।

-আসিফ আবরার
৩০/০৪/১২