ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

লেখালিখি হাতেখড়ি সেই ছোটবেলাতেই। বাবার ছোট একটা ডায়েরি ছিল। সেটাতে বাবা আমাদের ভাই-বোনের জন্ম, একাডেমিক জীবনের শুরু, ট্রান্সফার হওয়ার পর আবার নতুন স্কুলে ভর্তি এসব লিখে রাখতেন। ওই ডায়েরীটার প্রতি আমার ভীষণ লোভ হত। মাঝে মাঝে বাবার ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটা নিয়ে লেখাগুলো পড়ে দেখতাম, আর শেষের দিকের পৃষ্ঠাগুলোতে নিজের মত করে দু;এক লাইন লিখতাম। সেই ডায়েরিটা আজও আছে, এবং সেটা আমার দখলেই। এরপর কত ডায়েরি এলো। সবই রয়ে গিয়েছে।

নবম শ্রেনীতে প্রেম করতে গিয়ে মায়ের হাতে ধরা খেয়েছিলাম। তাও প্রেমিকার জন্য কেনা ডায়েরি মা দেখে ফেলেছিল। সেই ডায়েরি আর দেয়া হয়নি। অনেকদিন যাবত মায়ের আলমারিতে আটক অবস্থায় থাকার পর সেটি মুক্ত করে আনি। সেই ডায়েরিও আর দেয়া হয় নি।

ডায়েরিতে আমি আমার ডেইলি লাইফ মেইনটেইন করি না। যখন যা মনে আসে তা লিখি, আর বিভিন্ন কবিদের ভাল লাগা কবিতাগুলো লিখে রাখি। ব্যক্তিগত জীবনের লেখা খুবই কম থাকে সেখানে। স্কুল এবং কলেজ জীবনে ম্যাগাজিনে অনেকেই লেখা দিত, কবিতা দিত। আমি হাজার চেষ্টা করেও দু’লাইনের একটা কবিতা লিখতে পারতাম না। এ নিয়ে অবশ্য আফসোসের শেষ ছিল না। তবে স্কুল -কলেজে দেয়ালিকার কাজ করেছি। চাইলেই সেখানে নিজের কোন একটা কবিতা দিয়ে দিতে পারতাম অধিকার বলে, স্যার-ম্যাডামদের সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল কি- না। কিন্তু না, সেখানেও ব্যর্থ ছিলাম।

কত ফ্রেন্ডের প্রেমিকাকে ভাবের এসএমএস লিখে দিলাম। হোক সেটা ভ্যালেন্টাইনস ডে, বার্থ ডে কিংবা বৃষ্টিস্নাত-চাঁদ মাখা ডে !! ওগুলো পেয়ে তারা নাকি আট দুগুণে ষোলখানা হয়ে যেত। কিন্তু আমি ব্যর্থ কবি প্রেমিক হিসেবেও ব্যর্থ। অনেকের প্রেমের সাক্ষী হয়ে থাকলেও নিজের জনকে আটকে রাখতে পারিনি। যাই হোক , সে ভিন্ন কথা। পড়ালেখায় সর্বদা লাড্ডু-গুড্ডু থাকলেও ডিবেটে স্কুল-কলেজে কোনদিন হারিনি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গ্রুপ ডিবেটে সর্বদা চ্যাম্পিয়ান হয়েই এসেছি দলনেতা থেকে। একবার কলেজে থাকতে (তখন আমরা টাঙ্গাইল থাকতাম) জেলা পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হল। আমাদের কলেজ থেকে আমরা গেলাম তিনজন। দলের অপর দু’সদস্যের একজনকে দু’চোখে দেখতে পারতাম না। কিন্তু স্যারের কথায় বাধ্য হয়ে তার স্ক্রিপ্টও আমাকে লিখে দিতে হয়েছিল। সেবার সে হয়েছিল সেরা বিতার্কিক।

বলছিলাম কবিতার কথা। এই একটা জিনিস আমার দ্বারা কেন হয় না, সেটা বুঝিনা। অন্য যে কোন লিখা কম- বেশি দু’এক লাইন লিখতে পারি। যদিও সেটা বরাবরই মানদণ্ডহীন হয়ে থাকে। তবে মাঝে মাঝে কোন ফ্রেন্ডের কবিতা দেখে যদি মনোপূত না হয়, তখন তার পাল্টা একটা কবিতা কিভাবে যেন মনের ভিতর উঁকি দেয়। সামনে কাগজ-কলম থাকলে লিখা হয়, তবে বেশিরভাগ সময় ওই মনের ভিতরেই থাকে , সেটা আর কাগজ-কলমে ফুটে না।

এটা আমার এক ফ্রেন্ডের লিখা কবিতা, সে প্রায়ই ফেসবুকে তার লেখা কবিতা শেয়ার করে।

সেদিন ,
যেদিন, বলেছিলে তুমি, আসবে
কাক ডাকা ভোরে,
শিশিরে পা ভিজিয়ে ।

অপেক্ষায় ছিলাম তোমার
হাতে ছিল,
নীল খামে মোড়া
রাত জাগা এক বুক ভালোবাসা ।

সকাল গড়িয়ে দুপুর,
বিকেল গড়িয়ে রাত,
সেই থেকে আজ এতটা বছরের প্রতিটা সকালে ঘুম ভাঙ্গে আমার,
কোন এক কাল্পনিক নূপুরের শব্দে ।

এটা দেখার পরেই আমার মনের ভিতর একটা কবিতার মত কিছু আকা-পাকু করতে থাকে। যদিও কোনভাবেই সেটাকে কবিতা বলা চলে না। আমি তার কবিতার উত্তর দিলাম এভাবে……

কিন্তু আর কত?
সব কিছুরই তো একটা সীমা আছে
কাল্পনিক ঐ নুপূরের শব্দ এখন আমি আর শুনতে চাইনা।

এমন করেই তো পার করে দিলাম জীবনের অনেকটা সময়
জানো ? পাওয়ার হিসেব কোনোদিনই করিনি আমি

হাহ ! কি হাস্যকর দেখ।
নীল খাম আজও রয়ে গিয়েছে
আর ওদিকে তুমি …
নীল আলোয় আর একজনের বুকে মাথা গুজে দিয়ে
নীলে নীলে নীলিম।

কবিতা না হলেও কবিতার মত তো কিছু একটা। এতেই আমি খুশি।