ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করেই ফেললাম। যানজট নিয়ে আমার বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলো ছোট ছোট করে লিখবো। আমাদের দেশে সবাই সব কিছু নিয়েই মতামত দেয়। সবাই সব বিষয়ের এক্সপার্ট। সব ধরনের বিষয়ে নূন্যতম ধারনা থাকা জরুরী হলেও বিশেষজ্ঞ মতামত দেয়া আর ব্যাক্তিগত ধারনা প্রকাশ করার যে ব্যাবধান- সেটা সবাই ভুলে যায়। কেউ একটু অসুস্থ বোধ করলে আশে পাশের সবাই যেমন ডাক্তার হয়ে যায়, ঢাকার সব মানুষ তেমনি পরিকল্পনাবিদ হয়ে গেছে। মিশুক মুনির আর তারেক মাসুদের মৃত্যুর পরে ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে এটিএন বাংলার একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন জানানো হয়েছিলো- সড়ক দূর্ঘটনা সম্পর্কে কথা বলার জন্য। সঞ্চালক মুন্নী সাহা তাকে দুইবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যে- কীভবে মহাসড়কে মৃত্যুর এই মিছিল থামানো সম্ভব। আমার পরিষ্কার মনে আছে প্রথমবার এড়িয়ে গেলেও দ্বিতীয়বার তিনি বললেন- এটার এক্সপার্ট-রা আছেন, এটা নিয়ে যারা কাজ করেন, তারাই এটা ভালো বলতে পারবেন। এটা স্বাভাবিক- এক্সপার্টাইজ কী জিনিস সেটা সাধারন মানুষ বুঝবে না, কিন্তু আমরা অনেক “অসাধারন” মানুষকে-ও দেখি যারা “পরিকল্পনা”কে ডাল-ভাতের পর্যায়ে নামিয়ে আনতে চান। 

আমাদের এখানে এখন যানজটের যে অবস্থা চলছে, সেটা এমন-ই হওয়ার কথা কারন আমরা জাতিগতভাবেই ঠেকে শিখি, দেখে শিখি না। আমাদের এই অবস্থা লন্ডন শহর পার করেছে গত শতকের চল্লিশের দশকের শেষের এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে। অসহনীয় যানজট আর ভয়াবহ পরিবেশ দূষন শহরটাকে প্রায় বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছিলো। সেই অবস্থা তারা সামাল দিয়েছে। কলম্বিয়ার বোগোটা-র অভিজ্ঞতা একেবারেই সাম্প্রতিক। গত শতকের একেবারে শেষের দিকের। আমাদের দূর্ভাগ্য, আমাদের নেতারা ভবিষ্যৎ দেখবেন কী- বর্তমানের সমস্যা-ই স্বীকার করতে চান না। তারা যদি একটু দূরদর্শী হতেন, তাহলে আমাদের অনেক সমস্যা-ই এড়াতে পারতাম। 

স্বাধীনতার পরে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা যখন জাতীয় রাজধানীতে রূপান্তরিত হলো, তখন এটা সহজেই অনুমেয় ছিলো যে, এর জনসংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। সেটাকে এড্রেস করে কোন ভৌত পরিকল্পনা করা হয়েছে কি? হয়েছে। প্রথমটা স্বাধীনতার ২৫ বছর পর, ১৯৯৬ সালে!

ততোদিনে যে পরিমান জনসংখ্যা বেড়েছে, তাদের অবকাঠামো চাহিদা মেটাতে মেটাতে আবার নতুন মানুষের অবকাঠামো চাহিদা তৈরি হয়েছে; এভাবেই চলছে। অর্থাৎ, আমরা পরিকল্পনা প্রনয়ন এবং বাস্তবায়নে পিছিয়ে আছি। এটা সহজেই অনুমেয়- ঢাকা শহরে বর্তমানে যে কয়টা অবকাঠামো তৈরির কাজ চলমান, সেগুলো যদি ২০ বছর আগে হাতে নেয়া হতো, তাহলে আমরা এখন ১০-১৫ বছর পরের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে পারতাম।

আরেকটা বিষয়- আমাদের সংস্কৃতিতে-ই পরিকল্পনার বিষয়টা নেই। আমরা দুই প্রজন্ম আগেই গ্রামীন সমাজে ছিলাম। নগরায়নের ঢেউ এতো বিপুল বেগে এখানে কখনো আছড়ে পড়েনি। এক প্রজন্ম আগেই আমরা ক্ষেতের মাঝ বরাবর হেটে এই সড়ক থেকে ঐ সড়কে উঠেছি। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলেছি। গ্রামের মত শহরে যেখান সেখান দিয়ে রাস্তা পার হওয়া যায় না, এ ধরনের আরবান নর্ম, এথিক্স, কালচার- এগুলোর সাথে এই প্রজন্মে এসে পরিচিত হচ্ছি। এই সময়ে চারিদিকে একটা অস্থিরতা থাকবেই। একটা উদাহরন দেই- এখন কী আমরা রাস্তার উপরে ‘অহরহ’ কলার খোসা ফেলতে দেখি? কিংবা বাসের ভেতরে থুথু ফেলতে? একসময় এগুলো নৈমত্তিক বাস্তবতা ছিলো। গত এক দেড় দশক ধরে এ ধরনের ছোট খাট কিছু বিষয় আমরা অভ্যাস করেছি। এগুলো আস্তে আস্তে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাবে।
এবার মূল কথায় আসি। 

আমাকে যদি এখন জিজ্ঞেস করা হয়- বর্তমান যানজট সমস্যার সমাধান কী- আমি এক কথায় বলবো-জানি না। এটা আমার জানার কথা-ও না। এটা জানার কথা একজন এক্সপার্টের। আমার কাছে কোন তথ্য-উপাত্ত নেই (যেগুলো যোগাযোগ পরিকল্পনায় লাগে); হাওয়া থেকে বাতাসী রচনা লেখা সম্ভব (যেটা আমাদের তথাকথিত নগরবিদেরা লিখে/করে থাকেন, নগর পরিকল্পনাবিদেরা নয়), বৈপ্লবিক শ্লোগান দেয়া সম্ভব, কিন্তু পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। বর্তমান রিসোর্স ব্যাবহার করে যানজটকে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে হয়তো নামিয়ে আনা সম্ভব কিন্তু পুরো শহরের যোগাযোগ পরিকল্পনা করতে হলে সম্ভবতঃ আমাদের একেবারেই প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।

রাজউক ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান করার সময় আমি নারায়নগঞ্জের অংশে কাজ করেছি। নারায়নগঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন মোড় হচ্ছে চাষাড়া। সেটার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের দেয়া প্রস্তাবনা ছিলো এই রকমঃ
The treatment of this area is a complex one, but due to its importance as being the gateway to Narayanganj, it cannot be ignored. A comprehensive study of this Road, Rail Communication is suggested to be undertaken immediately.
বড় বড় নগর পরিকল্পনাবিদেরা যেখানে একটা ইন্টারসেকশনের সল্যুশন দেয়ার সাহস করেননি, সেখানে আমরা প্রতিদিন, প্রত্যেকে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলছি- বিষয়টা দেখে আমি হাসি, আর “নয়নজলে ভাসি”। ঢাকা শহরের প্রত্যেকটা বড় বড় মোড় উক্ত চাষাড়া মোড়ের চেয়ে অনেক জটিল। উপরন্তু মাকড়সার জালের যে কোন প্রন্তের যে কোন মাত্রায় আন্দোলন যেমন পুরো জালেই ছড়িয়ে পরে, তেমনি যে কোন শহরের যে কোন ইন্টারসেকশনে নেয়া যে কোন ধরনের ব্যাবস্থা পুরো শহরকে এফেক্ট করে। সুতুরাং যে কোন উদ্যোগ নেয়ার আগে ভাবনা চিন্তা করা প্রয়োজন। 

যোগাযোগের পরিকল্পনা হচ্ছে নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে কঠিন অংশ। আমাদের মত দেশে যেখানে কোন তথ্য নেই, সেখানে এটা করা অসম্ভব। আমি আবারো বলছি “এটা অসম্ভব”। তবু, যানজটের টক অব দ্যা টাউন হয়ে ওঠার ফলে সৃষ্ট সাধারন-অসাধারন সকল নব্য নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য আমার এই লেখা। 
আরেকটা ব্যাপার। লেখাটা অনেক বড় হওয়ার কথা। অল্প অল্প করে লিখবো। 

শুরু করতে চাই ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের একটা ধরন দিয়ে। কলোনিয়াল (ঔপনিবেশিক) আমলে যে ধরনের ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম আমাদের দেশে ডেভলপ করা হয়েছিল সেই বৃত্ত আমরা এখনো ভাঙতে পারিনি । এই ধরনটাকে বলা হয় “হাব এন্ড স্পোক” ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম। চাকার কেন্দ্রের (এক্সেলের) সাথে স্পোকগুলো যেভাবে যুক্ত সেরকম করে কেন্দ্রের সাথে অন্য শহরগুলো যুক্ত থাকে বলে এটাকে এই নাম দেয়া হয়েছে। কলোনিগুলোতে ‘প্রভুরা’ এই সিস্টেম তৈরি করতো যেন কেন্দ্র থেকে সহজে এবং দ্রুততম সময়ে কলোনির যে কোন জায়গায় পৌঁছানো যায়। আসলে তারা শুধু পৌছাতেই চাইত না, চাইত চতুর্দিকের সম্পদকে এক জায়গায় পুঞ্জিভূত করে সেটা একসাথে পাচার করতে। এটা মূলতঃ উন্নয়নের জন্য তৈরী করা হত না, শোষণ-শাষণ এবং লুটতরাজই ছিলো মূল উদ্যেশ্য। এজন্য সে সময়ের ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমে বৃত্তের (চাকার) প্রান্তের পাশাপাশি দুটো শহরের/জায়গার ভেতর যোগাযোগ কঠিন ছিল। আমার মনে পড়ে ২০০৮ সালে আমি হানিফ পরিবহনের একটা বাসে বরিশাল থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম। গাড়ীটা ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামে গিয়েছিল। পরিকল্পিত ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমে এটা হওয়ার কথা না। বরিশাল থেকেই সরাসরি চট্টগ্রামে যাওয়ার রাস্তা থাকার কথা।
বিষয়টা ছোট স্কেলেও প্রযোজ্য । ঢাকা শহরের সব রাস্তা গুলিস্তান, মতিঝিল বা এর আশেপাশে গিয়ে শেষ হয়েছে এবং উক্ত রাস্তাগুলোর প্রান্তগুলোর নিজেদের মধ্যে ভালো যোগাযোগ নেই (ইদানিংকালের মিরপুর-উত্তরার যোগাযোগ বাদে)। একটা ছবি দেখা যাক।

image001.png

উপরের ছবিটা গুগল ম্যাপের। এখানে দুটো বিষয় লক্ষ্যনীয়ঃ

১. ব্যাবহার করার জন্য আমাদের অল্টারনেটিভ খুব কম। শহরের ভেতর মূল সড়ক দেখা যাচ্ছে মাত্র চারটা (হলুদ রঙের) যেগুলো আবার সবই উত্তর দক্ষিনে (পূর্ব-পশ্চিম একমাত্র সড়ক পূর্বাচলের লিংক রোড; এটা রিসেন্ট সংযোজন)। 
২. যতই আমরা কেন্দ্র থেকে দূরে যাচ্ছি, ততই রাস্তাগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। 
এখন, ম্যাপে যেখানে মাতুয়াইল বা ডেমরা দেখানো, সেখান থেকে বসুন্ধরা/গুলশান যাওয়ার উপায় কী? অত্যন্ত জটিল। প্রথমে যেতে হবে কেন্দ্রের দিকে (গুলিস্তানের দিকে), তারপর দিক পরিবর্তন করে। অথবা ফ্লাইওভারের নীচ দিয়ে সায়েদাবাদ (সেটাও কেন্দ্রের দিকে, যদিও কেন্দ্র পর্যন্ত নয়), তারপর দিক পরিবর্তন করে।

একটা পরিকল্পিত শহরে এটা হওয়ার কথা না। যদি শহরটা হাব এন্ড স্পোকের-ও হয়, এখানে রাস্তা গুলো থাকার কথা ইন্টার কানেক্টেড; একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর রাস্তাগুলো কানেক্টেড থাকবে, মাকড়সার জালের মত। যোগাযোগের অনেক অপশন থাকবে, অনেক লিঙ্ক থাকবে। এগুলোর মাঝে দুয়েকটা রাস্তা বড় হবে যেগুলো শহর থেকে বের হয়ে যেয়ে এই শহরকে আরেক শহরের সাথে কানেক্ট করবে। 

সম্ভবতঃ এখান থেকেই আজকের এই বিরাট সমস্যাটার শুরু হয়েছিলো।

আজকে এই পর্যন্তই, যানজটের কারনগুলো আমরা আগামী দিন বোঝার চেষ্টা করবো।