ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

আপনি মৃতপ্রায় কারো সজ্জার পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো সেলফি তুলতে না পারেন, কিন্তু এইমাত্র ভূমিষ্ঠ হওয়া আপনার সন্তানের সাথে একটা সেলফি তুল্লে আপনার কাছে বেপারটা কি খারাপ লাগবে? যদি লাগে, তাহলে আপনি ভাবছেন, সন্তান প্রসব একটা অসুখ আর এই সময় এত আনন্দ কেন? আর আমি ভাবছি এটা অতি স্বাভাবিক একটা আদিমতম প্রসেস যাকে আমরা অস্বাভাবিক করে তুলেছি।

মাতৃত্বের যন্ত্রনা কি শুধু মায়েদের? বাবার কোনো ভূমিকা নেই একটা শিশু সন্তান এর জন্ম পর্যন্ত সময়টুকুতে? হয়তো খুব একটা বেশি নেই। এমনটাই আমাদের রীতিনীতি। আমার দুই মেয়ে, এক মেয়ের জন্ম লন্ডন আর একমেয়ে নিউ ইয়র্কে। আপনি যখন লন্ডন আমেরিকা বা উন্নত বিশ্বের কোনো হসপিটালে আপনার সন্তান ডেলিভারি করবেন, তখন দেখবেন ডেলিভারির সময় মায়ের সাথে বাবাকেও ডেলিভারি রুমে থাকতে হয়। ইদানিং আমাদের দেশের কিছু হসপিটালে বাবাদের ডেলিভারি হবার পর সাথে সাথে ঢুকতে দেয়া হয় কিন্তু ডেলিভারির সময় ডাক্তার ছাড়া কাউকে ডেলিভারি রুমে থাকতে দেয়া হয় না। দীর্ঘ নয় থেকে দশ মাস ধরে একজন মা প্রাকৃতিক ভাবে নিজের গর্ভে ধারণ করে তার সন্তান। বেপারটি খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক। এই অত্যন্ত স্বাভাবিক বেপারটাকে আমরা কি নিদারুন ভাবে অস্বাভাবিক করে তুলি একবার ভাবুন।

bomkeshbabu-1476661039-06dfbd5_xlarge

প্রথম যে দিন আপনি জানতে পারেন আপনার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা, আপনার মাঝে একটা ভয় কাজ করেছিল, এরপর হয়তো আপনি খুশি হন বা হবার ভান করেন, অতঃপর নিয়তি মেনে নেন। ভয় পাওয়াটা অমূলক নয়, লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে আফ্রিকান কালো বাবারা এই ধরণের খবর পাওয়ার সাথে সাথে পালিয়ে যায়। ঘর সংসার ছেড়ে মোটামুটি বছর খানেকের জন্য পালিয়ে বেড়ায় আবার সন্তান জন্ম নেবার পর বাসায় ফেরত আসে। এদের স্ত্রীরা পালিয়ে যাবার এই বেপারটা খুব সহজে নেয়, কারণ জানে আবার ফিরে আসবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে যেহেতু আপনি পালাতে পারেন না তাই আপনি মেনে নেন। আসলে পুরো বেপারটাই নির্ভর করে অার্থ-সামাজিক পরিবেশের উপড়। কালো বাবারা যেমন করে অনাগত সন্তানের ভয়ে পালিয়ে যায়, ঠিক উল্টো ভাবে সাদারা এই বেপারটিকে রীতিমতো উদযাপন করে এবং বিশ্বাস করেন এরা এটা মন থেকেই করে।

লন্ডনে প্রথম যখন আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে হসপিটালে যাই, ডাক্তার প্রথম যে কথাটি আমাদের বলে তা হচ্ছে , “সন্তান ধারণ একটা ন্যাচারাল প্রসেস , এটা কোনো অসুখ নয়” আমাদের সমাজে গর্ভ ধারণকে একটা অসুখ বলে বিবেচনা করা হয়, নইলে সন্তান সম্ভবা হবার সাথে সাথে একজন মায়ের চলা ফেরা, উঠা বসা খাওয়া দাওয়া সব কিছু ডাক্তারের পরামর্শে কেন হবে ? আজ থেকে কয়েক যুগ আগে আমাদের মা-দাদীদের সময় কি এমন ডাক্তারি ছিল? মনে হয় না। তখন তো পুরো বেপারটাই ন্যাচারাল ভাবে হতো। অনেকের ভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু আমার ধারণা গর্ভ ধারণের পুরো বেপারটাই আমরা ভুল ভাবে জানি বা আমাদের ডাক্তাররা যা জানাতে চায় তাই আমরা জানি। আসুন দেখি লন্ডন আর নিউ ইয়র্কে কিভাবে মায়েরা সন্তান ধারণ করে আর স্বাভাবিক ভাবে ডেলিভারি করে।

ইংল্যান্ডে স্বাস্থ সেবা সরকারি, অনেকটা আমাদের দেশ এর মতো, প্রাইভেট হাসপাতাল আছে কিন্তু চাইলেই কেও অপারেশন করে সন্তান ডেলিভারি করতে পারবে না। ডাক্তার যদি মনে করে, অপারেশন এর প্রয়োজন আছে তবেই তা সম্ভব। এক্ষেত্রে এরা আমাদের দেশের ধাত্রী বিদ্যা প্রয়োগ করে। কারণ এখানকার ডাক্তাররা সন্তান গর্ভে ধারণের প্রথম দিন থেকে আপনাকে গাইড করবে কিভাবে আপনি, কি করবেন। যেহেতু সন্তান ধারণ এবং ডেলিভারি দুটোই আদিমতম প্রসেস, এক্ষেত্রে খুব বেশি ডাক্তারির প্রয়োজন নেই। বাবা, মায়েদের জন্য আলাদা ভাবে কিছু ক্লাস এর মাধ্যমে পুরো বেপারটি জানিয়ে দেয়া হয়। আর মায়েরা অন্য সবার মতো সব কিছু করতে পারে। কোনো ধরণের কোনো বাধা নেই। এই সব দেশে একজন মা, সাথ থেকে আট মাস গর্ভ ধারন অবস্থায় অফিস করে, বাজার করে, বাসে চড়ে, প্রায় সব কিছুই করে এবং কোনো ধরণের ঔষুধ ছাড়া। এক্ষত্রে পুরো নয় মাস বা দশ মাসের একটা প্ল্যান করে দেয়া হয় বাবা মা দুইজনের জন্য। খুব একটা দুর্ঘটনা না ঘটলে আর এই প্ল্যান মতো চললে এই সব দেশে বেশির ভাগ ডেলিভারি নরমাল হয়। আর যে কটা সিজারিয়ান বা অপারেশন হয় তার বেশির ভাগ হয় কালো বা এশিয়ান পরিবার এর। এর জন্য ডাক্তাররা এইসব পরিবারের লাইফ স্টাইলকে দোষারোপ করে থাকে।

হয়ত প্ল্যান করে চলা সম্ভব না আমাদের জন্য, কারণ, কোন হাসব্যান্ড তার স্ত্রীর পা টিপে দিবে বা একবেলা রান্না করে খাওয়াবে অথবা শরীরটা মেসেজ করে দিবে? চারিত্রীক দুর্বলতা আমাদের অসুস্থ করে দেয় এবং এরপর নরমাল ডেলিভারি অনেক টাকা খরচ করে অপারেশন করে, আপনি ভাবেন আপনার স্ত্রীর যন্ত্রনা কমিয়ে দিলেন। কি প্রচন্ড বোকামি করি আমরা।

সাময়িক যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে অপারেশন ডেলিভারি করিয়ে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করে দেন আপনার স্ত্রীকে। সে যাই হোক, আপনি বা আপনারা যেহেতু এটাকে অসুখ ভাবি, ডাক্তার আপনাদের লাগবেই। কাজেই খুব একটা কর্ণপাত যে আপনি করছেন না আমি বুজতে পারছি। তবে এটুকু বলতে পারি, বেপারটা নিয়ে একটু ঘাটুন, বুজতে পারবেন আপনি কি করছেন। যন্ত্রণার কথা যখন আসলোই, এবার বলি এদের দেশে প্রসব ব্যথা কিভাবে কমায়। আসলে প্রসব ব্যথা কমাবার কোনো চেষ্টাই করে না এদের ডাক্তাররা। প্রসব যন্ত্রণার এক মাত্র ওষুধ হাসব্যান্ডকে স্ত্রীর হাত ধরে বসে থাকতে হয় আর শান্তনা দিতে হয়। এ এক অদ্ভুত বেপার। আপনার স্ত্রী প্রচন্ড প্রসব যন্ত্রনায় চিল্লা চিল্লি করছে আর আপনি আপনার স্ত্রীর হাত ধরে বসে আছেন। প্রতিটা হাসব্যান্ড এর এই পরিবেশে যাওয়া দরকার, অন্তত এক বার হলেও। আপনি বুজতে পারবেন মাতৃত্ব কি জিনিস। প্রসব বেদনা কি? হাসব্যান্ড ওয়াইফ এর এই বেদনানাশক কর্মকান্ড আসলেই অনেক কার্যকর।

আরেক অদ্ভুত ডেলিভারি হয় পানির মধ্যে। মানে আপনি যদি চান, তবে আপনার সন্তানের ডেলিভার ছোট একটা বাথ টাবে করতে পারেন। এক্ষেত্রে আগে থেকে আপনাকে ডাক্তারদের বলে রাখতে হবে। ডেলিভারির সময় আপনাকে পানি মধ্যে বসিয়ে রাখা হবে যতক্ষণ না আপনার প্রসব হয়। এই সব কিছুই করা হয় প্রাকৃতিক ভাবে ব্যথা নিরসনের জন্য। এদের ডাক্তাররা সব চেষ্টা করে স্বাভাবিক ভাবে একটা সন্তানের জন্ম দেবার জন্য।

সন্তান জন্ম নেবার পর নাড়ি কাটার দায়িত্ব বাবার আর এরপর পরিষ্কার করা ছাড়াই আপনার সন্তানকে আপনি জড়িয়ে ধরে বসে থাকবেন। এটাকে বলে SKIN TOUCH. আমি জিজ্ঞেস করায় আমাকে বলেছিলো, এতে নাকি মায়ের প্রতি সন্তানের মায়া বাড়ে, আমার চোখে পানি এসেছিলো। পারবেন আপনি এই কাজটা করতে। এরকম করলে হয়তো আজকে সমাজের এই অবস্থা হতো না।

আপনি হয়তো ভাবছেন আমি আদিম কোনো গল্প বলছি। এইটা বিংশ শতাব্দীর আধুনিক লন্ডনের হসপিটালের কথা। আমেরিকানরা আরো এক ডিগ্রী উপড়ে। আমার দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় ডেলিভারি রুমে আমি ছাড়াও আমার প্রায় সব আত্মীয় স্বজনরা ছিল। ডাক্তার কিছুই বলেনি। সবার সামনেই ডেলিভারি হলো। কেও আমার বৌয়ের মাথায় সূরা পরে ফু দিচ্ছে, কেওবা মাথা টিপে দিচ্ছে, আমি হাত ধরে বসে আছি আর আমার স্ত্রী অসম্ভব যন্ত্রনায় চিৎকার করছে। এক সময় কি নিদারুন আনন্দে আমার মেয়ে ভুমিষ্ট হলো। এ যেন এক রূপকথা।

সমাজ বদলের এতো আন্দোলন করি আমরা, ডেলিভারির সময় বাবাদের ডেলিভারি রুমে থাকার আন্দোলন করতে পারি না? এতে যে সমাজ বদলাবে। যে বাবা জানে না, কি কষ্ট প্রসব বেদনায়, সে কিভাবে সম্মান দেখাবে তার স্ত্রীকে? যে মা জন্মাবার পর সন্তানকে বুকে টেনে নেয় না, সেই মা কি করে আশা করে বড়ো হয়ে তার সন্তান তাকে বুকে টেনে নিবে?

জীবনের শুরুতে এতো বড়ো গলদ রেখে জীবনের শেষে এসে যদি আপনি সন্তানের মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেন, সন্তান আপনার মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে। না জানা বোকামির পর্যায়ে পরে না, এটা ভুল। আর এই ভুলের মাশুল দিচ্ছি সবাই। আধুনিক হতে গিয়ে আমরা না জেনে ভুল পথের দিকে যাচ্ছি।