ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

উবার (UBER), ঢাকাবাসীর জন্য নতুন ট্যাক্সি সেবা প্রতিষ্ঠান। আরেকটি ধসে পড়া ব্র্যান্ড যা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় ধরা খেয়ে এখন ঢাকা শহরে আপনাদের সেবা দিতে প্রস্তুত। আমাদের দেশে উবার এর মতো এই সার্ভিস অনেক আগে থেকেই চলছে । সকালে গাড়ির মালিককে অফিস নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরার সময় মতিঝিল বা বনানী থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা প্যাসেঞ্জার তুলে নেয়া ঢাকাবাসীর পরিচিত সার্ভিস। এর জন্য কোনো ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপসের দরকার হয় না।  উবার যদি আজ থেকে ৫ বছর আগেও ঢাকাতে এর সেবা দিতে আসতো, আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হতো না। কিন্তু যখন দেখি নিউ ইয়র্কে উবার প্রায় বন্ধের পথে আর ঢাকাতে উবার নিয়ে মাতামাতি তখন একটু তো সন্দেহ হতেই পারে । আসুন জেনে নেই উবার কেন ঢাকায় এতদিন পর?

উবার হচ্ছে এক ধরণের ট্যাক্সি বা রাইড শেয়ারিং। আপনি উবারের ওয়েবসাইট (www.uber.com) বা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ট্যাক্সি বুকিং করতে পারবেন আর যারা উবার ড্রাইভার হতে চান তারাও অনলাইন বা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে নিজেদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে উবার আপনার আর আপনার আশেপাশে থাকা কোনো ড্রাইভারের মাঝে অনলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। আর এ জন্য উবার কেটে নেয় একটা কমিশন। এটাই মোটামুটি উবারের ব্যবসা। ব্যাপারটা খুবই সহজ। আপনার প্রয়োজন আর ট্যাক্সি ড্রাইভারের প্রয়োজনকে একটা ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে এক করে দেয়া আর এর জন্য মাঝখানে একটা কমিশন কেটে রাখা। এখন ভাববার বিষয় হচ্ছে এই ধরণের প্রযুক্তি আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা নিরাপদ আর কতটা ব্যবসা বান্ধব।

প্রথমেই আসি উবারের পেমেন্ট মেথড নিয়ে। সাধারণত উবার ট্যাক্সির ভাড়া আপনাকে ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। নগদ টাকার লেনদেন উবার গ্রহণ করে না। কারণ আপনি যদি ট্যাক্সি ভাড়াটা নগদ টাকায় পরিশোধ করেন উবার তার কমিশন কেটে রাখতে পারবে না। আপনি যখনই উবার ট্যাক্সিতে উঠবেন তখনই আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে ট্যাক্সি ড্রাইভারের অ্যাকাউন্টে ভাড়ার টাকা জমা হয়ে যাবে  সংক্রিয়ভাবে।

উবার ড্রাইভাররা সাধারণত সাপ্তাহিকভাবে পেমেন্ট পেয়ে থাকে । অর্থাৎ সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটা দিনে উবার তাদের ড্রাইভারদের অ্যাকাউন্টে সব টাকা জমা করে দেয়। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে অনেকটা এই রকম, ট্যাক্সি ড্রাইভাররা ভাড়ার টাকা তাৎক্ষণিকভাবে নগদ না পেয়ে পাচ্ছে সপ্তাহ ঘুরে। আর এই লেনদেনটি হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। ট্যাক্সি ড্রাইভারদের দিক থেকে যদি চিন্তা করি তাহলে প্রথম দিকে আপনার কাছে লাভজনক মনে হলেও বছর ঘুরতে ব্যাপারটা তেমন লাভজনক নাও হতে পারে। কারণ উবারের রেজিস্ট্রেশন ফি। আপনার গাড়ির রেজিশ্ট্রেশন ফি আর সরকারি ট্যাক্সি গাড়ির ট্যাক্স যদি আপনাকে দিতে হয় তাহাকে খুব সম্ভবত আপনাকে উল্টো নিজের পকেট থেকে দিতে হতে পারে।

উবারের ড্রাইভার হতে হলে একটা অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পূরণ  করে তবে রেজিস্টার্ড ড্রাইভার হতে হয়। এখন আমেরিকার নিউ ইয়র্কের ড্রাইভারের জন্য যে ফর্ম আমাদের ঢাকা শহরের ড্রাইভারের জন্য ঠিক একই রকম ফর্ম। সমস্যার শুরুটা এই জায়গায়। নিউ ইয়র্কের ড্রাইভিং লাইসেন্স হচ্ছে সেখানকার যে কারো জন্য প্রথম সারির পরিচয়পত্র। এই ড্রাইভিং লাইসেন্সের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বৃত্তান্ত থেকে শুরু করে তার প্রতিদিনকার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে প্রশাসন। এর কারণ এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, সোশ্যাল কার্ড সবকিছু ইন্টিগ্রেটেড। আপনার যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স বাদ হয়ে যায় তবে আপনাকে এর জের সবখানে দিতে হবে। ঠিক এই কারণেই এইসব দেশের মানুষগুলো এতো সোজা হয়ে চলে। কারণ এদের বাঁকা হবার পথ নেই। আমাদের দেশে একজন ড্রাইভার তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছুড়ে ফেলে দিয়ে আরেকটা নতুন করে আনতে মাত্র ঘন্টা খানেক সময় নেবে। ইন্টিগ্রেটেড না হবার কারণে আমাদের ন্যাশনাল আইডি নম্বর , ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর সবই আলাদা আলাদা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে এইসব ড্রাইভারদের আমরা মনিটর করতে পারি?

uber1

তাত্ত্বিক ভাবে এটা প্রায় অসম্ভব ঢাকা শহরের পরিপ্রেক্ষিতে। আমার নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে আমার যেতে হয়নি বিআরটিসিতে। তাহলে বুঝুন, এটা কত সহজ আমাদের দেশে! কিন্তু আপনি ভাবতে পারেন এতে সমস্যা কোথায়? উবার ড্রাইভার সামান্য কিছু ভাড়ার জন্য এতো কাহিনী করবে না। আর যেখানে সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হচ্ছে সেখানে এতো চিন্তার তো কিছু নেই। আছে, চিন্তার কারণ আছে।

একবার ভাবুন আপনার ৩০ লক্ষ টাকার দামি গাড়ির ড্রাইভারের বেতন কত মাসে? ১০ থেকে ১৫ হাজার। একবার কি ভেবে দেখেছেন আপনি আপনার ৩০ লক্ষ টাকা দামের একটা গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়েছেন মাত্র ১০ -১৫ হাজার টাকার একজন মানুষকে। আর এই জন্যই আপনার প্রতিদিনের শুরু আর শেষ হয় আপনার ড্রাইভারের সাথে ঝগড়া করে। আজকে জোরে চালিয়েছে, সিএনজির টাকা মেরে দিয়েছে, এইসবের সাথে আপনার গিন্নির কয়েকশো অভিযোগ আপনার ড্রাইভারকে নিয়ে। এটা প্রতিদিনের ব্যাপার। এসবের একমাত্র কারণ হচ্ছে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আপনার ড্রাইভার আর আপনার জীবন ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই আপনারদের চিন্তা ধারাও ভিন্ন। ঠিক এই ব্যাপারটাই উবার ট্যাক্সির জন্য ভয়ের কারণ।

উবার আপনাকে আর আপনার ট্যাক্সি  ড্রাইভারকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে আসছে। আপনি হয়তো এই ব্যাপারটা একজন আধুনিক মনের মানুষ হিসাবে সহজে মেনে নিচ্ছেন কিন্তু আপনার ট্যাক্সি ড্রাইভার সেই আপনার গাড়ির ড্রাইভারের মতোই একজন।

নিউ ইয়র্কের প্রেক্ষাপটে এই ধারণা অন্য রকম। অনেক সময় উবার ট্যাক্সি ড্রাইভার প্যাসেঞ্জারের থেকে শিক্ষিত আর সামাজিকভাবে অবস্থাবান হতে পারে। কারণ এখানে আপনি যারা ট্যাক্সি ড্রাইভার তাদের সবাইকে আপনার চেয়ে কম কিছু ভাবতে পারবেন না। ঢাকা শহরে শতভাগ ট্যাক্সি ড্রাইভারকে আপনি আপনার চেয়ে অধম ভেবে থাকেন চোখ বন্ধ করে। ভাবতেই পারেন। সামাজিক এই অবস্থার ফলাফল ভয়াবহ। আর এর ফলে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের নীতি বা আচরণ নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলতেই পারি। সামাজিক এই নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের।

সাধারণ ট্যাক্সি দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় এর রং দেখে বা ট্যাক্সির নামটা দেখে। উবারের ট্যাক্সি আপনি দূর থেকে দেখে চিনতে পারবেন না। পুলিশের নিরাপত্তা তল্লাশি এড়িয়ে  এই উবার ট্যাক্সিগুলো খুব সহজেই বের হয়ে যেতে পারবে। কারণ সামাজিক অবস্থার কারণে একটা বিলাসবহুল গাড়ি  চোলাই মদ বহন করার কাজে ব্যবহার হবে না, এমনটাই ধারণা আমাদের প্রশাসনের।  নিউ ইয়র্কের পুলিশ উবার ট্যাক্সিকে সহজে চেনার জন্য উবারের একটা লোগো গাড়িতে লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের দেশে এখুনি এটা করা দরকার।

দিল্লিতে ২০১৪ সালে উবার সার্ভিস নিষিদ্ধ করা হয় ৩২ বছর বয়স্ক এক নারীর ধর্ষণের অভিযোগে। ধর্ষিতা এই নারী ছিলেন উবার প্যাসেঞ্জার, আর ধর্ষক ছিল উবার ড্রাইভার। যেহেতু পুরো ব্যাপারটাই  হয় অনলাইনে বা মোবাইলের মাধ্যমে, আপনি কোনো ভাবেই আপনার ড্রাইভারের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন না। আপনি হয়তো আপনার মোবাইলে দেখবেন আপনার আশেপাশে বিলাস বহুল কোনো ট্যাক্সি আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে আর ভাড়াটাও অনেক কম। কিন্তু একবার ভেবে দেখবেন যার এই বিলাসবহুল গাড়ি কেনার ক্ষমতা আছে সে  আপনার সামান্য ট্যাক্সি ভাড়ার জন্য নিজের গাড়িকে উবারের ট্যাক্সি বানাবে না। আর আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটা প্রায় অসম্ভব । আপনি শতভাগ নিচ্ছিত থাকতে পারেন গাড়িতে বসে থাকা ভদ্রলোক গাড়ির মালিকের ড্রাইভার আর অবশ্যই মালিককে না জানিয়ে তিনি এই কাজটুকু করছেন। এখন আপনার কোনো সমস্যা হলে এর দায়ভার আপনি উবারের ওয়েবসাইটকে দিতে পারেন না। ঠিক এমনটিই হয়েছিল দিল্লিতে এবং এমনটিই  হবে আপনার সাথে।

এবার আসুন আর্থিক লেনদেন নিয়ে। কিসের ভিত্তিতে উবার এর ভাড়া নির্ধারণ  হবে তা কিন্তু এখনো পরিষ্কার না । নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। আর প্রত্যেক ট্যাক্সির পেছনে এই ভাড়ার চার্ট টাঙানো থাকে । আমাদের দেশে উবার গ্রাহকরা কার নির্ধারণ করা ভাড়া পরিশোধ করবে? উবার ট্যাক্সিতে কি মিটার থাকবে? মনে হয় না। কারণ উবার জিপিএসের মাধ্যমে দূরত্ব নির্ধারণ করে। তাহলে আমাদের প্রশাসনকেও জিপিএসের উপর ভাড়া নির্ধারণের কোনো একটা ফর্মুলা বের করতে হবে। কারণ ড্রাইভার বা গ্রাহক কেউই কিন্তু কোন কিছুই জানবে না, সবকিছু উবার সাইটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

কত ভাড়া আপনার একাউন্ট থেকে কাটা হলো আর ড্রাইভার কত টাকা সপ্তাহ শেষে পেলো এইসব জানার জন্য আপনাকে আপনার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টের সাথে উবারের স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখতে হবে প্রতি সপ্তাহে। ক’জন ড্রাইভার এই কাজ করবে এখন তাই দেখার পালা ।

প্রতি সপ্তাহ শেষে উবার থেকে ড্রাইভারকে একটা লগ শিট দেয়া হবে যাতে পুরো সপ্তাহের ভাড়া আর দুরত্ব দেয়া থাকবে। আমি সন্দিহান আমাদের কত জন ড্রাইভার এই লগ শিট দেখে ফেলে আসা সপ্তাহের দুরত্বের সাথে ভাড়া মিলিয়ে দেখবে। নিউ ইয়র্কে এই সমস্যার জন্য উবার ড্রাইভাররা প্রতিনিয়ত আন্দোলন করে যাচ্ছে। কারণ ড্রাইভারের হিসেবের সাথে উবারের হিসেবে মেলে না কখনোই। আর মিলবেই বা কিভাবে? জিপিএসের দুরত্ব আর বাস্তব দুরত্ব খুব একটা মিলে যাবার কি কথা? মনে হয় না। এই ধরণের অভিযোগের তদন্ত হবে কিভাবে? প্রশ্ন থাকতেই পারে।

উবার তাদের যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক জিপিএসের  মাধ্যমে যাত্রীর লোকেশান ট্রেস করে থাকে। আমাদের দেশে বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কের যে অবস্থা তাতে কিভাবে একজন যাত্রী সারাক্ষণ জিপিএসের আওতায় থাকবে তা বোধগম্য নয়। মোবাইলের কলড্রপ আর ইন্টারনেট সংক্রান্ত অভিযোগের কারণে সরকার গণশুনানি করে, এখন  সেই মোবাইল নেটওয়ার্ক আর ইন্টারনেটের উপর ভিত্তি করে পুরো একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলবে, এটা এতো সহজে বিশ্বাসযোগ্য নয়।

উবার সেবার জন্য প্রয়জোন নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ তাও আবার আপনার মোবাইল ডিভাইস জাতীয় জিনিসে। এই সংযোগ আর এর বিল কি উবার দিচ্ছে? মনে হয় না। আর এই একটি কারণেই বিশেষ একটা টেলিকম কোম্পানি উবারের পার্টনার হয়েছে বাংলাদেশে।  উবার ড্রাইভার আর যাত্রী সবারই হাই স্পিড ইন্টারনেট প্রয়োজন, আর এই সেবা দিতে প্রস্তুত গ্রামীনফোন। যেখানে সাধারণ ইন্টারনেট সেবা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে গণশুনানির সম্মুখীন হতে হয়, সেখানে যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ইন্টারনেট সেবা প্রদান করবে এই কোম্পানি!

উবার কেন এই মুহূর্তে ঢাকা শহরে? এর উত্তর হয়তো এমন হতে পারে- বর্তমানে সরকার ঢাকা শহরে স্মার্ট আইডি কার্ড দেয়া শেষ করেছে আর উবারের রেজিশ্ট্রেশন ফর্মে এই স্মার্ট আইডি কার্ড নম্বর বাধ্যতামূলক। এটা অবশ্যই একটা ভালো ভেরিফিকেশন। সমস্যা হচ্ছে ঢাকা শহরে বসবাসকৃত ড্রাইভারদের কতজন ঢাকায় স্থায়ী? আর এদের কতজনের এই স্মার্ট আইডি কার্ড আছে বর্তমানে।খুব সম্ভবত আরেকটা মোবাইল সিম নিবন্ধনের মতো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আশা করি সরকার এই ব্যাপারে নজর দেবে।

সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে উবার বিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়। প্রচলিত ট্যাক্সি বা ইয়েলো ট্যাক্সি উবারের সাথে পাল্লা দিতে পারছে না। আর পারবেই বা কেমন করে? প্রচলিত ট্যাক্সিকে সরকারি ট্যাক্স, আলাদা করে ট্যাক্সি নিবন্ধন ট্যাক্স আরো কত কি দিতে হয় আর উবার ট্যাক্সি যারা চালান তাদের এইসব কোনো কিছু না দিলেও চলে। কারণ এই ট্যাক্সির অস্তিত্ব শুধু অনলাইনে। সরকার বা বিআরটিএ কিভাবে এইসব অনলাইনে নিবন্ধনকৃত ট্যাক্সিকে নিয়ন্ত্রণ করবে?

যে কোনো হাইটেক প্লাটফর্ম ব্যবহার করার আগে নিশ্চিত হতে হয় সেবা নিয়ে । আমাদের দেশে ইন্টারনেট, ব্যাংক লেনদেন, মবিলিটি এই সব এখনো উবার এর মতো প্লাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য উপযোগী নয়। নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাববার প্রয়োজন। যেখানে সাধারণ তিন চাকার সিএনজি ট্যাক্সি একটু রাত হলে মিরপুর যেতে চায় না সেখানে আপনি আপনার দামি একটা গাড়ি নিয়ে মাঝরাতে নিশ্চয়ই মিরপুর চিড়িয়াখানা যাবেন না? যতই উবার আপনাকে ভাড়া ঠিক করে দিক না কেন, বলেন বুকে হাত দিয়ে যাবেন আপনি? মনে হয় না। তাহলে মিরপুরের এই যাত্রী আপনার না যাওয়ার অভিযোগ কাকে জমা দেবে? আসেপাশের পুলিশকে? খুব একটা সুবিধে হবে বলে মনে হয় না। কারণ উবার বুঝার মতো উর্বর বোধ হয় এখনো পুলিশ প্রশাসন না।

সরকারি ভাবে উবার বা এর মতো অন্য যে সকল প্রতিষ্ঠান দেশে ব্যবসা করছে এদের সবাইকে একটা নিয়মের মধ্যে আনা প্রয়োজন। কারণ  ড্রাইভার বা উবার যারাই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে তারা আমাদের দেশেরই জনগন। ট্যাক্সি ড্রাইভার বা যাত্রী এদের সকলের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। বর্তমানে উবারের রেজিস্ট্রেশনে শুধুমাত্র ন্যাশনাল আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই আইডি কার্ডকে কিভাবে ইন্টিগ্রেটেড একটা আইডি কার্ড করা যায় প্রশাসনের সেই দিকে নজর দেয়া উচিত।

কাঁচঘেরা রুমে বসে উর্বর মস্তিস্ক থেকে উবারের ধারণা দেয়া খুব সহজ । কিন্তু এই ধারণা কতটুকু বাস্তব সম্মত তা ভাবার মতো উর্বর মস্তিস্ক কাঁচঘেরা রুমে বোধহয় নেই। আমি সঙ্গত কারণেই উবারের টেলিকম পার্টনার গ্রামীনফোনের কথা বলছি। এটা আইফোন নয় যে অপারেটর ছাড়াও শুধু সেট ব্যবহার  করা যাবে। উবার নিজেই একটা অপারেটর, যার কোনো অফিস নেই, লোকবল নেই, নেই কোনো আইনি স্তম্ভ যেখানে দৌড়ে আপনি যেতে পারেন প্রয়োজনের সময় । ফাঁকতালে যা হচ্ছে তা হলো  অবৈধ একটা কর্মকাণ্ডকে ডিজিটাল প্যাকেজে বৈধ করা হচ্ছে।

যেখানে নিউ ইয়র্কের মতো শহরে উবার সার্ভিস নিয়ে মতভেদ আছে সেখানে ঢাকা শহরের মতো একটা শহরে যেখানে বেশিরভাগ গাড়ির কাগজপত্র আর ড্রাইভারের লাইসেন্স ঠিক নেই সেখানে কিভাবে উবারের মতো ধারণার জন্ম হলো তা ভেবে অবাক  হই!

আর সবচেয়ে বড় কথা যখন উবারের ব্যবসা পড়তির দিকে তখন আমার শহরকে বেছে নিলে আমি প্রশ্ন করতেই পারি  ‘এতদিন কোথায় ছিলে’? ভুল করলাম! আমিই বা প্রশ্ন করবো কাকে? উবার তো একটা ওয়েবসাইট মাত্র!