ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 
Untitled

মাসখানেক আগে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হলাম কলকাতার এক তরুণ ডিরেক্টরের সাথে । অল্প বয়স তার উপর টাকা পয়সা নেই ছবি বানানোর । গল্প রেডি । কিন্তু গল্পে পর্যাপ্ত বয়সের নারী চরিত্র না থাকায় প্রোডিউসার পাচ্ছে না বেচারা । আশ্চর্য এক কাজ করে বসলো এই তরুণ ডিরেক্টর । ক্রাউড ফান্ডিং শুরু করলো নিজের ছবির বাজেট এর জন্য । মানে সবার থেকে অনলাইন এ চাঁদা তোলা শুরু করলো । ৪৭ লক্ষ রুপির এই ছবির জন্য ধীরে ধীরে টাকা জমা শুরু হলো । কিছু টাকা জমে আর কিছু শুটিং হয় । এভাবে আজও চলছে ধার্মিক নামের এই ছবির কাজ।

আমার ইচ্ছে হলো নাটক বানাবো । ইদানিং কালের ওয়েব সিরিজগুলো খুব মন টানে। ইউটিউবের জন্য বানানো হয় এই নাটকগুলো । ফেসবুকের মাধ্যমে নিজের শহরের এক উঠতি পরিচালকের সাথে গল্প বিনিময় । আমার ধারণা ছিল পরিচালক মানে আমি যা বলবো তাই করবে। গল্প আমার টাকা আমার । সুতরাং আমি এক্ষেত্রে ট্রাম্পের মতো আচরণ করতেই পারি । বাজেট চাইলাম এক পর্বের। ভালো মানের একটা ১২ মিনিটের ওয়েব সিরিজ বানাতে প্রায় ২ লক্ষ টাকা লাগতে পারে। কিন্তু এতো টাকা আমার কাছে নেই। আর থাকলেও ২ লক্ষ টাকা দিয়ে ইউটিউবের জন্য ১২ মিনিটের নাটক বানানোর মাঝে ব্যাবসায়িক আনন্দ যে নেই তা আমি প্রথমেই বুঝতে পারলাম।

ইচ্ছেকে ইচ্ছের জায়গায় রেখে কাহিনী ঝেরে ফেললাম মন থেকে । তবে আমি না পারলেও অনেকে এই ওয়েব সিরিজ বানাচ্ছে বেপরোয়া ভাবে। যেহেতু ইউইউবে দেখানো হয় এইসব। তাই রেটিং নিয়ে তেমন না ভাবলেও চলে । মারমূখি কাটকাট সংলাপ আর অ্যাডাল্ট কাহিনী দিয়ে বানালেও সমস্যা নাই এই ওয়েব সিরিজগুলো। কারণ এখানে কোন সেন্সরশিপ বলে কিছু নেই। যাই আপলোড করবেন তাই দেখা যাবে। আপনার মনে প্রশ্ন জগতে পারে, তাহলে ওয়েব সিরিজ বানিয়ে লাভ কী? ওয়েব সিরিজগুলোর প্রধান ইনকাম আসে অনলাইন সাবস্ক্রিপশন থেকে। আমাদের দেশে নতুন হলেও দেশের বাইরে নেটফ্লিক্স বা আরো অন্য ইন্টারনেট ভিত্তিক চ্যানেলগুলো বেশ জনপ্রিয়। আমাদের দেশে বায়োস্কোপ নামের একটা অনলাইন চ্যানেল আছে এই রকম । এদের বলা হয় ভিডিও অন ডিমান্ড । মানে আপনি নিজে খুঁজে বের করবেন আপনি কি দেখতে চাইছেন । খুব একটা মন্দ না। ব্যস্ত এই জীবনে নিজের মতো করে নাটক সিনেমা দেখার মজাই আলাদা।

ইন্টারনেট স্পিড ভালো থাকলে অনায়াসে দেখা যায় এই চ্যানেলগুলো। সম্ভবত এটা বাংলাদেশের জন্য বেশ বড় একটা ইন্ডাস্ট্রি হতে যাচ্ছে কিছু দিনের মধ্যে । যেমন আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড প্রোডিউসার না পেয়ে নিজেই নিজের ছবির জন্য ফান্ড কালেকশন করা শুরু করলো, এমন আরো অনেকে এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্ন পূরনে উঠে পরে লাগবে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া যে ভাবে আগাচ্ছে আমাদের সরকার ঠিক ওই ভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে । কারণ এই নতুন ধরণের ওয়েব সিরিজ বা এর মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের কোনো নীতি বা সেন্সরবোর্ড নেই এখনো । আরেকটা উবার এর জন্ম হবে আমাদের দেশে । সরকার এই এক উবার এর জন্য নীতি নির্ধারণ করতে করতে উবার বন্ধ হয়ে যাবার পথে। ওয়েব সিরিজ বা ভিডিও অন ডিমান্ড জাতীয় প্রচার মাধ্যমের নীতি সরকার কবে নাগাদ করবে তা বোধগম্য নয়।

ধরুন আমাজন টিভি বা আপেল টিভির কথা। নাম শুনলে মনে হবে এগুলো কোনো চ্যানেল । কিন্তু আদতে এইসব অনলাইন ভিত্তিক ভিডিও অন ডিমান্ড চ্যানেল। যেমন আমার নিউ ইয়র্কে আমি আমার বাসায় রুকু টিভি দেখি। এটা একটা রেগুলের টিভিকে কাস্টোমাইজড করে অনলাইন চ্যানেল দেখার উপযোগী করে তোলা । মানে আমার টিভিতে আলাদা করে ইন্টারনেট এর দরকার হয় না । ওয়াই ফাই দিয়ে আমি প্রায় সব চ্যানেল দেখতে পারি । আমাদের দেশে হয়তো এখনো এই পরিমান ইন্টারনেট স্পিড আসেনি । কিন্তু যখন আসবে তখন বেশির ভাগ আমরা এই ভিডিও অন ডিমান্ড চ্যানেলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়বো। এর আগেই সরকারের ভিডিও অন ডিমান্ড চ্যানেলগুলো নিয়ে নীতি প্রয়োজন ।

শুধু যে ওয়েব সিরিজ নিয়ে সরকার বিপাকে পড়বে তা কিন্তু না। টিভি ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানিগুলো তখন তাদের স্মার্ট টিভির সাথে বিল্ট-ইন এই সব ভিডিও অন ডিমান্ড এর ডিভাইস বসিয়ে দিবে। তখন টিভি কেনার সাথে সাথে আপনি হয়তো বায়োস্কোপ বা নেটফ্লিক্স এর সেটআপ পেয়ে যাবেন এমনিতেই । বাসায় এনে শুধু ওয়াই ফাই কানেকশন এ জুড়ে দিলেই দেখতে পাবেন মজার মজার সব ওয়েব সিরিজ। এক্ষেত্রে সরকার জানতেই পারবে না আপনি কী দেখছেন। ওপর দিকে টিভি চ্যানেলগুলো হারাবে টিআরপি। ধীরে ধীরে কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু করবে এই ইন্টারনেট ভিত্তিক চ্যানেলগুলোকে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের ক্ষতি আঁচ করতে একটু কঠিন হবে। কারণ এর পুরোটাই অদৃশ্য অনলাইন ভিত্তিক।

দ্রুতই হয়ত প্রযোজক-পরিচালক সবাই ঝুঁকে পড়বে এই ভিডিও অন ডিমান্ড বানাতে। পুরু একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে সরকারের নীতির বাইরে। আর সাথে সাথে গড়ে উঠা একটা ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হবে অচিরেই। এর থেকে যে পরিত্রান নেই তা কিন্তু না । পাশের দেশ ভারতেও নেটফ্লিক্স আছে । ওরাও একটা নীতির মাধ্যমে নেটফ্লিক্সকে ভিডিও অন ডিমান্ড এর লাইসেন্স দিয়েছে। আমরা চাইলে এখনই এই নতুন গড়ে উঠা নাটক সিনেমার জগৎকে নিয়ে ভাবতে পারি। না হয় এর সাথে জড়িয়ে থাকা স্যাটেলাইট চ্যানেল আর স্যাটেলাইট চ্যানেল ডিস্ট্রিবিউটর এরা সবাই বিশাল এক ক্ষতির সম্মুখীন হবে অচিরেই।