ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

বছর খানেক আগেও আরবদের জন্য আমার মায়া ছিল বেশ প্রখর। কোন এক অদ্ভুত কারণে এই মায়া এখন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। একসময় ফিলিস্তিনে কেউ মারা গেলে ফেসবুকে ঝড় উঠতো। এখন খুব একটা হয়না। এরও কারণ আছে। আমরা হয়তো অনেক বেশি নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কিংবা আরবদের সত্তর বছর ধরে চলা এইসব আর খুব একটা মনে টানে না। মনে না টানাই স্বাভাবিক। আর কত? অদ্ভুত আরবদের কোন ভাবেই যেন চেনা যাচ্ছে না। সৌদি প্রিন্স গত তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। অনেকে বলছেন মারা গেছে। একটা প্রিন্স মারা যাবে আর দেশের কেউ জানবে না! সম্ভব? এটা আরব রাজাদের দেশেই সম্ভব। অদ্ভূত তাদের সব রীতি-নিয়ম।

 

গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপচারিতায় সৌদি প্রিন্স সালমান 

গত বছর সৌদি এক প্রিন্সকে বাদশা আটক করে। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রিন্স চিৎকার করে বলছে, ‘আমেরিকান দূতাবাসে খবর দাও’। ভাববার বিষয় বটে। আমাকে-আপনাকে যদি কেউ জোর করে তুলে নিতে আসে আমরা কি বলব?

যাইহোক, প্রিন্সদের নিরাপত্তা হয়তো অন্যদের হাতে। পুরো আরব জুড়েই অস্থির অবস্থা। কেউ কাউকে মানতে চাইছে না। এই সময় ফিলিস্তিনে ৫৫ জন আরব নিহত হন। কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। আমেরিকান দূতাবাস জেরুজালেমে নিয়ে আসা হলে এটা আমার-আপনার কি সমস্যার কারণ হতে পারে? অথবা ফিলিস্তিনিদেরও ঠিক কি কারণে মাথা ব্যথা হয়? সমস্যাগুলো তো একেবারেই নিজস্ব। বাইরের দুনিয়াতে এর প্রভাব খুবই ক্ষীণ।

আরব আমিরাতের প্রিন্সেস পালিয়ে ভারতে চলে আসেন। বিশেষ এক বাহিনী প্রিন্সেসকে আটক করে আবার আরব আমিরাতে নিয়ে যায়। এখন প্রিন্সেস কোথায় আছে কেউ জানে না। অবাক ব্যাপার!

সংবাদে পড়লাম সৌদিতে গৃহকর্মী নির্যাতনের কথা। আমাদের মেয়েদের জন্য দেশটা এখন নিরাপদ না। এই সময় কেবল মেয়ে না, ছেলেদেরও আরব সীমানার ধারে কাছে না ঘেঁষা উচিত। কোথাকার প্লেন কোথায় গিয়ে নামে কেউ জানে না। দেখা গেল আপনি ঢাকা থেকে রিয়াদ এর উদ্দেশ্যে উঠেছেন, প্লেন গিয়ে নামলো তেল আবিব। হতেই পারে।

 

আরব আমিরাতের একটি রাস্তার দৃশ্য এটি

আরবদের সাথে আমাদের সম্পর্কের প্রধান উৎস ধর্ম। সৌদি প্রিন্স বর্তমানে মক্কা-মদিনাকে অনেকটা ভ্যাটিকান সিটির মতো করে তৈরি করতে চাচ্ছেন। মহৎ উদ্যোগ। যদি তাই হয় তাহলে আমরা শুধু মক্কা-মদিনা নিয়েই ভাববো। বাকি আরব সমাজে কি হচ্ছে তা নিয়ে ভাববার খুব একটা প্রয়োজন নেই। আর আরবরা যে খুব একটা আমাদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেয় তাও না। তাদের আপদ-বিপদের সঙ্গী পশ্চিমারা। সুতারং আমাদের ফেসবুকে ঝড় বা কান্নাকাটি খুব একটা আরবদের কানে যায় কিনা জানা নেই।

সত্যিকারের আরবদের সম্পর্কে জানতে ইউটিউব বা গুগল সার্চ দিতে পারেন। আমি নিশ্চিত বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবেন না। ধর্মের সাথে যদি মিশিয়ে না ফেলেন তবে আপনার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসতে সর্বোচ্চ মিনিট খানেক সময় লাগতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী গত এপ্রিলে সৌদি আরব গেলেন। নানা রকম সামরিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা হল। তবে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যা করলেন তা হল খুব স্বাভাবিকভাবে এড়িয়ে গেলেন সম্মুখ সামরিক সাহায্যের আবেদনটি। এই মুহূর্তে আরবদের সাথে যে কোনো চুক্তিই বেশ বিপজ্জনক। ৭০ বছর ধরে আরবরা যে দেশটিকে স্বীকার করেনি, আজকে সেটা আরবদের প্রধান বন্ধু। এখন বাংলাদেশ কি করবে? বন্ধুত্ব করবে তাদের সাথে?

আপনি কি করবেন যদি কাল সকালে উঠে দেখেন সৌদি প্রিন্স ইসরায়লিদের সাথে বসে চা-কফি খাচ্ছে? ঠিক এই কারণেই প্রিন্স মক্কা-মদিনাকে আলাদা করে ধর্ম নির্ভর একটা শহর গড়ে তুলতে চাইছে। যার অর্থ হলো প্রিন্স ইউরোপ-আমেরিকা-ইসরাইলিদের সাথে চা-পানি খেলেও যাতে আপনি না খেয়ে থাকতে পারেন তার জন্য একটা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটা বেশ পোক্ত। আর ঠিক এই কারণেই হয়ত আমাদের আর তেমন একটা আগ্রহ নেই আরব বিশ্ব নিয়ে। নিজেদের নেকি নিয়ে চিন্তা করা মানেই যে আরবদের নিয়ে চিন্তা তা কিন্তু না। এটা হয়তো দেরিতে হলেও আমরা এখন বুঝতে পারি।