ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

 

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর দেশের কোথাও সেভাবে কোন প্রতিবাদ হয়নি কারণ শোকে বিহ্বল দেশবাসি বুঝে উঠতে পারেনি আসলে কি হয়েছিল। সারা জাতি ছিল বন্দুকের নলের সামনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জিম্মি তাই টু-শব্দটি উঠেনি কোন মহল থেকে। এমনকি রক্ষী বাহিনী, মুজিব বাহিনীর কেউই খুব জোরে নিজেদের প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ না থাকলেও দেশের মানুষ যে এই হত্যাকাণ্ডের সমর্থন দেয়নি তা সময়ে প্রমাণ হয়েছে।

এরপর ঘটনা পরিক্রমায় অনেকেই ক্ষমতায় এসেছে। সময়ে সময়ে দেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালালেরা। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজকে আইনী প্রক্রিয়ায় বাঁধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক সময় এই আইনকে বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৩ বছরের আইনী প্রক্রিয়া শেষে বিচারের পথ প্রশস্ত হয়। বহাল থাকে ১২ জন খুনির ফাঁসির রায়।

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতির কলঙ্ক মুক্ত হওয়ার দিন। জাতির স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ার দিন। ওইদিন মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতি তার বড় অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তা আর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৫ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। খুনিদের লাশ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের করার সময় লাশ বহনকারী গাড়িতে থু থু আর জুতা নিক্ষেপ করে জনগণ ৩৪ বছর পুষে রাখা ক্ষোভ, ঘৃণা আর কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করে। ২৭ জানুয়ারি সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ৫ আসামির রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দিলে শুরু হয় রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া। ফাঁসি হয় পাঁচ খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান,বজলুল হুদা,এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আজিজ পাশা পলাতক অবস্থায় মারা যান।

১২ খুনির ৫ জনের ফাঁসি এবং একজনের মৃত্যুর কারণে যে ৬ জন খুনি বাকি রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে শরিফুল হক ডালিম, আব্দুর রশিদ খান, নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন। এদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যর্থতা লক্ষ্যনীয়। একটা সরকার এভাবে বছরের পর বছর এভাবে ব্যর্থ হবে তা ভাবা যায়? এই ব্যর্থতার জন্য প্রকৃত অর্থে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনির পদত্যাগ করা উচিত। কারণ এটা তার মন্ত্রণালয়ের কাজ এবং এই কাজটি তিনি করতে পারেননি গত কয়েক বছরে এমনকি ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব যে হবে তাও বলা যাচ্ছেনা।

পলাতক খুনিদের মধ্যে নুর চৌধুরী রয়েছেন কানাডায়। কানাডা সরকারের আভ্যন্তরীণ নীতি মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরোধীতা এই কারণে তারা নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত দেবে না বলে জানিয়েছে। আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন ভারতে রয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভারতের ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। যদি ভাল সম্পর্ক থেকেই থাকে তাহলে তাদের ফিরিয়ে আনা অসম্ভবের কাজ কিছু ছিলনা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এটাও সম্ভব নয়। কারণ একই কূটনৈতিক ব্যর্থতা। খন্দকার আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিম লিবিয়া ও পাকিস্তানে রয়েছেন। এই দুই দেশ থেকে আর যাই হোক এই সরকার তাদের যে ফিরিয়ে আনতে পারবেনা তা অনুমান করা যায়। এর জন্য কার্যকর কোন উদ্যোগও দেখা যায়নি।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের হত্যার রায় কার্যকরের মাধ্যমে জাতি হিসেবে আমাদের কলংক কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারও ছিল। সরকার নিজেদের সফলতা দাবি করতে পারে হত্যার বিচার করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা মনে করি ২০১০ সালের পাঁচ খুনির ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে আমাদের কলংকের আংশিক মুক্তি ঘটেছে। কলংকের মুক্তি ঘটবে বাকি পলাতক খুনিদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে।

১২ খুনির মধ্যে শাস্তির বাকি রয়েছে ৬ জনের। আমাদের দাবি তাদের অবিলম্বে শাস্তির মুখোমুখি করা। এতদিন পরেও তাদের শাস্তির মুখোমুখি করতে না পারা সরকারের বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে দিপুমনির পদত্যাগ করা উচিত।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির কপালে কলংকের তিলক পড়েছিল। এই কলংকের কিছুটা মুক্তি হয়েছে ৫ জন খুনিকে ফাঁসির মাধ্যমে। কলংকমুক্তি শতভাগ হতে পারে পলাতক খুনিদেরও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে