ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কথায় আছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের গদিতে লোক বদলায় কিন্তু নীতি বদলায় না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনের মেয়াদ আছে এ বছরের শেষাবধি পর্যন্ত। এর পরেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। কিন্তু নেতা/নেত্রী বদলালেও তাদের নীতি বদলাবে কিনা তাই দেখার বিষয়। এই নীতি না বদলানো যদি সত্যি প্রমাণ হয় তবে আওয়ামীলীগ সরকারের কপালে যে দুঃখ আছে তা বলতে জ্যোতিষী হবার দরকার নেই।

একটা বিষয়ে সরকার নিজেদের সফল দাবি করতে পারে কারণ এর আগে তিনি বাংলাদেশে আসবেন বলে দুইবার কথা দিয়েছিলেন কিন্তু আসেননি। এবার এসেছেন যখন সরকার জাতীয়ভাবে খুবই চাপের মুখে ছিল। গুম, হত্যা আর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থায়। ইলিয়াস আলী ইস্যু নিয়ে সরকারকে ভীষণভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু রাজনৈতিক অদুরদর্শিতা আর ক্ষমতালিপ্সু মনোভাব এবং কেন্দ্রিয় নেতাদের পলায়নপর মনোবৃত্তি তাদের আন্দোলনকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে। সাধারণ একটি মামলার মুখে পড়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল যেভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং হঠাত করে বোরকা পরে আবির্ভুত হয়েছিলেন তাতে করে প্রমাণ হয়েছে আর যাই হোক এই নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি কোনভাবেই আওয়ামীলীগের মত দলের মোকাবেলা করতে পারবেনা।

আওয়ামীলীগ সরকার তাদের কিছু অযোগ্য মন্ত্রীর কারণে বিতর্কিত হয়ে গেলেও দল হিসেবে তারা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। এরা এমনই একটি দল যাদের নির্দিষ্ট কিছু ভোট ব্যাংক রয়েছে। এবং এই ভোট ব্যাংকে চিড় ধরানো খুবই কষ্টকর ব্যাপার। অনেকের মুখ থেকে শোনা যায় আওয়ামীলীগারের অনেকেই বংশানুক্রমেই আওয়ামীলীগারই! ব্যাপারটি গণতন্ত্রের জন্যে খুব বেশি সুখবর না হলেও যে কোন দলের জন্যই অনেক বেশি শক্তিমত্ত্বার পরিচায়ক। এই দলের বিপক্ষে যখন ‘হাফ লেডিস মার্কা বোরকা ফখরুল’ আন্দোলনের হুমকি দিয়ে যান এবং একটি মামলার মুখে পড়ে পালিয়ে যান তখন আর যাই হোক রাজপথে তাদের টিকে থাকা কষ্টকর। মির্জা ফখরুলের এই পলায়নপর মনোবৃত্তি বিএনপিকে কতখানি পিছিয়ে দিয়েছে তার হিসেব মেলানো কষ্টকর। সেই সাথে ইলিয়াস আলী ইস্যুটিও মানুষের মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়িই।

হিলারীর সফরের সময় এবং তাঁর উপদেশগুলো নিয়ে সরকারের নির্লিপ্ত মনোভাব অনেককেই অবাক করেছে। কারণ বাংলাদেশে যে বিষয় ছিল স্বাভাবিক তা হল বিদেশি মেহমানরা আসবেন এবং উপদেশ দেবেন আর সরকার জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর বলে তার সবকিছু মেনে নেবে। হিলারীও তাঁর পূর্বসূরীদের মত বলে গেছেন কিন্তু সরকার সেভাবে জ্বি হুজুর টাইপের কোন কথা বলেনি। হিলারির উদ্বেগের কারণ ছিল হত্যা, গুম, সুশাসন এবং গ্রামীণ ব্যাংক! যার সবকিছু আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকারের বিপক্ষে গেছে। হত্যা ও গুম নিয়ে সরকার বেকায়দায় বিশেষ করে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হবার পর থেকে। হিলারীর এই বক্তব্য বিএনপির মনের কথারই প্রতিধ্বনী। সুশাসন নিয়ে আমাদেরকে সব সময়ই উপদেশ শুনতে হয় এটা নতুন কিছু নয়। এবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনুসের বিষয়টি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বাংলাদেশে ইউনুসের চেয়ে কোন ব্যক্তিকেই যোগ্য মনে করেনা আমেরিকা। তাদের সবকিছুই ইউনুসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই বিষয়টি সত্যিকার অর্থে উদ্বেগ এবং আতংকের। নোবেল পুরস্কার নিয়ে কোন কথা বলব না কিন্তু মনে হচ্ছে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার জন্য ইউনুসকে নিয়ে তারা এগোতে চায়। ভয় দেখিয়ে অথবা উপদেশ দিয়ে ইউনুসকে দেশের গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় বসিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা।

আমেরিকার উচ্চ পর্যায়ের কোন নেতা-নেত্রির বাংলাদেশে সফরের উদ্দেশ্য থাকে তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়। এই সফরে তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে কি আলোচনা হয়েছে তা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় খুব বেশি মাতামাতি হয়নি। যা আলোচিত হয়েছে তা হল তত্বাবধায়ক সরকার এবং গ্রামীণ ব্যাংক। পর্দার অন্তরালে কি হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা হবেও না। সরকার কোন গোপন চুক্তি করল কিনা তা নিয়ে বিএনপিরও মাথাব্যথা নাই। তারা খুশি তাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে হিলারি কিছুটা ইঙ্গিত করেছেন। এ নিয়ে তারা বগল বাজাচ্ছে। এই বিষয়টি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। একটি কার্যকর বিরোধীদলের এমন ভুমিকা ন্যাক্কারজনক। দেশের স্বার্থ নিয়ে তাদের মোটেও মাথা ব্যথা নাই তা প্রমাণিত হয়েছে আরেকবার। তাই যখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিদেশিরাও বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তখন লোকটার মানসিক অবস্থা নিয়ে সন্দিহান হয়ে যেতে হয়। তিনি কি আদৌ সুস্থ আছেন এই প্রশ্নটি জাগে।

ইইউভুক্ত দেশসহ আমেরিকার সুদৃষ্টিতে বর্তমান সরকার নেই তা প্রমাণ হয়েছে এই কয়েক দিনের বিভিন্ন উদ্ধৃতিতে। কিন্তু তারপরও আমেরিকার চোখে বর্তমান সরকার অন্যরকম একটা সম্মানের দৃষ্টিতে আছে তার কারণ কয়েকদিন আগের মায়ানমারের সাথে সমুদ্র জয়ের কারণে। হিলারির এই সফরকে যদি কুটনৈতিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বলা যাবে সরকার এক্ষেত্রে সফল হয়েছে। সে জন্যই বোধহয় মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি এবং ভারতের সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার বিষয়টিতে হিলারি ক্লিনটন গুরুত্ব দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশ সম্পদ আহরণের সুযোগ পাবে। একদিকে চীন, এদিকে ভারত। মাঝখানে বাংলাদেশ। এই ত্রিভুজের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যের কারণে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে অনেকখানি। বিষয়টিকে ভালভাবে উপলব্ধি করেই সরকারও মোটামোটিভাবে দরকষাকষির পর্যায়েই ছিল। এটা একটা দেশের স্বাধীনচেতা মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

হিলারি সরকার ও বিরোধীদলের সাথে বৈঠকের বাইরেও বৈঠক করেছেন ইউনুস ও আবেদের সাথে। উল্লেখিত দুই জন বাংলাদেশের রক্তচোষাদের আইকন হতে পারেন। তাদের দুইজনের মতামতও অভিন্ন। তাই হিলারি উপদেশ দিয়ে যেতে পেরেছেন গ্রামীণ ব্যাংকে সাথে ইউনুসের সম্পর্কের বিষয়ে। কিন্তু হিলারির এই মতের উল্টাপথে হেঁটেছে সরকার। গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনুস সম্পর্কে হিলারি বক্তব্যকে যেভাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘যুক্তিহীন’ বলেছেন তাতে করে মেরুদণ্ড সহ একটা সরকারের প্রতিচ্ছ্ববি দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত এই প্রথম এমন মন্তব্য এলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির মন্তব্যের বিপরিতে। এটাকে এক দৃষ্টিতে সবাই সাধুবাদ জানানো উচিত বলে মনে করি।

সারা বিশ্বে চোখ রাঙিয়ে শাসন করতে চায় আমেরিকা। তাদের যে কোন উপদেশই শেষ কথা বলে স্বীকৃত। হিলারি ক্লিনটন প্রবল ক্ষমতাশালী সে দেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই প্রবল ক্ষমতাশালীদের উপদেশের বিপরিতে দাঁড়িয়ে সরকার কতটুকু কি করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। তবে আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হচ্ছে হিলারির এই রকম প্রেস্কিপশন প্রথম রাতেই ধোপে টেকেনি। ভবিষ্যতে কি হয় তাই দেখার বিষয়!