ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে। মির্জা ফখরুলের পালানো এবং বোরকা নাটকের পর হিলারী-প্রণবের ঢাকা সফরে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে উস্কে দেয়ার পর বিএনপির রাজনীতি আদতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তাদের দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের হারিয়ে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে এখন আর মাথা ব্যথা নাই। ক্ষমতার কাছে ঘুরপাক খাচ্ছে সব। ফলে একজন ইলিয়াস আলি তাদের কাছে মূখ্য কিছু নয়। তাদের দরকার ক্ষমতা এবং যে কোন মূল্যে তারা ক্ষমতায় যেতে চায়।

ইলিয়াস আলীর হঠাত করে নিখোঁজ হওয়ার কাহিনী নিয়ে দেশ মহারণে মেতেছিল। পাঁচ দিন হরতাল হয়েছে। ছয়জন লোক মারা গেছে। সচিবালয়সহ ঢাকার অনেক জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। কোটি টাকার সম্পদহানী হয়েছে। বিএনপি ছিল রণমুর্তিতে। অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল সরকার এই যাত্রা পেরে উঠতে পারবেনা। কিন্তু মির্জা ফখরুল সহ বিরোধীদলের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার উপর মামলা দিয়ে সরকার এ যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেছে। মামলা খেয়ে মির্জা ফখরুল পালিয়ে যান এবং হথাত করেই আবির্ভূত হন বোরকা পরে। দেশের প্রধান বিরোধীদলের মহাসচিবের এমন পলায়নপর মনোবৃত্তিকে আর যাই হোক তাঁর নের্তৃত্বে আন্দোলনের আশা করা বোকামি। মির্জা ফখরুলের পালিয়ে যাবার পরে আন্দোলনে ভাতা পড়ে এবং এই সুযোগে সরকারও নিজেকে গুছিয়ে নিতে সমর্থ হয়।

বিএনপির আন্দোলনের মাঝপথে বাংলাদেশ সফরে আসেন হিলারি ও প্রণব একইদিনে। এবং তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে মোটামুটিভাবে সমর্থন দিয়ে বসেন। যা সরাসরি বিএনপির দাবির সাথে একই। হিলারির পর ইইউ রাষ্ট্রদুতেরা একই ভাষায় কথা বলে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মতামত দেন। বিএনপি বগল বাজাতে শুরু করে যে বিদেশি মেহমানদের কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু করতে হবে। সরকার এসব কথাগুলোকে এখন পর্যন্ত তোয়াক্কা করনি ফলে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের বাইরে কথার মারপ্যাচে পড়ে সারা দেশে প্রচার করছে বিদেশিদের দাবিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আওয়ামীলীগ বিএনপির এই প্রচারণাকে লুফে নিয়ে প্রচার করছে বিএনপির নিজস্ব কোন বক্তব্য নেই দেশ সম্পর্কে বিদেশি মেহমানেরা যা বলবে তারা তাই করবে। এটা তাদের নতজানু নীতি। এই নীতিতে যারা বিশ্বাস করে তাদের দ্বারা দেশে উন্নয়ন সম্ভব না। এই কথার মারপ্যাচে পড়ে বিএনপি ভালোই ক্ষতিগ্রস্থ হল এবং মাঝপথে আন্দোলনও থেমে গেল।

বিএনপির আন্দোলন শুরুতে মূল ইস্যু ছিল ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার। কিন্তু তাদের অদূরদর্শিতার কারণে তারা তাদের প্রিন্সিপ্যাল থেকে দূরে চলে আসে। সরকার পতনের আন্দোলন বলে দাবি করে। এবং সরকার এই বার্তা সব জায়গায় পৌছে দেয় যে বিএনপির মূল উদ্দেশ্য সরকার পতন ইলিয়াস আলী উদ্ধার নয়। কারণ ইলিয়াসকে তারা নিজেরাই লুকিয়ে রেখেছে। তারপর মির্জা ফখরুলের পালিয়ে যাবার পর পুলিশ তাকে খুঁজে না পাওয়ায় এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে পুলিশ আদতে একটি অকার্যকর বাহিনী। এই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাস্যকরভাবে নিজেকে ‘সফল’ বলে দাবি করেন। বিএনপি এ ফাঁদেও পা দিয়ে তাদের প্রিন্সিপালকে ডাইভার্ট করে নেয়। ফলে ইলিয়াস আলী উদ্ধারের আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে মাঝপথে এবং অনিশ্চয়তা থেকে আরো অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হয় ইলিয়াস আলীর পরিবার। তিনি বেঁচে আছেন কিনা মারা গেছেন সে সংবাদটিও পাচ্ছেনা তাঁর পরিবার।

ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হবার পর বিএনপি জনগণের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা সত্ররক ছিলনা আওয়ামীলীগের নীতি নির্ধারণী কৌশলের কাছে। আওয়ামীলীগের ধূর্ততার কাছে তারা হার মানে। আওয়ামীলীগ ভাল করেই জানে কিভাবে বিরোধীদলের দলের আন্দোলনকে টুঁটি চেপে ধরতে হয়। তাই তারা একের পর এক ইস্যু তুলে দেয় বিএনপির সামনে। একই সাথে এতগুলো ইস্যু পাবার পরে বিএনপি খেই হারিয়ে ফেলে। এ আওয়ামীলীগ প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানী বাহিনীর বিপক্ষে আন্দোলন করে তবেই দেশকে একটা স্বাধীনতার আন্দোলনের মুখে নিয়ে এসেছিল। আন্দোলন সংগ্রামে একেবারে নবিস একটা দলকে কিভাবে ঘায়েল করতে হয় তাদের ভালই জানা ছিল তাদের। তাই তারা সফল হয়েছে বিএনপির আন্দোলনকে চেপে ধরতে। আর হিলারি-প্রণবের সফরের সময়ে কৌশলে যখন ইউনুসকে নিয়ে মেতে উঠে বিএনপি তখন দেশের সুশীল সমাজও ইলিয়াস আলী ইস্যু ভুলে গিয়ে ইউনুসকে নিয়ে মেতে উঠে। এখানেও লাভবান হয় আওয়ামীলীগ কারণ ইলিয়াস আলী ইস্যুতে সুশীল সমাজ যেখানে বিএনপির পাশে ছিল সেখানে তারা এখন ইউনুসের পক্ষাবলম্বন করছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে ইলিয়াস আলি ইস্যু।

ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাহসিনার মুখ থেকে দেখা করার ইচ্ছা শোনার সাথে সাথে রাজি হয়ে যান। তারপর গণভবনের সাক্ষাৎকারের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ পায় মিডিয়ায়। এই দেখা করা দেশের সুশীল সমাজ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। এবং কিছু কিছু মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করে যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মমতাময়ী রূপের। এটা হতে পারে একটা রাজনৈতিক কৌশল। প্রধামনন্ত্রী যেভাবে আবেগে গদগদ হয়ে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন তাতে করে আশবাদী হয়ে উঠেছিলেন রুশদীর। কিন্তু এর বেশ কয়েকদিন যাবার পরেও কোন হদিস নাই তার। এর অর্থ দাড়িয়েছে মানবিক আবেদনের কাছেও রাজনীতি চলে এসেছে। অনেকের ধারণা ইতিমধ্যে ইলিয়াস আলী বেঁচে নেই। তাই কিভাবে ফিরিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী?

বিএনপির অদূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কৌশল অনুযায়ী কৌশল, সোহেল তাজের পদত্যাগ নাটক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সফল’ দাবি করা, মির্জা ফখরুলের পলায়নপর মনোবৃত্তি, হিলারি-প্রণবের বিএনপির দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন, ইইউ রাষ্ট্রদূতদের আলোচনার আহ্বান, সরকারের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখান, ইউনুসকে নিয়ে হঠাত বিতর্ক এবং এখানে সরকারের আগ্রাসী মনোভাব এবং সুশীল সমাজের মতভিন্নতা সব কিছু মিলিয়ে ইলিয়াস আলী ইস্যুতে বিএনপির দাড় করা আন্দোলন মাঝপথে থেমে গেছে। যে মির্জা ফখরুল আগে প্রতিদিন কান ঝালাপালা করতেন মিডিয়ার সামনে এখন তার হঠাত খানিকটা চুপসে যাওয়া সবকিছু মিলিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরকার সফল হয়ে গেছে বিরোধীদলের আন্দোলনকে কৌশলে থামিয়ে দিতে। এখন আর উচ্চকণ্ঠে কেউই ইলিয়াস আলী ইস্যুতে কোন কথা বলেনা।

যে পরিবার এতদিন অনিশ্চয়তায় ছিল তারা এখন আরো বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইলিয়াস আলী বেঁচে না থাকলে পরিবারের একটা সান্ত্বনা থাকত তিনি আর ফিরে আসবেন না। যদিও এটা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু এখন এমন এক অবস্থায় যেখানে পুলিশি কোন অভিযানও নাই আবার নাই বিএনপিরও কোন ভূমিকা। সব কিছু মিলিয়ে ইলিয়াস আলী পরিবার এখন চরম হতাশার মাঝে।

ইলিয়াস আলী ফিরবেন কি ফিরবেন না তার একটা পরিষ্কার ঘোষণা আসা উচিত সরকারের পক্ষ থেকে। সরকারের পরিষ্কারভাবে বলা উচিত এখনও কি উদ্ধার অভিযান চলছে। যদি না চলে থাকে তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষনা করা উচিত। এতে ইলিয়াস পরিবার খুব কষ্ঠ পেলেও ধরে নেবে ইলিয়াস আলী আর ফিরছেন না। ইলিয়াস আলির নিখোঁজ এবং এ পর্যন্ত সবকিছুর জন্যে যেমন সরকার দায়ি ঠিক একইভাবে জল ঘোলা করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিএনপিও সমভাবে দায়ি।