ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২২ মে শুক্রবার বিকেলে ‌’চলন্ত মাইক্রোবাসে গারো তরুণীকে গণধর্ষণ’ প্রতিবেদনটি লেখার সময় আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে আসছিল আমার নারী সহকর্মী, কর্মজীবী নারী স্বজনদের চেহারা। আমার বুক কাঁপছিল। তথ্যের প্রয়োজনে যখন গারো নৃ-গোষ্ঠীর বোনটির সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম-তখনো মেয়েটির গলা কাঁপছিল। আমার কণ্ঠটিও বারবার স্তব্ধ হয়ে আসছিল। নিষ্ঠুরের মতো কী তথ্য নেব তার কাছে? শান্তনাই দিচ্ছিলাম মেয়েটিকে। বলছিলাম শক্ত হতে হবে। আর মনে মনে ক্ষমা চাচ্ছিলাম-বোন আমাদের ব্যর্থতাকে ক্ষমা করো, প্রতিবাদী হও তুমি।
দেশের কোনো গ্রাম বা চরাঞ্চলের ঘটনা এটি নয়। কোনো শহরের উপকণ্ঠও নয়। গারো বোনটি পুরুষ নামের একদল হায়েনার শিকার যেখানে হয়েছে-সেটি আমাদের রাজধানী। এবং তা রাজধানীর অভিজাত এলাকা। এজন্যই আতঙ্কটা আরো বেশি। আমরা যা ধারনা করতে পারি না-তাই ঘটলো ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়! রাস্তায় এতো আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, হাকডাক করে বসানো এতো সিসি ক্যামররা? কই কর্মজীবী গারো মেয়েটির ইজ্জত রক্ষায় কিছু কী কাজে আসলো? কী হচ্ছে এসব?
পাশবিকতার শিকার মেয়েটির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর কুড়িলে যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে বিক্রয়কর্মী আমাদের সেই বোন। প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে দায়িত্ব শেষ করে বাসায় ফেরার জন্য বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। তার সামনে একটি মাইক্রোবাস থেমেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুখচেপে তাকে তুলে নিল। এরপর চলন্ত মাইক্রোতেই তার উপর পাশবিক বর্বর নির্যাতন চালালো ৫ নরপশু। রাত পৌনে ১১টার দিকে তাকে যখন উত্তরায় বাসার অদূরে নামিয়ে দিল, তখন মেয়েটির পুরো পৃথিবীটা, পুরো স্বপ্ন ভেঙ্গে শেষ।
ঘটনার সময়কার রাত কিন্তু বেশি নয়। মাত্র সাড়ে ৯টা। রাজধানীর রাস্তায় এতটুকু রাতেই আমরা আমাদের একটি বোনকে নিরাপত্তা দিতে পারি না! নিরাপত্তার কথা বলছি কেনো? মেয়েটির প্রতি যা ঘটনো হলো-এ ঘটনা কেন ঘটবে? তাহলে কি আমাদের বোনেরা ঘর থেকে বেরুবে না? যেসব নরপশু এমন বর্বরতার সৃষ্টি করলো ওদের কী ঘরে মাবোন নেই? ওরা কী মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়নি? যদি তাই হয়-রাস্তা থেকে ধরে একটি বোনকে ওরা পাশবিকতা করলো? ওরা কী পুরুষ? ওরা কী মানুষ? ছি:, ছি বলছি একারণে-আমিও যে পুরুষ, আমিও যে মানুষ। আর আমি যে শহরে থাকি, যে দেশটা নিয়ে গর্ব করি-সেখানেই এমন বর্বরতা?

হয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমাদের ধিক্কার দিচ্ছে মেয়েটি। এ লজ্জা যে আমাদের, এ ধিক্কার প্রাপ্য আমাদের। আমরা ধিক্কার পেতেই থাকবো-যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের একটি বোনের জন্য কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার রাস্তাটুকু নিরাপদ করতে না পারবো। আমরা ধিক্কার পেতেই থাকবো-যতক্ষণ পর্যন্ত নরপশুরা গ্রেফতার না হবে। আমরা তোমার নিরাপত্তা দিতে পারিনি, এজন্য তোমার কাছে আরো বেশি ধিক্কার চাই দিদিমণি।