ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 
aaa

অন্ধকার যুগে মেয়ে নবজাতক হলে নাকি জীবন্তই পুতে ফেলা হতো। এখন অতি আধুনিক যুগ চললেও সেই নিষ্ঠুরতা কি বন্ধ হয়েছে? মাঝেমধ্যেই তো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে অন্ধকার যুগের নির্মমতা দেখিয়ে দেয়। রাজধানীর কাফরুলে এক মেয়ে নবজাতককে ঘিরে সেই নিষ্ঠুরতার প্রমান মেলে।

জন্মের পর মায়ের বুকের ওম পাওয়া হয়নি নবজাতকটির। স্থান হয়েছিল স্যাঁতস্যাতে আর্বজনার স্তুপের পাশে। বাঙালি সমাজে পোয়াতি ঘরের নতুন অতিথির মুখে মধু দিয়ে বরণ করা হলেও নবজাতকটির ভাগ্যে তা দূরের কথা, এক ফোটা পানিও জুটেনি। উল্টো নিজেই খাবার হতে চলেছিল কুকুরের। খাবলে খেয়েছে আঙুল, নাক ও ঠোটের অংশ বিশেষ। কৈশরের দুরন্তপনায় মেতে থাকা কয়েকটি শিশু আর এক নারীর মহানুভবতায় মরতে মরতে বেঁচে গেছে সে। গত ১১ অক্টোবর সেই নবজাতকটি ২৭ দিনের মাথায় এখন শিশু, সদ্য ক্ষত শুকানো ঠোঁটে তার হাসির ঝিলিক। যেন হাসতে হাসতেই তার ‘নিষ্ঠুর’ কয়েক স্বজনকে জানান দিচ্ছে নিজের আগমনী বার্তা। ডাগর হাতের বাহু নাড়িয়ে যেন কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে সেই দুরন্ত কিশোরের দল, উদ্ধারকারী নারী আর বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা করা চিকিৎসক আর হাসপাতালের সেবিকাদের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টানা ২৭ দিন চিকিৎসা শেষে শিশুটির নতুন ঠিকানা এখন সমাজ সেবা অধিদফতরের আজিমপুরের ‘ছোটমণি নিবাস’। এতোদিন হাসপাতালের অচেনা-অপরিচিত মানুষগুলোই তার প্রাণের স্বজন হয়ে উঠেছিলেন। ১১ অক্টোবর রোববার তারাই আপন সন্তানের স্নেহে তার নাম রাখলেন ফাইজা, যার অর্থ বিজয়নী। সত্যিই তো নবজাতক থেকে শিশু হয়ে ওঠা ফাইজা এক বিজয়নীর নাম। যদিও এর আগে হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে চিকিৎসক আর নার্সরা অতি মমতায় তাকে ডেকেছিল রাজকুমারী, আবার কখনও রাজকন্যা নামে।

আজকে ফাইজা হয়ে ওঠা শিশুটির শুরুটা অতি করূন ছিল। গত ১৫ সেপ্টেম্বর পড়ন্ত দুপুরের ঘটনা। কাফরুলের পুরনো বিমানবন্দরের মাঠের ঝোপে সিমেন্টের খালি বস্তায় মোড়ানো আবর্জনার স্তুপের পাশে পড়েছিল সে। একদল কুকুর সেই বস্তা ভেদ করে নবজাতককে টেনেহিঁচড়ে নিজেদের খাবারে পরিনত করেছিল। কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দে এগিয়ে যায় কিশোরের দল। ক্ষুধার্ত কুকুরগুলোেক ঢিল ছুড়ে তারা। কিশোর দলের অনুসন্ধানী চোখ আটকে যায় রক্তাক্ত একদিন বয়সী ছোট্ট বাচ্চার দিকে। চিৎকার দেয় ওরা। ওই পথে যাওয়ার সময় জাহানারা নামে স্থানীয় এক নারী মহানুভবতার হাত নিয়ে এগিয়ে যান। দেখেন এখনো যে প্রাণ অাছে নবজাতকের দেহে! আহা ! নাভির নাড়িও কাটা হয়নি তার। মায়ের মমতায় ছিন্ন করেন নবজাতকের নাভির নাড়ি। উদ্ধার করে নিজেই নিয়ে যান হাসপাতালে। এরপর নবজাতকটি ঘিরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের অারেক মহানুভবতার ইতিহাস শুরু হয়। তাকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বোচ্চ বাসনায় হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লার নেতৃত্বে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের চিকিৎসক বোর্ড। নিরন্তর চেষ্টায় সফল হন চিকিৎসক দল।
জাতীয় কন্যা শিশু দিবসের এক দিন আগেই ১১ অক্টোবর সেই শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদফতরের ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরিচয়হীন ফাইজার যেন কতো মানুষ এখন পরিচিত। হাসপাতালের নার্সরা তাকে আপন মমতায় সাজুগুজো করায়। সেই হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ছুটে গিয়েছিলেন উদ্ধারকারী জাহানারা নামের সেই মহান নারীও। নতুন ঠিকানায় দেওয়ার আগে ফাইজাকে কোলে তুলে নেন মায়ের মমতায়। ‌কোল খালি করে ‘আপন’ সন্তানের বিদায় বেলায় বারবার চোখ মুছেন তিনি। ফাইজাকে ঘিরে হাসপাতালে জমে ওঠা উৎসবে যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমানও। শিশুটিকে বারবার আদর করেন তিনি। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে পরিচালক বলেন, শিশুটি আপাতত ছোটমণি নিবাসে যাচ্ছে। অবশ্য অনেকেই ওর দত্তক নিতে চেয়েছিলেন। আদালতের অনুমতি না থাকায় দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা চাই ও প্রকৃত বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাক। এরপরও যদি কোনো নিঃসন্তান দম্পতি ফাইজাকে সন্তান হিসেবে নিতে চান তাহলে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।