ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

স্কুল জীবনে এলাকায় কোন কুইজ প্রতিযোাগিতা হলে একটি প্রশ্নটি কমন থাকতো- ‘মোদের গরব মোদের আশা/ আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটির গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেনের পৈত্রিক ভিটা কোথায়? শিক্ষকদের কাছে গিয়ে, এলাকায় যারা সাহিত্য চর্চা করেন-সেই বড় ভাইদের কাছে গিয়ে প্রশ্নের উত্তরটা জানার চেষ্টা করতাম। সাহিত্যের নানা পান্ডিত্ব জাহির করে সন্দেহ রেখে প্রশ্নটির উত্তরটা বলতেন ‘দক্ষিণ বিক্রমপুরের মাগর-ফরিদপুর গ্রামে।’ কেউ বলতেন-‘ফরিদপুর বা মাদারিপুরে।’ আবার কারো উত্তর ছিল শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার মগর গ্রামে। স্কুল জীবনে একটি প্রশ্নের তিন ধরনের উত্তর পেয়ে অনেকদিন দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম।

 

পৈত্রিকভিটায় বাবার স্কুলের সামনে অতুলপ্রসাদ সেনের নির্মানাধিন ম্যুরাল
ছবি: পৈত্রিক ভিটায় বাবার স্কুলের সামনে অতুলপ্রসাদ সেনের নির্মানাধিন ম্যুরাল
অবশ্য এর পুরো সত্য নিশ্চিত হতে স্কুল জীবন পার করে কলেজ জীবন শেষ করতে হয়েছে। সেই সময়টা ২০০৩ সাল, ২৭ এপ্রিল। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যয় আসলেন নড়িয়ার মগর গ্রামে। অজপাড়া গাঁয়ে কেন আসলেন এতো বড় বিখ্যাত মানুষ? ছোট বেলায় মনে পুষে রাখা উত্তরাটো নিশ্চিত হলাম এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে। অতুলপ্রসাদের ভিটেতে ঘুরতে এসেছেন তিনি, অতুলপ্রসাদের বাবা রামপ্রসাদ সেনের নামে নির্মিত স্কুল পরিদর্শনে এসেছেন। এরপরই নিশ্চিত হলাম বাঙালির ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণাদায়ক সেই গানের গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেনের পৈত্রিক ভিটা নড়িয়ার মগর গ্রামে।
উইকিপিডিয়া তথ্যানুযায়ী, অতুলপ্রসাদ ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তাঁর মামা বাড়িতে জন্মেছিলেন। ২০ অক্টোবর ছিল উনিশ শতকের বিশিষ্ট এই বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞের ১৪৪ তম জন্মবার্ষিকী। ওইদিন বিভিন্ন পত্রিকায় জন্মদিনের খবরটি বেরুলেও ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম সারির বাংলা দৈনিক সমকাল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খবরটি ছাপে। কাগজটির শরীয়তপুর প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম পাইলটের লেখা প্রতিবেদনটি ছিল ‘অতুল প্রসাদকে মানুষ মনে রাখবে তো!’ শিরোনামে।  (http://www.samakal.net/2015/10/20/168691 ) প্রতিবেদনটির বিস্তারিত পড়ে যা জানা গেল- এখনো অতুলপ্রসাদের ভিটের মানুষ তার সম্পর্কে কমই জানেন। আমি অতুলপ্রসাদের পৈত্রিক ভিটা এলাকার সন্তান হয়ে ছোট বেলায় যেমন তার সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নটির উত্তরও জানতাম না, এখনও নড়িয়ার স্কুল শিক্ষার্থীদের সেই একই অবস্থা বলেই মনে হল। আমাদের দোষ দিয়ে লাভই বা কী? স্থানীয়ভাবে অতুলপ্রসাদ, তার বাবা রামপ্রসাদ সেন সম্পর্কে অামরা অজ্ঞ ছিলাম, হয়তো আমাদের অজ্ঞই রাখা হয়েছিল। অথচ নিজের গ্রামের অন্ধাকার দূর করতে, শিক্ষা বিস্তারে কতো উদ্যোগ ছিল এই মহান ব্যক্তির। নিজ গ্রামে শিক্ষার প্রসারে তিনি নিয়েছেন বিবিধ উদ্যোগ। এই মানুষটির স্মৃতি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয়দের মধ্যে কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি তার নিজ গ্রামের নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি অজানাপ্রায়।

বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবির একজন অতুলপ্রসাদ সেন। যদ্দুর শুনেছি, পশ্চিমবঙ্গে তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণা হয়। আর তার পৈত্রিক ভিটার অতিনিকট প্রতিবেশীরা বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ব্যিক্তর বসতঘরটিও দখল করে নিয়েছে! সেই খবরও রয়েছে ওই প্রতিবেদনে।


ছবি: ‘দখল’ হয়ে থাকা অতুলপ্রসাদের পৈত্রিক বাড়ি

অবশ্যসমকালের প্রতিবেদনে অতুলপ্রসাদ সেনের স্মৃতি ধরে রাখতে উদ্যােগের খবরও রয়েছে সমকালের প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম পাইলটের লেখায়। অতুলপ্রসাদের বাবার নামে গড়া ‘পঞ্চপল্লী গুরুরাম উচ্চ বিদ্যালয়ের’ প্রধান শিক্ষক গৌতম চন্দ্র দাসকে উদ্ধৃত করে সেখানে বলা হয়েছে, ‘অতুলপ্রসাদের স্মৃতি ধরে রাখতে সেই স্কুলে জেলা প্রশাসনের উদ্যােগে তার একটি ম্যুরাল স্থাপন করা হচ্ছে।’ শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক রামচন্দ্র দাসের এমন উদ্যােগ সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। ছোট্ট পরিসরে হলেও বিখ্যাত গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেনের স্মৃতি ধরে রাখার এমন উদ্যোগের জন্য স্থানীয় সাহিত্যপ্রেমীরা জেলা প্রশাসকের কাছে সব সময়ই কৃতজ্ঞ থাকবেন।

সমকালের প্রতিবদেনে জেলা প্রশাসক রামচন্দ্র দাসকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘অতুলপ্রসাদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় ও বাড়ি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। তার স্মৃতি মানুষ প্রায় ভুলতে বসেছে। তখন বিদ্যালয়ে একটি ম্যুরাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিই। এর নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে।’ ‌ম্যুরাল নির্মানের পাশাপাশি অতুলপ্রসাদের বসতঘরটি দখলমুক্ত করে সেখানে জাদুঘর বা লাইব্রেরী তৈরির উদ্যােগ নিলে পুরো শরীয়তপুরবাসী তথ্য গোটা দেশের বাংলা সাহিত্য-সংগীতপ্রেমীরা জেলা প্রশাসকের কাছে আজীবন যে কৃতজ্ঞ থাকবেন-সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

শেষ করবো অতুলপ্রসান সেনের সমাধির খবর দিয়ে-অতুলপ্রসাদ সেন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের না জানার মধ্যে তার মৃত্যু পরবর্তী ঘটনাও রয়েছে। ১৯৩৪ সালের ২৭ আগস্ট তার পরলোকের খবর জানা থাকলেও সমাধি বা শ্মশান কোথায় তা আমাদের অনেকেরই অজানা ছিল। দৈনিক সমকাল ২০১৫ সালের ২২ মে তারিখে এক প্রতিবেদনে অতুল প্রসাদের সমাধির ‘সন্ধান’ পেয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পত্রিকাটির বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব নূর ও গাজীপুর প্রতিনিধি ইজাজ অাহমেদ মিলনের ‘কাওরাইদের সুতিয়াতীরে অতুলপ্রসাদের সমাধি’ শিরোনামে সচিত্র ওই প্রতিবেদনে (http://www.samakal.net/2015/05/22/138526) বলা হয়, ‘পঞ্চকবির একজন অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধি আছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদে। শ্রীপুর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে কাওরাইদের সুতিয়া নদী তীরে অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধি। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের কাওরাইদ গ্রামেই ছিল ভাওয়ালের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছারিবাড়ি। এখানেই কালীনারায়ণ গুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি ব্রাহ্মমন্দির। এই ব্রাহ্মমন্দির লাগোয়া সমাধিতে শুধু অতুলপ্রসাদের নন- রয়েছে তার দাদামশাই কালীনারায়ণ ও মামা কেজি গুপ্ত নামে সমধিক পরিচিত স্যার কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের সমাধিও। কালীনারায়ণের কন্যা হেমন্তশশীর পুত্র ছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন।