ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর কিছু ‘চটি’ অনলাইনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এর কিছু কিছু প্রশ্ন যে বিভ্রান্তি ছড়াতে কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবেই করছে-তা বুঝতে আর জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই।  প্রশ্নগুলো এরকম :

১. সব জঙ্গি মরলো কেন?
২. এখন গডফাদারদের চিহ্নিত করবেন কীভাবে?
৩. এতো গ্রেনেড আর গুলির পরও পুলিশের কেউ হাতাহত হলো না কেন?
৪. অভিযানটা সকালের আলোতে হল কেন?
৫. জঙ্গিরা কী বাসায় পাঞ্জাবি আর কেডস পড়ে বসে থাকে? ইত্যাদি সব প্রশ্ন।

বিচ্ছিন্নভাবে এসব প্রশ্ন নানা জায়গায় আলোচনাও হচ্ছে। কেউ ফেসবুকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখছেন। নিহতরা জঙ্গি নয় বলেও কোনো রাজনৈতিক নেতা সন্দেহ করছেন। পুলিশ যেমন এসব প্রশ্ন শুনছে, গণমাধ্যমের একজন কর্মী হিসেবে সেই প্রশ্নটা আরো বেশি শুনতে হচ্ছে আমাদেরও। হয়তো কোনো রাখঢাক না রেখেই অনেক বন্ধু-সহকর্মীর কাছে থেকে সরাসরি এসব প্রশ্ন আসছে। তাদের ধারনা-পুলিশের সঙ্গে কাজ করার ফলে সবকিছুই যেন আমাদের জানা! অথচ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে-এসব প্রশ্নকারীরা আসলে কী বলতে চাচ্ছেন-তাই বুঝছেন না। সন্দেহ যেন তাদের একটা বড় রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সন্দেহকারীদের বড় একটা অংশের উদ্দেশ্য আছে-বিভ্রান্তি ছড়ানো।

নজর দিয়ে দেখেছি-এদের বড় একটা অংশ সব সময় মোটামুটি দল নিরপেক্ষ ভাব নিয়ে থাকেন। ভারভার কথা বলেন। এরমাঝেই সুক্ষ্মভাবে নিজের লক্ষ্যটা পুরণের চেষ্টা করেন। একেবারে সচেতনভাবে সুযোগ বুঝে বাসে, ট্রেনে বা জনসমাগমস্থলে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন ছুঁড়ে এরা চুপ মেরে যান। এদের কাজটাই হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে খাটো করা, সরকারকে খাটো করা। এদের কারো রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ এটা। এদের কেউ কেউ হয়তো পুলিশ বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্থ।

লক্ষ্য করে দেখবেন-এসব প্রশ্নকারীদের ভাবখানা-তারা বুদ্ধিজীবী। অনেক কিছু জানেন। যুদ্ধের সব কৌশল যেন তাদের মুখস্ত। ভাবখানা এমন-এখন কিছুই হচ্ছে না। পুলিশের জায়গায় তারা থাকলে যেন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে উঠবে। আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী না পারলে-কে পারবে- অবশ্য সে প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে নাই।

অযথাই নানা প্রশ্ন সৃষ্টিকারী এসব পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবীরা মনে হচ্ছে সরকারের, পুলিশের ব্যর্থতাটা বড় করে দেখিয়ে কাউকে ‌’দাওয়াত’ করে আনতে চাচ্ছে। পরিকল্পিত সমালোচনাকারীদের এই দলে মোটামুটি সব পেশার লোকজনই আছেন। যদিও খোঁজ নিয়ে দেখবেন-নিজ নিজ পেশায় এরা সফল নন। নিজের কাজে এরা ব্যর্থ হলেও অপরের পেশা সম্পর্কে যেন এরা সবই জানেন, যেন উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অতি অভিজ্ঞ লোক এরা। পুলিশি অভিযান আর জঙ্গি নিয়ে তাদের কল্পিত গল্পে মাঝেমধ্যেই মনে হয় এরা যেন সমর বিশারদ।  এসব সমালোচনাকারীরা উন্নত বিশ্বে সমসাময়িক ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলা এবং তা প্রতিরোধে পুলিশের অভিযানগুলো সম্পর্কে যেন একেবারে অন্ধকারে অথবা যেনেশুনে তা চেপে যান। কারণ আমাদের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী নিয়ে সমালোচনাটা যে তাদের পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যমূলক।

এবার জনমনে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলো থেকে যেভাবে উত্তর খুঁজি তাই বলছি- যদিও এমন অভিযান বা জঙ্গি দমন সম্পর্কে আমি বিশেষজ্ঞ নই।

কল্যাণপুর বা গুলশান ঘটনার পর যে বড় প্রশ্নটা ঘুরছে-সব জঙ্গি মরল কেন?

আরে ভাই, কমান্ডো অভিযান চালাতে গিয়ে কী কেউ শত্রুপক্ষের গালে চুমু খায়? সম্প্রতি উন্নত রাষ্ট্র ফ্রান্স, জার্মান বা যুক্তরাষ্ট্রে তো এমন সন্ত্রাসী হামলার পর অভিযানগুলোতে তা দেখি না। তাহলে আমাদের দেশের বেলায় এমন প্রশ্ন কেনো? আচ্ছা এসব প্রশ্নকারীরা তো বলে না- আহারে সন্ত্রাসীরা এতো মানুষ মারল কেন?

পুলিশের পক্ষ হয়েই যেন দ্বিতীয় প্রশ্নটি করা হয়-এখন নেপথ্যের গডফাদারদের ধরবে কীভাবে? হ্যাঁ কথাটি খাঁটি। তবে ভাইজানেরা, অপরাধ বিজ্ঞান বলে-অপরাধী কিছু প্রমান তো রেখে যাবেই। যদি তাই না হতো-তাহলে একের পর এক আস্তানা আবিষ্কার হচ্ছে কীভাবে, সন্ত্রাসীরা ধরাই বা পড়ছে ক্যামনে।

প্রশ্ন উঠেছে-এতো গ্রেনেড আর গুলির পরও পুলিশের কেউ হাতাহত হলো না কেন? জি, এটা একটা অর্ন্তজ্বালা বটে। সমালোচনাকারীদের কেউ কেউ হয়তো গুলশানের ঘটনার মতো পুলিশ মারা যাক-তাই হয়ত আশা করছিলেন। ভাইরে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবারই। দেশের ইতিহাসের সেই ঘৃণ্যতম ঘটনাটা ঘটেছিল এই প্রথম। হয়তো পুলিশ কিছু বুঝে উঠার আগে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গেছে। এরপর কী পুলিশ সচেতন হতে পারে না? নাকি তাও দোষের? তা ছাড়া অভিযানকারী সোয়াট ইউনিট তো এধরেনর অভিযান চালাতে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইউনিট। নাকি তাও সমালোচনাকারী বুদ্ধিজীবীদের অজানা?

প্রশ্ন একটা থাকে-তাহলে অভিযানটা সকালের আলোতে হল কেন? কমান্ডো অভিযানে পারদর্শী এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আমিও কথা বলেছিলাম। তারা যেমনটা বলছেন-কোনো জিম্মি সংকট হলে আইন শৃঙ্খলা বাহনী জিম্মিদের সর্বশেষ অবস্থাটা জানার চেষ্টা করেন। মুক্ত করতে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। নানা মহড়া চালিয়ে সন্ত্রাসীদের মনোবল দুর্বল করতে এবং রক্ষিত অস্ত্রের মজুদ শেষ করতে ইচ্ছে করেই সময় ক্ষেপন করেন। তা ছাড়া রাতের আধারে অভিযানে সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমানটা যে বেশি হওয়ার শঙ্কা থাকে। আর কমান্ডোরা সব সময় চান যাতে সাধারণের ক্ষতিটা কম হয়।

ব্যক্তিগতভাবে কল্যাণপুরের ঘটনাস্থলটিতে গিয়ে মনে হয়েছে-সেখানে দিনের আলোতে অভিযানটা বেশ যুক্তিযুক্তই ছিল-যেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

তাহলে জঙ্গিরা কী বাসায় পাঞ্জাবি আর কেডস পড়ে বসে থাকে? এসেছে এ প্রশ্নটাও। অভিযানের পর গণমাধ্যমে জঙ্গিদের কালো পাঞ্জাবি পড়া অস্ত্র হাতে হাসিমাখা ছবিটি দেখলে মনে হয় এসব প্রশ্নকারীরা উত্তরটি পেয়ে যাবেন।

বলে রাখি-আমারদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সব সদস্য দুধের ধোয়া-তা ব্যক্তিগতভাবে আমিও মনে করি না। খারাপ কাজের সমালোচনা আমিও করি। এটা পেশাগতভাবেই করতে হয়। তবে যারা আমার নিরাপত্তা, আমাদের নিরাপত্তায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, যে পুলিশ সদস্যটি নিজের জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় কাজ করছেন-তার প্রাপ্য প্রশংসাটুকু আমাকে করতেই হবে। কারণ এরই মধ্যে জন নিরাপত্তায় পুলিশ তার দায়িত্ব ও কত্যর্ববোধের পরিচয় দিয়েছে বলে কেউ দ্বিমত করবেন না বলে বিশ্বাস করি।