ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ফোনের ও পাশ থেকে কাঁপা কণ্ঠ : ভা ই ই…
-কিরে খবর কি?
-না এমনিতে, মনটা ভালো নেই। আপনি কই?
-তোর ক্যাম্পাসের সামনে।

(ক্যাম্পাসের গেট থেকে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল শ্রীকান্ত (ছদ্মনাম)। ঢাকার একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। সারাদিন পার্টি, মিছিল-মিটিং নিয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দ্বিতীয় সারির পদধারী নেতা।)

স্বভাব বিরুদ্ধ গম্ভীরভাবে বসে আছে শ্রীকান্ত।

পরিবেশ ঠাণ্ডা করার দায়িত্বটা আমারই নিতে হল: -কি রে প্রেমে-টেমে ছ্যাকা খাইছস নাকি?
-না ভাই
-তাইলে?
-রতন কাকুর বাড়ির মন্দিরটাও রক্ষা করেনি ওরা! সব ভাঙছে, লুটপাট করেছে।
(সম্ভিত ফেরার পর আমি লজ্জিত হলাম। আরে অামার পূর্ব পরিচিত ছাত্রলীগের এই নেতার বাড়ি তো নাসিরনগর! লজ্জাটা ওই কারণে-ভদ্রতা করেও আগে ওর খোঁজটা পর্যন্ত নিতে পারি নি)
সবকিছু সামলে এবার শ্রীকান্ত বলতে লাগলো:-রতন কাকু তিলে তিলে মন্দিরটা বানিয়েছিল। পাড়ার লোকজনও সেখানে পূজা দিত। সেই পূজার ঘরটাই ভেঙে দিল ভাই!

শ্রীকান্ত বলতেই থাকে-জানেন, রতন কাকুর কোনো শত্রু নাই। সহজ-সরল মানুষটা তো ধর্মান্ধো নয়। শুধু মন্দির বানিয়ে পূজা করতো। সেখানে তার প্রার্থনা ছিল সবার জন্য, সব ধর্মের মানুষের মঙ্গলই চাইতেন রতন কাকু।

জিজ্ঞেস করলাম :-নেতাদের জানিয়েসিছ?
-জানিয়ে আর কি হবে!
-অন্তত ক্ষতিপূরণটা তো পাওয়া যাবে।
-ক্ষতিপূরণ দিয়ে ভাঙা দেবতা হয়তো জোড়া লাগে, মনের দেবতাটা যে ভেঙে গেছে, সেটা জোড়া লাগানো কষ্টের।
-তাইলে আমি পত্রিকায় লিখে দেই, তোর এলাকার বা কেন্দ্রীয় নেতাদের জানাই?
– না, না ভাই, আমি ক্যাম্পাসে জয়বাংলার স্লোগানে মুখরিত করি, অনেক বড় বড় নেতার সঙ্গে চলাফেরা, একসঙ্গে বসি, ছবি তুলি..
-তাতে তাদের বলতে সমস্যাটা কোথায়?
-আমার বাড়ির মন্দির ভাঙছে, লুটপাট হইছে, এইটা মানুষ জানলে মুখ দেখাবো ক্যামনে?

দু’জনের কথোপকথনে গুমট পরিবেশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাই। আর মনে মনে ভাবি- আরে ভাই এতোবড় ঘটনার পর যাদের মুখ দেখানো উচিত নয়, তারা কিন্তু দিব্যি দেখাচ্ছে।

আবার মুখ খুলে শ্রীকান্ত।
-ভাই তারপরও যতটুকু নিরাপদে আছি, এই সরকারের কারণেই।
-তাই বলে সত্যটা, নিজের ক্ষতিটা চেপে যাবি?
-ভুলে যান কেনো এই দেশটা ভালোবাসলেও, পুর্ব পুরুষরা এদেশের জন্য রক্ত দিলেও একটা দোষ আছে-আমরা সংখ্যালঘু!

অামি লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ি। অভয় দিয়ে বলি সব ঠিক হয়ে যাবে শ্রীকান্ত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা এটা করেছে ওরা অন্তত মানুষ নয়। ধর্মীয় কোনো কারণেও করেনি। কারণ এতে তো কোনো ধর্মীয় নেতার নির্দেশনা ছিল না। যারা এটা করেছে-এরা স্বার্থাবাদী, লুটপাটকারী। এই গোষ্ঠি সরকারকে বিব্রত করতেই হয়তো এমনটা করেছে।
-আমিও তাই বিশ্বাস করি -লম্বা নিঃশ্বাসে বলে শ্রীকান্ত।

আমি শুধু শ্রীকান্তকে বলি-হতাশ হলে চলবে না। এই দেশটা কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠির একার নয়। নিশ্চয় আমাদের পূর্ব পুরুষরা জীবন বাজি রেখে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান আলাদা করে দেশটা স্বাধীন করেননি। সবার এই বাংলাদেশ।

ছোট খাটো এক বক্তৃতার পর শ্রীকান্তের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখে জল।