ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

এক ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াতাম। অনেক আগের কথা অবশ্য,ছাত্র অবস্থায় তখন । এক গার্জেন এলো তার ছেলেকে পড়ানোর আব্দার নিয়ে। কার কাছে না কার কাছে থেকে শুনেছে আমি নাকি ভাল পড়াই। অনেক গরু পিটায়ে মানুষ করে দিয়েছি তাই উনার ছেলেটাকে পড়াতে হবে,মানুষের মতো মানুষ বানাতে হবে,ছাগলের পাইলট বানাতে হবে।

ছাগলের পাইলটের কথা বলার আগে একটা গল্প মনে পড়ে গেল । গ্রামের স্কুল টিচার,স্কুলে ছাত্র কম তাই একজন গার্জেনকে বলছে,”কত গরু পিট্যা মানুষ কর‌্যা দিনু আর তোমার ছেলেডাকে স্কুলে দিল্যানা ?”পাশে এক বুড়ি মহিলা ছিল যার এ জগতে কেউ ছিলনা। প্রতি বৎসর একটা করে গরু কিনে,পালে,বড় করে,বিক্রি করে যা পায় তাদিয়ে আরেকটা গরু কিনে আর বাকী অর্থ দিয়ে সারা বছর কোন মতে চলে যায়। বুড়ির মাস্টার সাহেবের কথা শুনে খুব মনে লাগলো। মাস্টার সাহেবতো মুন্দ বুলেনি,আমার গরুটা পিট্যা যদি মানুষ কর‌্যা দিতো তাহলে সেই মানুষটাকে দিয়্যাই আমার সংসার সুখেই কাট্যা যাতো। বুড়ি মাস্টার সাহেবের পা ধরে কাঁদা শুরু করে দিল,মাস্টার আমার গরুডাকে মানুষ বানিয়্যা দ্যাও,দোহাই লাগে তুমার,এ সংসারে আমার কেহু নাই,আমার গরুডাকে মানুষ বানিয়্যা দ্যাও। মাস্টার মশাই তো বেকায়দা। যতই বুড়িকে বোঝানোর চেষ্টা করে ততই বুড়ি আঁকড়িয়ে ধরে,বুঝতেই চায়না। উপায়ান্তর না পেয়ে মাস্টার সাহেব বুড়ির গরুটা নিয়ে বললো,১৫ দিন পর আসো তোমার গরুডাকে পিট্যা মানুষ বানিয়্যা দিবো। মাস্টার বাড়িতে গিয়ে ভাবে বুড়িতো ১৫ দিনের মাথায় ঠিকই এসে হাজির হবে,কি করা যায় । এবং পনেরো দিনের মাথায় বুড়ি হাজির হয়েও গেল। আবারও ১৫ দিনের সময় চাইলেন মাস্টার মশাই। বুড়ি চলে গেল। এর মধ্যে মাস্টার মশাই একদিন গরুটাকে বাজারে বিক্রি করে দিলো। বুড়ি আবারও এলো । মাস্টার সাহেব জবাব দিলেন,তোমার গরুডাকে পিট্যা শুধু মানুষই বানাইনি জেল দরোগাও বানিয়্যা দিয়্যাছি,কোটে গেলেই দেখতে পাব্যা। বুড়ি তাই করলো সত্যিইতো,ঐ যে ভেতরে দেখা যায়। প্রবেশের অনুমতি নিতে গিয়ে বুড়ি হামবড়া ভাব দেখিয়ে বললো,এক মিলিটে তোমার চাকরি খায়্যা ফেলতে পারি জানো ? বুড়ি জেলদারোগার মাথা নাড়ে, আদর করে, আর ভাবে এবার একটা গতি হলো ! হঠাৎ জেলদারোগা মাথা ঝাঁকিয়ে হুংকার ছাড়ে এই বুড়ি তোর মতলবডাকি শুনি ? বুড়ি বলে,তোর সেই পুরোনো অভ্যাসটা এখনও যায়নিরে! তুই এরকম কর‌্যাই মাথা লড়াতিস আর হাম্বা করতিস!

কাউকে ছোট বা বড় করা আমার উদ্দেশ্য না। গল্পটা এক ফুটপাতের হকারের কাছে থেকে শোনা। এখানে থেকে আমি কিছু শিা পেয়েছি,আপনিও পেতে পারেন। আর আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা যেভাবে গরু পিটিয়্যা মানুষ বানানোর পদপে লিয়্যাছেন তাতে মুনে হোছে অসহায় বুড়ির মতো আমরাও অহরে(ওদের) পায়ে ধর‌্যা আব্দার জানাছি ”আমার গরুডা পিট্যা মানুষ বানিয়্যা দ্যাও”।মুনে রাখবেন গরু পিটিয়ে মানুষ হবেনা উল্ট্যা আরো হাটে তুলবে,তখন আম ছালা সবই হারাবেন। আর এই মাস্টার গদিতে বস্যা মদি(মদ) খাবে। আপনি-আমি তখন উল্যা খ্যাড়ের মুতন পড়্যা থাকবো। সুতরাং দেশ আমার(অর্থাৎ জনগনের), রাজনীতি হবে আমার(জনগনের)। আমার মৌলিক অধীকার(ভাত,কাপড়, বাসস্থান, শিা,চিকিৎসা,যোগাযোগ,গ্যাস,বিদ্যুৎ,নীতি-নৈতিকতা,সার্বভৌমত্ব) নস্যাত করে কিসের রাজনীতি করেন ? নাকি ভুল বুল্যাছি ? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা কর‌্যা দেখবেন।

গার্জেনের কথায় আমি ইমপ্রেস্ট নাহয়ে পারলাম না । তিনি কিছু মুল্যবান কথা বললেন,আমার ছেল্যাডার মাথা একদম ঠিক,খুব পড়্হা ল্যাখা কিন্তু পোহোড়তে(পড়তে) চাহায়না(চায়না)। মেয়্যাডাও তাই। বুলে কিযে,আমার পোহোড়তে ভাল লাগে না,সাজু-গুজু করতে ভালো লাগে। আহ! কত সুন্দর কথা।

গার্জেনকে বল্লাম,আপনার সন্তানকে আমি তিন দিন পড়িয়ে টেস্ট করবো। তিন দিনের মধ্যেই আমি বুঝে নিব আমার দ্বারা আপনার সন্তান উপকৃত হবে কিনা। যদি বুঝতে পারি আমার দ্বারা হবেনা তাহলে আমি সরে আসবো,টাকা পয়সা দিতে হবেনা।
ছ্ত্রা পড়াতে শুরু করলাম। কাস ফাইভ এর ছাত্র। প্রথমদিন পড়িয়ে হালকা কিছু হোমটাস্ক দিয়ে এলাম। পরেরদিন গিয়ে হোমটাস্ক বের করতে বলায় সে বইগুলো এমনভাবে নাড়াচাড়া শুরু করলো মনে হলে কিছু একটা খুঁজছে। এমনকি কিছুন পর উঠে কিছু না বলেই ভেতরে চলে গেল। এলো ১৫-২০ মিনিট পরে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
–কোথায় গেছিলে ? ..কথা নেই।
–কি হলো,বাড়ির কাজ কই ? ..কথা নেই।
–কি হলো,কথা বলছোনা কেন ?
–স্যার আমার অংকের খাতাডা পাতলা তো…
–তো কি হয়েছে ?
–ছাগলে খেয়ে ফেলেছে !
–ছাগলে খাতা….

হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে গেল। মনে হলো এটাই এর রোগ,এটা আমাকে সারাতে হবে! এলো-পাথাড়ি কিল বসালাম কয়েকটা পিঠের উপরে। সে হতচকিয়ে গেল । এ কিরে বাবা, নতুন টিচার না জল্লাদ! আল্লাহর রহমতে পজিটিভ ফল হলো। পড়া-লেখা করতে লাগলো কিন্তু একটা পর্যায়ের উপরে উঠাতে পারছিলাম না। ভাবলাম অন্যকেউ এলে ভাল করবে। তাই ছেড়ে অন্য একজন টিচার দিয়ে এলাম । কিন্তু উনিও তেমন সুবিধা করতে পারলেন না। কয়েকদিন পরে সেই ছাত্র সহ গার্জেন এলো পড়ানোর রিকুয়েস্ট নিয়ে। ছাত্রকে বল্লাম,বাবা পড়া-লেখা সম্পূর্ণ তোমার ভেতরে তুমি নিজে যদি না পড়ো তোমাকে কেউ পড়াতে পারবে ? পারবেনা। টিচার তোমার পড়া করিয়ে দিতে পারবেনা তবে সহজ করে দিতে পারবে। হি ইজ অনলি এ গাইড। আর গার্জেন কে বল্লাম,একজন প্রাইভেট টিউটর আপনার বাসায় বড়জোর ২ঘন্টা থাকে বাকী সময়টুকু সন্তান আপনাদের সঙ্গেই থাকে । সুতরাং আপনি যদি সন্তানের প্রতি ল্য এতটুকুও না রাখেন,তাহলে ঐ সময় টুকু গায়েবি ভাবে তো আর আমি গাইড করতে পারিনা । আপনার সন্তানের সকাল-সন্ধায় পড়তে বসাটা নিশ্চিত করেন,ভাল করবে। আর মনে মনে বল্লাম,”আর না করলে ছাগলের পাইলট হবে।”

একটা রিকুয়েস্ট,আপনার সন্তানকে ভাল শিক্ষা বা প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই দিবেন তবে জেনে বুঝে আপনার মেন্টালিটি ঠিক করে দিবেন। মনে রাখবেন টাকা থাকলেই হজ্জ হয়না,বড়জোর দিল্লি পর্যন্ত যাওয়া যায়। আর শিকদের প্রতি অনুরোধ,ছাত্রের রোগ চিহ্নিত করে ঔষধের ডোজ দিন ভাল ফল পাবেন। সব ছাত্রকে একই ডোজ ব্যাবহার করবেন না। ছাত্রদের পেটাবেন না। দেখবেন একবার যদি ছাত্র পেটানো শুরু করেছেন তো আর থামতে পারবেননা। মাস্টরের সন্তান বেশিরভাগ ভোরস্ট(ভ্রস্ট) হয়,খুঁজলে দেখা যাবে ঐ মাস্টর ছাত্রকে পেটায় বেশি।