ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমি তো তখন জম্মাইনি। আমার এক বোন আর এক ভাই জম্মেছিল। ভাইটির জম্ম যুদ্ধের মাঝে মৃত্যুও যুদ্ধের মাঝে। স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটা তার দেখা হয় নি। ২৬ শে মার্চ এর পর থেকে বাবা ঢাকায় আটকে ছিলেন। গ্রামের সাথে সম্পূর্ন যোগাযোগ বিছ্ছিন্ন ছিল। দাদার বাড়িতে আমার মা তখন সদ্যজাত ভাইটিকে নিয়ে শংকায দিন কাটাচ্ছিলেন। না পারছেন পুষ্টিকর খাবার দিতে না পারছেন পথ্য দিতে।

তখন আমার বাবা থাকতেন পরিবাগের একটি মেসে। মেস থেকেই তিনি দেখেন সেখান দিয়েই প্রথম ট্যাংক ঢোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার বাবা ২৫ শে মার্চের পুরো রাতের নারকীয় তাণ্ডব আর গোলাগুলির চাক্ষুস স্বাক্ষী হয়ে ছিলেন। সকালে তিনি যখন রাস্তায় বের হলেন তখন কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। তিনি দেখেন শুধু লাশ আর লাশ চারপাসে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আছে।

এদিকে আমার এক চাচা সেই সময় নিখোঁজ। ক্লাস নাইনে পড়া চাচাটি সারাদিন জয় বাংলা জয় বাংলা শ্লোগান দিত। শোনা যায় তাকে পাকিস্তানি জোয়ানরা ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে। আমার আরেক তালেবুল এলম চাচা তখন ভাইয়ের হত্যার বদলা নিতে মুক্তিবাহীনিতে যোগ দেন। মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ায় তিনি উর্দু খুব ভাল বলতে পারতেন। যুদ্ধের সময় তার এই বিদ্যা খুব কাজে দিয়েছিল। তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেউ সন্দেহ করতে পারতো না। তালেবুল এলেমদের পাক বাহিনী খুব কদর করত। কতবার হানাদারদের মুখোমুখি হয়েছেন । তালেবুল এলেম শুনে খাতির করেছে তারা। এই সুযোগ উর্দুতে বাত চিত করে তাদের কাছ থেকে তথ্য বের করেছেন। তাদের বিদ্যা দিয়েই তাদের সর্বনাশের ভিত রচনা করেছেন।

তিনি ফেনীর একজন দু:সাহসী যোদ্ধা। তিনি জাফর ইমামের নেতৃত্বে বিলোনীয়া দখল মুক্ত করেন। তার বিলোনীয়া মুক্তকারী টিমটি দূর্ধষ দশ নামে খ্যাত।এই টিমের দু:সাহসি অভিযানে ১০ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ফেনীর বিলোনীয়াই সর্ব প্রথম পাক হানাদার মুক্ত হয়। তিনি সম্মুখ সমরে বহু পাকিস্তানী হানাদার আর রাজকারকে হত্যা করেছেন । চাচা মাটার চার্জেও ছিলেন ভিষন দক্ষ। তার সেই বিরত্বের কথা এখনও এলাকার লোকজনের মুখে মুখে ফেরে। তার টিমে তিনিই একমাত্র লোক যিনি নিজ এলাক নিজে মুক্ত করেন। আমার মুক্তিযোদ্ধা সেই চাচা নাম সিপাহী এনামুল হক। শহীদ হওয়া সেই চাচাটির নাম কামাল হোসেন। বিজয়ের মাসে তাদের আমি শ্রদ্ধা ভরে স্মরন করি। স্মরনকরি তাদের কৃত্তির কথা। গৌরব অনুভব করি তাদের বীর গাঁথা শুনে।

আমার নবজাতক শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ভাইটির নাম আবু তৈয়ব লিটন। যুদ্ধের ডামডোলে জম্মানোর পর হতে সে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে বেঁচে থাকার স্বাধীন বাংলাদেশ দেখার জন্য । কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ পরিবেশ এ অজপাড়াগায়ে সে পায়নি তার বেঁচে থাকার প্রযোজনীয় ঔষধ,পথ্য। আমার বাবা তখন রুটি রোজগারের তাগিদে ঢাকায়। যুদ্ধের ডামাডোলে তিনি জানতেই পারলেন না তার সদ্যজাত একমাত্র ছেলেটি আর নেই। ৮ ই ডিসেম্বর তার মৃতু দিবস ছিল। অদেখা এই বড় ভাইটকেও সালাম জানাই। ৭১ এর যুদ্ধের সেওতো একজন স্বাক্ষী নবজাতক শহিদ যোদ্ধা। ৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ আসলেই কি কেবলই যুদ্ধ ছিল? নাতো, এটাতো ছিল স্বজন হারানো এক রক্তক্ষরনের ইতিহাস। ছিল এক গৌরব গাথা।