ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমাদের স্টাফ কোয়াটার স্কুলটা এখন আর আগের মত নেই। ফ্লাই ওভারের জন্য স্কুলের সিমানা ছোট হয়ে গেছে। ফলে কোন ঠাসা হয়ে স্কুল তার সোন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। সেই মাঠ নেই । সেখানে এখন বিশ্বরোড। এই মাঠে হতো আমাদের বার্ষরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এমনি এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংক দৌড়ে অংশ নিয়েছিলাম আমি আর আমার ছোট ভাই সাঈদ। দৌড় শুরু হলো। আমি সবার মতো প্রাণ পণে দৌড়ে অংক লিখার বেঞ্চের কাছে গেলাম। আমি এমনিতেই অংক ভয় পাই। তারপর তারাহুরু করে অংক করা। এই অবস্থায় পাসে চেয়ে দেথি আমার ছোট ভাই সাঈদ অংক করে ফেলেছে। টুকলি করলাম আমি। ফলটা বসিয়ে দেই দৌড়। সাঈদ প্রথম আর আমি দ্বিতীয়। একটা কাঁচের জগ পেয়েছিলাম। যতবার আমি এই বিশ্ব রোডটা দিয়ে যাই ততবার আমাকে এ স্মৃতিগুলো তাড়া করে। এই মাঠের কথা মনে হলে মনে পড়ে আউয়াল স্যারের কথা।

আউয়াল স্যার: আমাদের সহকারী প্রধান শিক্ষক। মানে অর্ধ হেডু। ওনিও অংক ইংরেজী ভুগোল ক্লাস নিতেন। মাঝে মাঝে বাংলা ক্লাসও নিয়েছেন। তার হাতেও আমার ধোলাই ইতিহাস আছে। তবে পড়াশুনার জন্য না দুষ্টামির জন্য। তেমনি একটি ঘটনা- বর্তমান বিশ্বরোড মানে পূর্বের বিশাল মাঠটিতে অনেক রাজহাঁস চড়ে বেরাত। রাজহাঁস দেখলে আমার ভীষন ভয় করত। তারা সাপের মত শো শো করে ঠোকর মাড়তে আসত। সেদিন ক্লাসে দেখলাম আমার এক সহপাঠি (নামটা এখন মনে পড়ছে না) রাজহাসেঁর পালকদিয়ে কলম বানিয়ে লিখছে।

আমি বললাম আমাকে একটা বানিয়ে দে।
সে বলল, দোস্ত দিতে পারি তবে পালক যোগার কর।
আমি রাজহাঁস ভয় পাই।
ডরাস কেন? টিফিন টাইমে আমার সাথে মাঠে যাবি। দেখবি কেমনে পালক ছিড়ি।

টিফিন আওয়ারে আমরা দু কুতুব গেলাম পালক সংগ্রহ করতে। রাজহাঁসগুলো যেনো বুঝতে পেড়েছে আমাদের পরিকল্পনা। আজ যেনো খুব বেশী রেগে আছে। খুব বেশী শো শো করছে। এই ঠোকর দেয়তো সেই ঠৌকর দেয়। আমার দোস্তটি একটা ঠোকর খেয়ে কোনমতে পালক সংগ্রহ করলো। আমি ইটা নিয়ে জীবগুলোকে তারা করতে লাগলাম। আউয়াল স্যার যাচ্ছিলেন পাস দিয়ে। দুর থেকে রাজহাসেঁর সাথে যুদ্ধে দৃশ্য তিনি অবলোকন করলেন। আমাদের কিছু বললেন না। টিফিন আওয়ার শেষে আউয়াল স্যারের অংক ক্লাস ছিল। ক্লাসে ঢুকেই স্যার কোন ভুমিকায় গেলেন না সরাসরি আমাদের দুজন কে ডাকদিলেন। তোরা দুইটা এদিকে আস? স্যারের এমন আকষ্মিক আহবানে আমরা হতচকিত হয়ে গেলাম। আমাদের ডাকে ক্যান?

হুংকার ছাড়লেন স্যার, কিরে মাঠে তোরা দুইটা কি করছিলি ?
আমি বললাম না …মানে…হই..লো… রাজহাসেঁর পালক নি..তে
চুপ! একটাও কথা বলবিনা! স্কুলেকি রাজহাসেঁর পালক ছিড়ার জন্য আসছস না পড়তে? রাজহাঁসরে ঢিল মারছ। ঠোকর দিলে। সবজায়গায় বাদরামী করস!
এরপর আর কি….. উত্তম মধ্যম।

আউয়াল স্যারের একটা মেয়ে আমাদের সাথে পড়তো। কি যেনো নাম…. স্মৃতি না কি যেনো। আমাদের পাড়তেই থাকতো। শুনেছিলাম স্যার নাকি দ্বিতীয় একটা বিয়ে করেছেন। স্যার কি এখনো জীবিত আছেন, কে জানে? ওনার কথা মনে হলে সামনে ভাসে হুজুর স্যারের হুন্ডা আরে পেছেনে তাকে জড়িযে আউয়াল স্যার।

khilgonstaff

আব্দুর রহীম স্যার: ওনি আমাদের হুজুর স্যার। ফর্সা গায়ের রং। দাড়ি কি কাল ছিল? না মেহদী দেয়া ঠিক মনে পড়ছে না। তবে তার পান খাওয়া মুখটা খুব মনে পরে। তিনি আমাদের ধর্ম আর ভুগোল পাড়াতেন। ওনার হাতেও সাইজ হওয়ার ঘটানা আছে। পরিক্ষার খাতা দিচ্ছেন স্যার। ফেল করলেই রাম ধোলাই। ধর্ম একটা সহজ সাবজেক্ট। এটা আবার পড়তে হয় নাকি। এই ভেবে ধর্ম তেমন পড়িনাই। পরিক্ষার হলে যেয়ে দেখি কোন প্রশ্নের উত্তর ঠিক ভাবে মনে পড়ছেনা। কি করি কি করি। টুকলি করে অংক দৌড় দিয়েছি ঠিক আছে কিন্তু কখনো পরিক্ষায় টুকলি করিনি। মনে যা আসছে তাই লিখেছি। এবারো তাই বানিয়ে বানিয়ে লিখতে শুরু করলাম। এর একটা ছোট্ট নমুনা- প্রশ্ন জ্বীন নুরাইন অর্থ কী? আমার উত্তর- জ্বীনেরা নুরর তৈরী। আসলে এর অর্থ হবে দুই জ্যোতির অধিকারী। মহানবী সা. এর দু মেয়েকে ওনি বিয়ে করার কারনে হযরত ওসামন রা. কে এ উপাধী দেয়া হয়। আমার উত্তর গুলো বেশীর ভাগই ছিল এই টাইপের। তাই ফলাফল যা হবার তাই হল। তবে ফেল করিনি! স্যার টেনেটুনে পাস করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে ধোলাই মিস হয় নি। আমার খাতা দেবার সময় স্যার বললনে তালেব এদিকে আয়। ক্লাসেতো খুব ফটর ফটর করস খাতায় কি লিখছস এইসব। জ্বিননুরাইন – জ্বিনেরা নুরের তৈরী না বেয়াকুব কোথাকার? তোরে বুজাচ্ছি জ্বিনেরা কিসের তৈরী কাছে আয়।

৩.
আমাদের স্কুল সহশিক্ষা স্কুল। ছেলে মেয়ে এখানে একসাথে পড়তাম আমরা। আমাদের বাংলা পড়াতো সেতারা আপা। তার একটা মেয়ে ছিল নাম সুমা। আমাদের আরেক দোস্ত রানা ওরে মনে হয় পছন্দ করতো। মাঝে মাঝে তার কন্ঠে শুনা যেত সিনেমার সেই জনপ্রীয় গানের কলি- শোন সুমা সুমা -একটু দাড়া- কথা শুনে যা…….।

সেতারা আপা: ফর্সা খাটো আর একটু মোটা ওনি। আমাদের স্কুলের পাসেই ষ্ট্যাফ কোয়াটারে তিনি থাকতেন। এ আপাটি ছিল খুবই সাধারন টাইপের। তার তেমন কোন বিশেষত্ব এখন মনে পড়ছেনা। খুব বেশী রাগী না। তবে ওনার হাতেও বেতের বাড়ী খেয়েছি। পড়া না পারলে হাতে বেত মারতেন। তার সাবজেক্টে কেউ ফেল করেনা। বেশী বেশী নম্বার দিতেন। টিচার্সরুমে বসে বসে অন্য আপাদের সাথে খোশ গল্প করতে তাকে অনেকবার দেখেছি। অন্য আপাদের মধ্যে জেবুন্নেসা আপার কথা খুব মনে পড়ছে।

জেবুন্নেসা আপা: একুট বয়স্ক টাইপ আপা। শুদ্ধ উচ্চারনে টেনে টেনে কথা বলেন। আমাদের পাড়াতেই দুতলার এক বাসায় থাকতেনে। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ওনার ক্লাসে কেউ কখনো উত্তম-মাধ্যম খায় নি। ওনি ঠান্ডা মেজাজের মহিলা। ঠান্ডা ভাবে বকাবকি করতেন। সবাই তার ক্লাসটি স্বস্থির সাথে করতো। ওনি আমাদের বাংলা শিক্ষিকা ছিলেন। ওনার স্নেহের কারনে তার সাথে আমার ভাল জমত মানে ভালই তর্ক করতাম। এই জমাজমির কারনেই বোধ হয় এই ক্লাসের একমাত্র ছেলে আমি, যে কিনা ওনার হাতেও ধোলাই খেয়েছি।

ঘটানাটা এমন- আপা পড়াচ্ছেন আমাদের বাগধারা। উভয় সংকট মানে কি তোমরা জান? জানি আপা স্বর্বস্বরে আমরা বলালম। এর অর্থ দুদিকে বিপদ। হ্যাঁ! ঠিকই আছে! তবে এ অবস্থা হল এমন বিপদ যখন আসে তখন চর্তুদিক থেকে আসে। তখন মানুষ খবু অসহায় হয়ে পরে। কিংকর্তব্যবিমুর হয়ে যায়। আমি বললাম কথাটা বুঝলাম না আপা। আপা বললনে, কি বুঝনি বলতো তালেব?

মানে আপা বিপদ চর্তুদিক থেকে আসলে অসহায় হবে কেন? বুদ্ধি দিয়া বাঁচব! মেকগাইভারের মত। উল্লেখ্য তখন টিভিতে ম্যাকগাইভার সিরিয়াল চলছিল। আপার সাথে এই ঘটনার পর থেকে ক্লাসের একটি মেয়ে আমাকে ম্যাকগাইভার ডাকা শুরু করলো। কি মছিবত? কোথায় কলতলা আর কোথায় কলকাতা। যাক ঘটনায় ফিরে আসি। আপা আমার কথা শুনে রাগলেন না মোটেই। খুবই ঠান্ডা মেজাজের। ঠান্ডা ভাবেই বকা দিয়ে বললেন, অর্বাচিনের মত কথা বলবেনা। ধর তুমি রাস্তাদিয়ে যাচ্ছ তোমার সামনে একটি ট্রাক আসল কোথায যাবে তুমি?
কেন আপা ডাইনে যাব নয় বামে। তোমার ডাইনে একটি মাইক্রো আর বামে একটি রিক্সা কোথায় যাবে তুমি? কেন আপা রিক্সার দিকে যাইতে হইবো। মাইক্রো আর ট্রাকের নিচে পড়লে জীবন শেষে কিন্তু রিক্সার নিচে পইরা কেউ মরে না। আমার উত্তর শুনে আপা ঠাস করে চড় মারলেন গালে। ঠান্ডা মেজাজেই মাড়লেন কিন্তু মাড়টা সলিট ছিল। তার সে মার আমার চিরদিন সুখ র্স্মতি হয়ে আছে থাকবে। তাকে খুব মিস করি। কোথায় আমার সেই আপাটি। বেঁচে আছেন তো?

৪.
আমার স্কুল জীবনের বেশির ভাগ স্মৃতি জুড়ে আছে আমার সহপাঠি দোস্তরা। তাদের সাথে ভুংভাং করে স্কুলে সময়টা ভালই কাটতো। স্যারদের কড়া শাসন মারপিট কোথায় যেনো হাওয়া হয়ে যেতো। তাদের কথা খুব মনে পড়ে। কে কোথায় আছে? কি করছে? কেমন আছে? বিয়েথা করছে কিনা? বাচ্চা কাচ্চা কয়জন? খুব জানতে ইচ্ছে করে। এফ.বির কারনে কারো কারো সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছি অবশ্য।এদের একজন মাহবুব হোসেন সোহাগ।

সোহাগ: ওর নামের শেষে হোসেন না রহমান কোনটা যে ঠিক বলতে পারছিনা। তবে ইদানিং ফেসবুকে তার নাম দেখলাম সোহাগ হোসেন। আছে স্বপ্নের দেশ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। বৌ-বাচ্চার ছবি সহ ফেসবুকে পোষ্ট মেরে যাচ্ছে সমানে। আমার বুতা নামটা ওরই দেয়া। কি কারনে যে আমাকে ও এই নামটা দিল। তা ওই বলতে পারবে। হয়তো আমার বুদ্ধি বিবেচনা তার কাছে ভোতা মনে হয়েছে। এই ভোতাটাই আমার নামের প্রথম অংশের শেষ অক্ষর বু আর দ্বিতীয় অংশের প্রথম অক্ষর তা দিয়ে হয়তো প্রকাশ করা হয়েছে। আর এই নামেই ক্লাসে আমি পরিচিত পেয়ে গেলাম। ৎ

জিও সোহাগ জিও ।

যুগ যুগ জিও ।

জানিস ওগো দোস্ত আমার

কতখানি তুই প্রীয়।

সোহাগ ছাড়াও আরেক জন আছে যে আমার এই নামটি আমার বাসায় মানে পরিবারের কাছে চাউর করেছে। আর সে হল – শাহজাহান চৌধুরী।

শাহজাহান চৌধুরী রিপন: রিপন ভাল ছাত্র হিসাবে স্কুলে খুব পরিচিত। রোল-১ আবার ক্লাস ক্যাপটেন। একারনে দেমাকই ছিল দেখার মতো। সবসময় থাকতে একটা ভাবের মধ্যে। ভাল ছাত্রদেরতো একটু ভাব থাকবেই এটা কোন দোষের না। ভাব নিলেও আমার সাথে ভাব নিয়া কোন দোস্তই সুবিধা করতে পারে নাই। কারন আমি যে বুতা। জায়গা মতো দিতাম গুতা। আমাদের পাড়াতেই থাকে সে। নোয়াখালী বাড়ী । আমাদের বাড়ী ফেনী। সে হিসাবে আমাদের দেশী বলা চলে। আর এ কারনে আমাদের পরিবারের সাথে তার পরিবারের একটা সখ্যাতা ছিল। আমার বড় ভাই আবু নাসের আমার সাথেই পড়ে ফলে সেও আমার দোস্তদের দোস্ত। শাহজাহান একদিন আমাদের বাসায় গেল আমার খোজেঁ। তখন বাসায় আমি ছিলাম না।বড় ভাই ছিল।
নাসের বুতা কই?
ওতো বাসায় নাই।
পিছন থেকে বড় আপা বলে উঠে বুতাটা কে?
বড় ভাইয়া বলল ও স্বপনরে চায়।

ওর নাম বুতা বুঝি। এই বলে আপার নাকি সেকি হাসি। ভাগ্যভাল আমি তখন ছিলাম না। আমার বাসায় ব্যাপরটা সবাই স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে তাই রক্ষা। তা না হলে উঠতে বসতে এই নামে ভ্যংচাতো সবাই। রিপন মানে শাহজাহান এর একটা রোমান্টীক গল্প আছে। গল্পটা বলাটা কি ঠিক হবে? না থাক বলব না। বেচারার বিবাহীত জীবনে আমি শনি হতে চাই না। তবে গল্পের নাইকার নামটা বলা য়ায়। তার নাম হল শিপ্রা।

আজ কোথায়? সে ললনা?
সর্বার্ঙ্গে যার ছলনা।
একটু তোমায় গুতা দিলাম
মাইন্ড কিন্তু করনা।

শ্রিপ্রা (দ্যা লাভার গার্ল): হ্যাংলা টিং টিং এ একটি মেয়ে। উজ্জল শ্যমলা। ছটরফটর স্বভাব। যার সাথেই মিশে সেই ভাবে লটর-পটর টা বুঝি তারই সাথে। শিপ্রা কিন্তু কখনো দেখিনি কাউকে সেভাবে রোমান্টিক কিছু বলেছে বা করেছে। তবে অন্য দোস্তরা কিছু দেখলেও দেখতে পারে। আসলে ও হলো আমাদের স্কুলের লাভার গার্ল সবাই ওর সাথে জড়িয়ে কাহিনী ফাঁদতে ভালবাসত। আর ও মনে হয় ছেলেগুলোরে নাচিয়ে মজা পেত। শাহাজাহান কি নেচে ছিল না নাচিয়ে ছিল??????

আমার ক্লাসের অন্য মেয়ারা তেমন রোমান্টিক না হলেও হ্যাপি নামে একটা মেয়ের কথা মনে পরে যে কিনা জসিম নামে একটা ছেলেকে প্রায় কাবু করে ফেলেছিল। আরেকটিতো কামাল নামের একজন কে দেওয়ানা মাস্তানা করে ছেড়েছে। এর নায়িকার নাম তানজিলা। কবি রতন নামে একজন প্রেম নিবেদন করেছিল সাকিনা সরকারকে।

সাকিনা সরকার: নামটা ঠিক আছে তো। শেষে সরকার হবে তো নাকি ইদানিং ইমরান এইচ সরকার শুনতে শুনতে সরকার রোগে ধরল। এই মেয়াটা খুব মেধাবী। পারিবারিক ভাবে স্বচ্ছল না হলেও এই মেয়াটার বাবা তার মেয়ের মেধার মূল্যায়ন করেছেন। মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলেছেন। সাকিনার সাথে আমার শেষ দেখা হয় আমার অফিসে। আমি যে এন.জি.ও কাজ করতাম তার গ্রাহক ছিল সে। সেই ২০০৬ কি ২০০৭ সালেরদিকে টাকা তোলায় সহযোগীতার জন্য গিয়েছিল আমার কাছে। আমি সহযোগীতা করেছিলাম। পরে টাকা তুলতে পেরেছিল কিনা জানিনা। এ এক অসাধরন মেয়ে সাধারন বেসে। শাহজাহান এর পরে এ মেয়েটির রোল। কিন্তু কোন অহংকার নেই। একদন্ড যেনো চুপচাপ থাকতে পারেনা। সারাক্ষন কারো না কারো সাথে ভটর ভটর করেই যাচ্ছে। এই সে মেয়ে যে আমাকে ম্যাক (ম্যাকগাইভার) বলে ডাকতো। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম ভাল ছাত্ররা থাকে একটু ভারিক্কি চলনে আর এই মেয়েতো দেখি তুফান মেইল। অবশ্য চুপচাপ ভারিক্কি টাইপ মেধাবী মেয়ে যে নাই তা নয়। আছে তেমন একজন হল সেলিনা। আমার অতি প্রীয় একজন মানুস সেলিম ভাই এর বোন সে। ওনিও কিন্তু আমাদের এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন।

সেলিনা:
সেলিনা সেলিনা সেলিনা
কথা তেমন বলেনা
কৃষ্ণকলি উপমা
মাইন্ড কিন্তু কর না।
থাকে নাকি বিলাতে
লন্ডনের কোন জাগাতে।
এফবিতে খুজেঁ পেলাম
ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম।

এ মেয়েটা এতোটা চুপচাপ যে তার সাথে কথা তেমন হতো না। তবে নিজ থেকে মাঝে মাঝে কথা বলত। আমি সব সময় ছাত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। সে ভাল হোক কিংবা মেদা টাইপ। যদিও গুরুজনরা বলেন ভালর সাথে থাকলে ভাল হওয়া যাবে মানে সৎ সঙ্গে স্বর্গে বাস। আমি এহেন নারী স্বর্গে অভ্যস্থ নই। সারাক্ষন হিনমন্যতায় ভুগি। ওরা না জানি কি মনে করে। তাই সেলিনা কেন কোন ছাত্রীরই আসে পাসে সেচ্ছায় তেমন একটা ঘেসিনি। সে যতই ভাল ছাত্রী হোক না কেন! কিন্তু ছাত্রীরা আমাকে খুব পছন্দ করতো। আর এ পছন্দ ছোট ভাই হিসেবে। সেটা বুঝলাম অনেক পরে।

আমি সাইজের দিক থেকে আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে ছোট ছাত্র। আমি যখন এস.এস.সি দেই তখন অনেকে তা বিশ্বাসই করতে চাইতো না। সবাই ভাবতো আমি খুব কমবয়সে পরিক্ষা দিচ্ছি।

taleb

আমার হাইট-সাইজ আমার ছোট ভাই থেকেও কম আর তাই প্রথম প্রথম আমাদের পাড়ার লোকেরা অবদি আমায় পরিবারের ছোট ছেলে মনে করেছে। আমার ছোট খাট গঠন গঠনের কারনে মেয়েরা আমাকে সব সময় ছোট ভাইয়ের মত ট্রিট করেছে। অনেকে মাঝে মাঝে বাড়ী থেকে কিছু আনলে অন্য কোন ছেলেকে না দিলেও আমাকে দিত। আমি তখন ব্যাপার গুলো বুঝিনি। এখন বুঝতে পারি। আমার দোস্তরাও আমার কাছে তাদের প্রেমভালবাসর বিষয় নিয়ে তেমন কোন কথা বলত না। তারা ভাবতো ওতো পোলপান। নাদন একটা। প্রেম টেম বুঝার বয়স হয় নাই। কেন বাবা তোরা যে ক্লাসে পড়িস আমিও সে ক্লাসের ছাত্র তোদের মত আমার আবেগ অনুভতি একরকমই ছিল। তোরা বুঝতে পারিসনি এটাতোদের ব্যর্থতা। কখনো কখনো আমার মনটা উদাস হতো। ইচ্ছে হতো কারো সাথে মানে কোন মেয়ের সাথে, যদি ইয়ে টিয়ে হতো।

আমি দুষ্টামী বাদরামী যাই করিনা কেন এ বিষয়ে খুব ভিতু ছিলাম। তাই এ অনুভুতি গুলো চেপে রেখেছিলাম। বুঝতাম না কথাটি ঠিক না। তবে এটা ঠিক আমার অনুভুতি যাই হোক নাই হোক মেয়েরা কেউ আমাকে নিয়ে উল্টা পাল্টা কিছু কখনো ভাবেনি এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। তাদের মুখে কখনো টিচ করে হলেও আমাকে জড়িয়ে প্রেম ভাল বাসার কথা শুনা যায়নি। আসল কথা তারা আমাকে খুব নিরাপদ ভাবতো। আমার সাথে খুব ইজি ভাবে মিশত তারা। আজ মাঝে মাঝে পুরনো সব কাষুন্দি মন্থন করতে যেয়ে ক্লাসমেটদের কাছে আমর মূল্যায়ন কতটুক ছিল তা বুঝার চেষ্টা করি।

আসলে ক্লাস টেনে যে বয়সে ছেলেদের দাড়ি গোঁফ উঠে আমার তখন উঠেনি কিছুই। শাহজাহান, সোহাগ সুজা এই তিন কুতুব একদিন তাই ঠিক করল আমাকে সেভ করিয়ে দিবে। এতে নাকি দাড়ি গোঁফ গজাবে। একদিন জোড় করে ক্লাসরুমে তিনজন চেপে ধরল আমাকে। তারপর………? না কিছুই করতে পারেনি। কারন তখন হুজুর স্যার এসে ক্লাসে ঢুকলেন ধর্ম পড়াতে। তবে তারা অন্য আরেকজন কে ঠিকই সেভ করিয়ে ছেরেছিল আর সে হল হাসান আলী খোকন। কত ঘটনা স্কুলের দোস্তদের নিয়ে । মনে পড়ে খুব মনে পড়ে।

৫.
আমি সবসময় লেবেন্ডিস টাইপে চলেছি। অতো স্মার্টনেস নাই আমার মধ্যে। আমার এমনতর আচরন পছন্দ করতনা একে দোস্ত। তার নাম আজিম।

আজিম: ওর আসল নামটা মনে করতে পারছিনা। তবে ওর স্বভাব আর আচরন আমার মুখস্ত। একটু শুচিবাই টাইপের। সব সময় পরিষ্কার জামা কাপর পরে ফিটফাট থাকতো। উজ্জল শ্যাম বর্ণ। লম্বা খারাপ না। চেহার সুরতে হেন্ডসাম বলা যায়। তবে মুখে একটু তোতলা ভাব আছে। এই কথায় দোস্ত আবার দু:খ পাইবো নাতো। ধুৎ দোস্তরে কমুনাতে কারে কমু। থাকতো খিলগাঁও বাগিচা। থাকতো বলছি কেনো এখন আছে। কারন ওটা ওদের নিজে…র বাড়ী। কেন যানি ও সুযোগ পেলেই আমাকে উপদেশ দিত। এই ভবে চলবি। এইটা করছ কেন? ওই টা কর। মার্ক কমপাইছস কেন? ঠিক কইরা পর। এতো কথা বলিসে কেন? কম কথা বল। আরো কত বলব! আমার প্রতি ভালই কেয়ারিং ছিল। অবশ্য তখন লাগতো বিরক্ত । মনে মনে বলতাম , শালা তুই তোর মত থাকনা আমি পিছনে ঘেনর ঘেনর পেনর পেনর বন্ধ কর। সামনা সামনি কিছুই বলতাম না। কারন আমি আমার দোস্তটারে খুব ভালবাসি। আফসোস! সে এটা আজো জানেনা।

আজো মনে পড়ে রানা, রাশেদ, রায়হান, পটুয়া শহীদুল, ফরহাদ, পিয়াল, সুজা, সালাহউদ্দিন, মিন্টু আর কত নাম। কোথায় আমার দোস্তার? সবাই নিশ্চয় স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠীত হয়েছে। ভাল আছে। ভাল থাক দোস্তারা। আমার জন্য দোয়া কর। হে আমার সহপাঠি দোস্তরা! আমার প্রিয় খিলগাঁও গভ: ষ্ট্যাফ কো: স্কুল এর কথা যতদিন আমার স্মৃতিতে বটবৃক্ষ হয়ে থাকবে তোমরা থাকবে তার ছায়া হয়ে। যখন কষ্টের উত্তাপে ক্লান্ত হবে আখিঁ, গ্রাস করবে অবসাদ। তথন এই ছায়ায় বসে প্রশান্তি লাভ করব।

পাদটিকা: আজ খুব মনে পরে স্কুলের দফতরী মন্টুর বাপ কে। কালো মতো বুড়ো লোকটার কথা। স্কুলে পাসেই ঘর করে থাকতো। তাকে আমরা মন্টুর বাপ হিসেবই চিনি। আসল নাম জানিনা। তবে তাকে চাচা ডাকতাম মনে হয়। তার ঘন্টা বাজানোর সাথে সাথে ক্লাস শুরু আর শেষ হতো। সে কি বেঁচে আছে? নাকি তার শেষ জীবনের ঘন্টা বেজে গেছে। আমি প্রাই তার ঘন্টার আওয়াজ শুনি………………ঠন ঠন ঠন….। এই ভাবে ঘন্টার আওয়াজ শুনতে শুনতে হয়তো আমার জীবনের শেষ ঘন্টা বেজে যাবে। নিথর হয়ে যাব। আমার দোস্তরাকি তখন জানতে পারবে আমার চির প্রস্থানের খবরটা। আমি তুমি সে সবাই চলে যাব একদিন। আমাদের স্কুলে নতুন নতুন ছাত্ররা আসবে যাবে। নতুন নতুন কাহিনি লিখা হবে। এইতো জীবন।…………………………………………………এইতো নিয়তি।

হে সহপাঠি বন্ধুবর
আমায় মনে রেখ
যদি দেখ কোন ছেলে গুরুর শাষনে তটস্থ
তালেবকে তোমরা তাতেই খুজে দেখ।
যদি দেখ তর্ক বাগিস কাউকে
জিলাপির পেচে পেচে যায় পেচ কষে
ভেবে নিও এতো আমার সহচর
আমারই ডুপ্লিকেট কেউ ওতেই আমি, আছি মিসে।
ভুলনা আমায় দোস্তরা
ভুলনা একদম
তোমাদের মাঝে ছিল যে, একজন
বুতা নামে এ অধম।

বি.দ্র: আমার এ স্মৃতি চারণে অনেক কিছু ঝাপসা মনে পরে। তাই কিছু নাটকিয়তা করতে হয়েছে। মাফ করে দিও তোমরা। আমি জানি তোমরা আমাকে মাফ করবে। তোমরা যে আমাকে খুব ভালবাস। আমাদের কয়েকজন সিনয়র ভাই ছিল যাদের কথা মনে পরে তাদের কথা বলতে ভুলে গেছি। এদের মধ্যে সরোয়ার ভাই (আমাদের স্কুলের প্রথম ষ্টার মার্ক পাওয়া ছাত্র) সেলিম ভাই, শাহিন ভাই ওদের নাম মনে আছে।

ভাইয়ারা আপনাদের এছোট ভাই বহু বছর পর আপনাদের স্মরন করছে। আমার জন্য দোয়া করবেন আপনারা।

পোস্টটি ফেসবুকে আছে এবার ব্লগেও দিলাম। অবশ্য এর আগে এই ব্লগে এই স্মৃতিচারণের আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল। এবার পুরোটা দিলাম দেখি পুরনো সাথিদের পাই কিনা খুঁজে?