ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

শিশুদের হাঁপানি বা এ্যাজমার আধুনিক চিকিৎসা, সবার জানা উচিত।

ছোট বড় সকলেরই হাঁপানি হতে পারে। তবে বাচ্চাদের হাঁপানিতে বেশী ভুগতে দেখা যায়। মোট হাঁপানি রোগীর অর্ধেকের বয়স দশ বছরের মধ্যে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদেরই শিশু বয়সে এই রোগ বেশী হয়।

সারা বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি লোক শ্বাসনালীর সচরাচর সমস্যা-এ্যাজমায় আক্রান্ত হয়। তাদের ৯০% এরও বেশী অত্যাধুনিক চিকিৎসা পায় না এবং অনেক রোগী মারা যায়। যদিও এ মৃত্যুর ৮০% প্রতিরোধ করা সম্ভব যদি আধুনিক চিকিৎসা ও ডাক্তারের তদারকির মাধ্যমে এ্যাজমা নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়া যায়।

বাচ্চাদের কেন এত বেশী হাঁপানী রোগ অনেক কারণে হয়ে থাকে। একই সঙ্গে একাধিক কারণকে এ অসুখের জন্য দায়ি মনে করা হয়। বাচ্চাদের হাঁপানিতে বেশী আক্রান্ত হবার কারণ হিসাবে মনে করা হয় শ্বাসনালীর হাইপার রেসপোনসিভনেসকে।

আসলে বড়দের তুলনায় বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা কম। তাই তাদের বার বার রেসপিরেটরি ট্রাস্ট এর সংক্রামণজনিত কারণে সর্দিকাশি হওয়ার প্রবণতা বেশী। কিছু কিছু শিশুর রেসপিরেটরী ট্রাক্ট এর সংক্রমণের ফলে শ্বাসনালীগুলোতে হাইপার ইরিটেবিনিটি দেখা দেয় অর্থাৎ অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

এই ক্রনিক ইনফ্লামেশনের ফলে বাইরে থেকে কোনও কিছু (ঠাণ্ডা, মাইট, ধুলো, ফুলের রেণু ইত্যাদি) শ্বাসনালিতে ঢুকলেই শুরু হয় সংকোচন এর ফলস্বরূপ হাঁপানি। তবে ছোট বাচ্চাদের হাঁপানির লক্ষণ নিয়ে আসলে চিকিৎসককে ভীষণ সজাগ থাকতে হয়। কারণ অনেক সময় লেবুর দানা। বোতাম, পুঁতি ইত্যাদি ফরেন বডি বাবা-মায়ের অজান্তে বাচ্চাদের নাক-মুখ দিয়ে ঢুকে শ্বাসনালীতে আটকে থাকতে পারে। এর ফলে সর্দি, কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদিতে বাচ্চাটি ভুগতে পারে।

জেনেটিক কারণে কারো কারো বেশী হয়ে থাকে। ঘর-বাড়ীর ধুলো ময়লায় মাইট পোকা, ফুলের বা ঘাসের পরাগ রেণু, পাখির পালক, জীব জন্তুর পশম, ছত্রাক, কিছু কিছু খাবার, কিছু কিছু ওষুধ, নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ ইত্যাদি থেকে এলার্জিজনিত এ্যাজমা হয়ে থাকে।

বংশগতভাবে এ্যাজমার ঝুঁকি কতটা?

মাতৃকুলে হাঁপানি থাকলে তিনগুণ বেশী রিস্ক আর পিতৃকুলে হাঁপানি থাকলে অনেকটা কম রিস্ক। মায়ের হাঁপানি থাকলে মোটামোটিভাবে বলা যায় তিন সন্তানের মধ্যে একটির হাঁপানি, একটির আপাত সুস্বাস্থ্য এবং একটির অস্বাভাবিক শ্বাসনালীর সংকোচন থাকতে পারে। শেষেরটির হাঁপানি না হয়ে সর্দি-কাশির প্রবণতা থাকতে পারে।

কিভাবে এই রোগ চিহ্নিত করা যায়?

অনেক বাচ্চাদের প্রায়ই ঠাণ্ডা লাগে অথ্যাৎ নাক দিয়ে পানি পড়ে কাশি হয় বিশেষ করে রাত্রিতে। যদিও এই লক্ষণগুলোর অধিকাংশ মায়েরা নিউমোনিয়া বলে ধরে নেয় এর কারণ অধিকাংশ সময় চিকিৎসকরা নিউমোনিয়া বলেই চালিয়ে যান। আসলে কিন্তু এ লক্ষণগুলো ছোট বাচ্চাদের এ্যাজমার প্রাথমিক লক্ষণ। পরে অবশ্য বড়দের মতো অন্য লক্ষণগুলোও দেখা দেয় যেমন

১. বুকের ভিতর বাঁশির মত সাঁই সাঁই আওয়াজ

২. শ্বাস নিতে ও শ্বাস ছাড়তে কষ্ট

৩. দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে না পারা

৪. ঘন ঘন কাশি

৫. বুকে আটসাট বা দম বন্ধ ভাব

৬. রাত ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা

সমন্বিতভাবে এ্যাজমা চিকিৎসা পদ্ধতি

এ্যাজমা চিকিৎসার তিনটি প্রধান উপায়ঃ

১. এলাজেন পরিহারঃ হাঁপানীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পন্থা হল যে জিনিসে এলার্জি তা যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা। তাই এ্যাজমা রোগীদের প্রথমেই এলার্জি টেস্ট করে এলারজেন্ট টি কি? জানা দরকার তার কিসে কিসে এলার্জি হয়।

২. ওষুধপত্রঃ নানা ধরনের হাঁপানীর ওষুধ আছে। প্রয়োজন মত ঔষধ ব্যবহার করে রোগী সুস্থ থাকতে পারে। সাধারণতঃ দুই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

ক) শ্বাসনালীর সংকোচন প্রসারিত করতে ওষুধ ব্যবহার করা-ব্রঙ্কোডাইলেটর যেমন, সালবিউটামল, থিউফাইলিন, ব্যামবুটারল। এ ওষুধগুলো টেবলেট, সিরাজ, ইনজেকশন, ইনহেলার হিসাবে পাওয়া যায়। তবে ছোট বাচ্চাদেও স্পসারের মাধ্যমে ইনহেলার হিসাবে দেওয়াই ভাল কারণ এতে মুখে খাওয়ার চেয়ে অনেক কম ওষুধ লাগে তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অনেক কম এবং সরাসরি যাওয়াতে অনেক কম সময়ে রোগী সুস্থ বোধ করে।
যদিও অনেকেই এই ইনহেলার পদ্ধতি পছন্দ করেন না, তাদের ধারণা ইনহেলার বড় মানুষদের জন্য এবং একবার ইনহেলার দেয়া শুরু করলে সারা জীবন নিতে হবে। এই ধারণা কিন্তু একেবারেই ভুল। অনেক বাচ্চা আছে যারা রোগের প্রারম্ভিক অবস্থায় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার নিয়ে সুস্থ আছেন এবং পরবর্তীতে আর ইনহেলার লাগে না। কিন্তু স্পেসারের মাধ্যমে যে কোন বয়সের বাচ্চাদের ইনহেলার দেওয়া যায়।

খ) প্রদাহ নিরাময়ের ঔষধ যেমন কর্টিকোস্টেরয়েড (বেকলোমেথাসন, ট্রাইএ্যামসিনোলোন, ফ্লোটিকাসন) এগুলো ইনহেলার, রোটাহেলার, একুহেলার ইত্যাদিভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বর্তমানে লিউকোট্রাইন নিয়ন্ত্রক মন্টিলুকাস্ট (মোনাস, রিভার্সেয়ার) জাকিরলুকাস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।

৩. এলার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপীঃ এলার্জি দ্রব্যাদি থেকে এড়িয়ে চলা ও ঔষধের পাশাপাশি ভ্যাকসিনও এ্যাজমা রোগীদের সুস্থ থাকার অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ব্যবহারে কর্টিকোস্টেরয়েডের ব্যবহার অনেক কমে যায়। ফলে কর্টিকোস্টেরয়েডের বহুল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যথা বার বার ইনফেকশান হওয়া, বৃদ্ধি না হওয়া, মুখ ও পেটে টসটসে লাল হওয়া থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা বলে অভিহিত করেন। এটাই এ্যাজমা রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থ থাকার একমাত্র চিকিৎসা পদ্ধতি। বর্তমানে বাংলাদেশেও এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আগে ধারণা ছিল এ্যাজমা একবার হলে আর সারে না। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রথমদিকে ধরা পরলে এলার্জিজনিত এ্যাজমা রোগ একেবারে সারিয়ে তোলা সম্ভব। অবহেলা করলে এবং রোগ অনেকদিন ধরে চলতে থাকলে নিরাময় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ জন্য রোগীদের জানা দরকার যে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণ করলে এ রোগ থেকে পরবর্তীতে হাঁপানি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, উন্নত দেশের সকল প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা বর্তমানে বাংলাদেশেই রয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, মহাখালি।
বা যে কোন এজমা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।