ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আজকের এই মহান দিনে রক্ত সাগর পেরিয়ে আমরা পেয়েছিলাম স্বপ্নময় স্বাধীনতা। কত ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছিলাম এই মহান স্বাধীনতা তা না দেখলেও অনুভব করেছিলাম দাদীর বর্ণনার উষ্ণতায়। দাদী আজ নেই, তবুও স্পন্দন রয়ে গেছে তার হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে ওঠা কন্ঠের ভয়ার্ত জড়তার। দাদী যেন অচেতনভাবে বার বার ফিরে যাচ্ছিল সেই বিভীসিকাময় অতীতে আর গল্পের আবেশে বুঁদ হয়ে থাকা আমার হৃদস্পন্দন থেমে যাচ্ছিল ইথারে। তারা ভরা খোলা আকাশের নীচে জ্যোৎস্নার আলোয় আমার বিভীষিকা হয়তো কেটেছিল, কিন্তু মুছে যায় নি হতভাগ্য মানুষগুলোর জন্য সমবেদনার তিরতিরে অনুভূতি।

দাদী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিল, কাঠ ব্যবসায়ী ছোট দাদার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সহযোগীতার কথা। তার বাস ছিল সুদুর সিকিমের পাহাড়ে। সিকিমের পাহাড়ী বনাঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঠের বাণিজ্য ছিল তার পেশা। বড় স্বাধীনচেতা লোক ছিল। যুদ্ধের দামামা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুকি নিয়ে সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেটে বাংলাদেশে এসেছিল সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে। কোন স্বার্থ নয়, শুধু স্বাধীনতার প্রতি ভালবাসা। নিজের মাতৃভূমি পরাধীন ছিল বলেই হয়তো এমন নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছিল স্বাধীনতাকে। খুব ইচ্ছে হয়েছিল সাহসী সেই যোদ্ধাকে দেখার। কিন্তু সংকোচ করে তখন কিছু বলি নি দাদীকে। দাদীর বর্ণনায় খুটে পাওয়া তথ্যগুলো সাজিয়ে কল্পনায় এঁকেছিলাম বলিষ্ঠ গড়নের মানুষটাকে। কিছুদিন এভাবেই চলল। অবশেষে এক রাতে সংকোচ কাটিয়ে বললাম দাদীকে আমার ইচ্ছের কথা। জবাব শুনে সময় যেন থমকে দাড়িয়েছিল। নিজ মাতৃভূমির জন্য মুক্তিযুদ্ধ করার অপরাধে ভারতীয় বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিনি। হানাদার ভারতীয় বাহিনী তার লাশটি দাফনও করতে দেয় নি, পাহাড়ী গাছে ঝুলিয়ে বন্য জানোয়ারদের খাবারে পরিণত করেছিল তার দেহটাকে। যুগে যুগে দেশে দেশে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রকৃতি এমনই ভয়ংকর। দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা বীভৎস পরিণতি দেখেও পিছ পা হয় নি। মনে পড়ে দাদীর উপদেশের কথা, ‘তোমার দেশের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করতে চাইলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাও, সব দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যারা এখন যুদ্ধের ময়দানে। আর এ কাজটা মোটেও সহজ নয়, হয়তো নিজে মুক্তিযুদ্ধ করার চেয়েও কঠিন।’ আজ আমি উপলব্ধি করি, সত্যিই অন্যের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করা নিজের মুক্তিযুদ্ধ করার চেয়েও কঠিন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশীদের সহযোগিতা আর অবদান সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু তাদের দুঃসময়ে আমাদের অবদান কতটুকু? আজ ভারতের অখন্ডতার ধুয়া তুলে তাদের শুধু সন্ত্রাসী বলেই ক্ষান্ত হচ্ছি না, আর্থিক সুবিধার লোভে মুক্তিযোদ্ধাদের সপে দিচ্ছি আধিপত্যবাদী ভারতের খড়গের নীচে। ভবিষ্যতের ইতিহাসে যদি কোন ঐতিহাসিক আমাদের ‘কৃতঘ্ন জাতি’ বলে চিত্রিত করে, আমরা কি জবাব দেব? সেই আত্মোপলব্ধির স্থান থেকে আজকে এই মহান বিজয় দিবসে সশ্রদ্ধ ছালাম রইল সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আর কামনা করি আধার ঘুচিয়ে বাস্তবায়িত হোক তার স্বপ্ন – স্বাধীন হোক তার মাতৃভূমি।

বিজয় মহান আল্লাহ তায়ালার একটি নিয়ামত। কেননা বিশ্বের শত কোটি মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আসাম দীর্ঘ লড়াই করে আজও জালিমদের বিরুদ্ধে বিজয় পায় নি। সে তুলনায় আল্লাহ আমাদের অনেক সহজেই বিজয়ী করেছেন। তাই আসুন, আজ মহান আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করি।

সকল শহীদদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম আর দেশপ্রেমিক ভাইদের প্রতি শুভেচ্ছা। ভালবাসি বাংলাদেশ, এই দূর অনাত্মীয় ভিনদেশ থেকে খুব মিস করছি তোমায়। ভালো থেকো প্রিয় দেশ।