ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

ড. আসিফ নজরুল এক সময়ে সাংবাদিকতা করতেন। আমরা যারা বিচিন্তার পাঠক ছিলাম, তারা তাঁকে সে সুবাদে চিনি, এর আগে বা পরে তিনি বিচিত্রার সাথে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি উপন্যাস লিখার চেষ্টা করেছিলেন। দখল নামে তাঁর একটা উপন্যাস আমার পড়া ছিল । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি যেটার প্রতিপাদ্য ছিল,যতদুর মনে পড়ে। এর মধ্যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন,পানি সম্পদ/ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তিনি পিএইচডি। তিনি যুদ্ধপরাধী বিরোধী আন্দোলনের এক সময়ে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একজন জনপ্রিয় টক-শো তারকা।

২. ড. আসিফ নজরুল এর প্রোফাইল লিখা আমার উদ্দেশ্য নয়, এই লিখার অবতারণার কারণ হলো, ইদানীং তিনি ড. মুহম্মদ ইউনুস এর প্রসঙ্গ উঠলেই এত বেশি উত্তেজিত এবং আবেগতাড়িত উঠেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিত্বের সাথে যায়না, নিঃসন্দেহে ড. ইউনুস একজন তারকা নোবেল লরিয়েট, সারা বিশ্ব তাঁকে নিয়ে যেভাবে আলোড়িত হচ্ছে, সম্ভবত: আর কোন নোবেল বিজয়ী নিয়ে এত আলোড়িত বিশ্ব কখনো হয়নি। এমনকি পাশের দেশের মৌলিক বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের তো টিকিটি খুঁজে পাওয়া দায়। তিনি আন্তর্জাতিক প্রভু আমেরিকার আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব,আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিস হিলারী ক্লিনটনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বন্ধু।

এই বছরের কোন এক সময়ে, ড.ইউনুসের সামাজিক ব্যবসায়ের আন্তজার্তিক সম্মেলনের সময়ে(তারিখটি আমার মনে নেই) চ্যানেল আই-এর সংবাদপত্রে বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে, ড. নজরুল, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর সাথে আলোচনায় বলে উঠলেন,যারা তাঁর (ড. ইউনুসের) সমালোচনা করেন তারা তাঁর ”হাইট” বুঝতে পারেন না। তিনি গালিভার লিলিপুটদের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, লিলিপুট’রা গালিভার যেভাবে অবমূল্যায়ন করেছেন, এরাও তাকে সেভাবে অবমূল্যায়ন করছেন,অপদস্থ করছেন, ড. ইউনুস কে যারা যৌক্তিক ভাবে সমালোচনা করেন তাঁরাও লিলিপুট? আর টকশো আলোচক মনির হোসেন(সাংবাদিক) একবার বলেই ফেললেন,যারা ইউনুসের সমালোচনা করেন তারা ইউনুসের প্রতিষ্ঠানে চাকুরির জন্য পরীক্ষা দিলে টিকবে না, পাঠক, কি অদ্ভুত জাজমেন্ট?

ব্যারিস্টার রফিকূল হক যাঁকে সবাই সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে মানেন, তিনি একজন মন্ত্রীর সমালোচনা করতে গিয়ে বলে ফেললেন “তিনি ইউনুসের পায়ের নখের যোগ্য হবেন না”। তাহলে সুবচন নির্বাচনে?

পণ্ডিত এবং সুধীজনেরা যেভাবে, ড.ইউনুসের পক্ষ হয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে অন্যদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিচ্ছেন, এটা “গালিভার”দের সংস্কৃতির সাথে যায়না, লিলিপুট’রা না হয় অসংস্কৃত, “গালিভার”দের সম্মান বুঝে না, (যেমন বুঝে না, ড. আসিফ নজরুলের গাড়ির ড্রাইভার), কিন্তু আপনারা লিলিপুটদের এভাবে গালিগালাজ করছেন কেন?

৩.জোনাথন সুইফটের গালিভার লিলিপুটদের প্রতিটি প্রয়োজনে ছিল, বিপদে ছিল, শত বিপত্তিতে তিনি লিলিপুটদের ত্যাগ করেনি। কিন্তু আমাদের মহান ড.মুহম্মদ ইউনুস রোহিঙ্গা নিয়ে কিছু বলেন না, বলেন না বাংলাদেশ কী অসহায় ভাবে রোহিঙ্গা শরনার্থী চাপে পিষ্ট হচ্ছে, কী বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ পরিবেশ এবং সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে, হয়ত একদিন শুনতে হবে,কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের লোকরা সেটেলার,রোহিঙ্গারা এখানকার আদিবাসী; যেমন শুনি এখন পাবর্ত্য চট্টগ্রামে।সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত নিরীহ বাংলাদেশী শুধু পরিসংখ্যানের উপাদান হয়। ফালানীরা কাঁটা তারে ঝুলে থাকে, কিন্তু আমাদের শান্তিতে চ্যাম্পিয়নদের কোন রা’ শুনা যায়না। এটা হয়তোবা শান্তি সম্পর্কিত কোন বিষয় না।

৪. ড. ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংক এর আজকের যে পরিস্থিতি এটার কিছুটা দায় কি তাঁকেও তো নিতেই হবে। তিনি কেন তাঁর উত্তরসুরি তৈরি করেননি,অথবা তৈরি করতে চাননি? মনে রাখতে হবে শান্তিতে নোবেল ড. ইউনুস একা অর্জন করেননি, প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকও নোবেল জয়ী, এর জন্য অবদান আছে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মী, তিনি কি তাঁদের অবদানের কথা মনে রেখেছেন? সম্ভবত: নোবেল পেয়ে তাঁর প্রথম কাজ ছিল গ্রামীণের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপাল চন্দ্র বড়ুয়াকে সরানো,এই তিনি সবকিছুতে এককভাবে থাকতে চেয়েছেন। সিপিডি’র মত একটি ছোট গবেষণা প্রতিষ্ঠানে(গ্রামীণের তুলনায়)যেখানে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য নতুন নেতৃত্ব বা ফোর্স তৈরি করেন(ড. মুস্তাফিজুর রহমান.ড. ফাহিমদা খাতুন, আনিসাতুল ফাতেমা) সেখানে ৮৩ লক্ষ গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের মালিকানায় পরিচালিত ব্যাংকের এমডি কেন একজন নতুন নেতৃত্ব বা এমডি তৈরির প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন না?

৫. ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি রাজনীতি দল করার প্রচেষ্টা নেন, তারই অংশ হিসেবে তিনি কয়েক দফা খোলা চিঠি লেখেন দেশবাসীর সমীপে, এতে তাঁর মালিকদের (গ্রামীণের মালিক ৮৩ লক্ষ দরিদ্র নারী) সম্মতি নিয়েছিলেন? তিনি রাজনীতিতে সেদিন যদি সফল হতেন, তাহলেও কি গ্রামীণের এমডি পদে বহাল থাকতেন?

তিনি একজন নোবেল বিজয়ী সম্মানিত নাগরিক, তাঁর বিরুদ্ধে কেন কর না দেওয়ার অভিযোগ আসবে?
তিনি নাকি সেদিন জরুরী অবস্থার সরকারের কাছে অন্ততঃ দশ বছরের ক্ষমতা চেয়েছিলেন? অথচ রাজনৈতিক দলগুলোতে গনতন্ত্র নেই বলে নাগরিক সমাজ কতই না সমালোচনা মুখর হয়।