ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

শনিবার,০৮/০৯/২০১২ খ্রীঃ এর দৈনিক প্রথম আলোতে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে,উপর্যুক্ত শিরোনামে,সংবাদটিতে বলা হয়- “—- একটি মিশন শুরু করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ৮ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করবেন।মার্কিন এই প্রতিনিধিদল জাতিগত সংঘাতজনিত উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গা জনগোষ্টীর নিরাপত্তা ও তাদের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা নিয়ে সরকারী কর্মকর্তা ও আন্তজার্তিক সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করবেন। ——– ঢাকা ও ওয়াশিংটন সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা রাখাইন প্রদেশে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির বিষয়টি মিয়ানমারকে জানাবেন। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমানের উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশ সহযোগিতা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিষয়টি জানানো হবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে।” প্রশ্ন হলো রোহিঙ্গা সমস্যাটির সাথে বাংলাদেশকে কেন একটি প্রধান প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে, রোহিঙ্গা সমস্যা মূলত: মায়ানমার(বার্মা) এবং সেদেশের রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্ভুত সমস্যা। বাংলাদেশ একসময় আন্তজার্তিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসাবে মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার লক্ষে ১৯৭৯ এবং ১৯৮১ সালে আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সময়ের হিসেবে আজ তা প্রায় ৩৩ বছর। এই পর্যন্ত কোন আর্ন্তজাতিক গোষ্ঠি সমস্যাটি কোন ইস্যুই মনে করেননি। প্রয়োজনবোধ করেননি এর একটি সুষ্ঠু সমাধানের। গত ১১ জুন /2012 আরাকানে রোহিঙ্গাদের সাথে রাখাইনদের ফের সংঘর্ষে রোহিঙ্গারা যখন উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে, নাফ নদী, এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে তখন খুবই সঙ্গত কারনেই,বাংলাদেশ এদের প্রবেশাধিকারে বাধা দেয় এবং মিয়ানমারে পুশব্যাক করে,তবে বাংলাদেশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিষয়টির মোকাবেলা করে এবং যারা অসুস্থ ও শিশু ছিল তাদের খাদ্য , চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানী এবং রসদ দিয়েই তাদেরকে পুশব্যাক করা হয়। কিন্তু মতলববাজ বিভিন্ন আন্তজাতিক সংস্থাগুলো খামোকাই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আবদার তোলে, এরসাথে যুক্ত হয় আন্তজার্তিক মিডিয়াগুলোর অপপ্রচার, রোহিঙ্গাদের নাকি সীমান্তে মারধর করা হচ্ছে, এই মারধরের সাথে স্থানীয় জনগণ নাকি যুক্ত। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোও অবিবেচকের মত এমন প্রতিযোগিতা মুলকভাবে রোহিঙ্গারা শিশু নারীদের দুদর্শা তোলে ধরে যেন পুরো বিষয়টির জন্য বাংলাদেশ দায়ী, অথচ বাংলাদেশ এদের সাধ্যমত সেবা,শ্রুশুষা দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশর বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, ব্যক্তিত্ব অব্যাহতভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানায়। এসব সংগঠন , ব্যক্তি এরকম প্রশ্নও উত্থাপন করে ১৯৭১ সালে আমরাও ভারতে শরণার্থী হিসেবে গমন করেছিলাম,সে সময় যদি আমরা শরণার্থী হিসেবে সুবিধা গ্রহণ করে থাকি, তাহলে আজকে আমরা কেন রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়ে সে ঋণ শোধ করবেনা ,তাদের ভূলে গেলে চলবে না আমরা রীতিমত আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিয়ে বসে আছি এবং সেটা ৩৩ বছর ধরে। আর ভারতে আমাদের শরণার্থীরা মাত্র নয় মাস, সে সময়কার বাংলাদেশের শরণার্থী ভারতে আইন শৃঙ্খলা কিংবা সামাজিক বিপর্যয়ের কোন কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি।

অস্বীকার করার উপায় নেই, রোহিঙ্গারা একটি নির্যাতিত, নিপীড়িত জাতি। যেহেতু মিয়ানমার বাংলাদেশের একটি সীমান্তবর্তী দেশ সেহেতু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কোন সমস্যা বাংলাদেশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই বলে মিয়ানমারের সমস্যার জন্য বাংলাদেশকে কেন আন্তজার্তিক সম্প্রদায়ের কাছে জবাবদিহি করতে হবে? আন্তজার্তিক সম্প্রদায়.জাতিসংঘ এব্যাপারে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ না করে বাংলাদেশকে করছে এ কেমন অদ্ভুত আন্তজার্তিক নর্মস । যারা কক্সবাজারের অধিবাসী তার জানে, রোহিঙ্গা কীভাবে সেখানকার জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলেছে,চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে এমন কোন অপকর্ম নেই, যার সাথে এদের সম্পৃক্তি খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আড়াই লাখ শরণার্থী শুধুমাত্র সরকারী হিসেবে,তার উপর মিয়ানমার এই সংখ্যাটি স্বীকারই করেনা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো, এ সংখ্যা চার লাখও সম্ভবত: ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষ করে কক্সবাজার, পাশের উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়িতে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যদি কোন দিন এই সমস্যার সমাধানও হয়,তাহলে হিসেবের বাইরে থাকা এই রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরানো যাবেনা। কেননা এরা এখানে বিয়ে -শাদী,ব্যবসা -বাণিজ্য এবং স্থানীয় রাজনীতিতে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে এদের কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা মুশকিল হয়ে পড়বে।

এখন মার্কিন এই প্রতিনিধি দল কী “মিশন” নিয়ে আসছে? ইতোমধ্যে তাঁরা তাদের “ভিশন” সর্ম্পকে জানিয়ে দিয়েছে – সেটা হলো “রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনমানের উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশ সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্টের “অবস্থানের” বিষয়টি জানানো হবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে কোন আলোচনা ব্যতিরেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি “অবস্থান” নিয়ে ফেলছে যে রোহিঙ্গারা এখানে অনন্ত কাল থাকবে আর বাংলাদেশকে এদের বিভিন্ন “অধিকার” নিশ্চিত করতে হবে কোন রকম আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া। বলাবাহুল্য,এগুলো নিশ্চিত করতে না পারলে ঋণ অনুদান বন্ধ করে দেওয়া,রপ্তানী বাণিজ্যে বিভিন্ন শর্তারোপ করা,বিদেশে শ্রমবাজার বন্ধ করে দেওয়া,বিশেষ করে,মধ্যপ্রাচ্যে, যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের মার্কিন’রাই নিয়ন্ত্রণ করে, কথা ছিল কত দ্রুত এদের ফিরিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ”মিশন” কারণেই সম্ভবত: সেটা আর হচ্ছেনা,কেননা আন্তর্জাতিক প্রভুরা এটা নিয়ে অনেক খেলবে, খেলার প্রথম পর্ব এই ”মিশন” দিয়েই শুরু। এই বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের কোন উদ্বেগই দেখা যাচ্ছেনা এঁরা ব্যস্ত আছেন, ড. ইউনুসের ”সম্মান” আর গ্রামীণের ”মালিকানা” নিয়ে,যাঁরা ড. ইউনুস এর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত, তাঁরা নিশ্চিত থাকুন, ভবিষ্যতের বিষয় হয়ত বলা যাবেনা,তবে বর্তমান তাঁর অনেক ভাল,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার পাশে তাকে সামান্য বিরক্ত করা ছাড়া কেউই কিছুই করতে পারবেনা। আর আখেরের কথা বলা যাবেনা, কারণ মার্কিন’রা যার মিত্র শেষকালে তার পরিণতিটা সুখকর হয়না। পানামার সাবেক প্রেসিডেন্টের উদাহরণ টানলে বুঝা যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উচিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে এই দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতার প্রতিবাদ করা.দাবী তোলা রোহিঙ্গাদের এদেশ থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়া, এবং নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের পাঁয়তারা বন্ধ করা। আমরা রোহিঙ্গাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার একবাক্যে সমর্থন করি, আমরাও চাই তারা ভালভাবে এবং মানুষের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক, তবে তা বাংলাদেশকে মূল্য দিয়ে নয়।