ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

ইদানীং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে একটি বিজ্ঞাপন চিত্র প্রচার হয়,” প্যারাসিটামল দু’বেলা”। বিজ্ঞাপন চিত্রটি মজার এবং নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক,বিজ্ঞাপনটিতে অভিনেতা মুকিত কন্ঠ দিয়েছেন, অর্থাৎ বিভিন্ন ধরণের রোগী একজন ডাক্তারের কাছে আসেন,যিনি আবার কিনা সবার জন্য একই প্রেসক্রিপশন দেন,চুলপড়া রোগী থেকে প্রেমিকার বয়ফেন্ড চলে যাওয়া পর্যন্ত, সেটা হলো, প্যরাসিটিমল দু,বেলা। না পাঠক, এটা কোন ঔষুধ কোম্পানীর বিজ্ঞাপন নয়, এটা একটা বেসরকারী য়্যুনিভার্সিটির বিজ্ঞাপন, শিক্ষা বাজারের আর দশ পাঁচটা পণ্যের মতই একটা পণ্য,আপনি কিনে এটা ব্যবহার করবেন, বিশেষ করে সো কলড কর্পোরেট সংস্থা গুলোতো আপনি এটা ব্যবহার করতে পারবেন এই বিজ্ঞাপন আমরা এই মেসেজটাই পাই। শিক্ষাকে বাজারি পণ্য করার আইনগত ও সাংবিধানিক কর্মটি সম্পাদন হয়, ১৯৯২ সালে “দ্য প্রাইভেট য়্যুনিভার্সিটি এ্যাক্ট ১৯৯২” নামে জাতীয় সংসদে এটা পাশ করার মধ্য দিয়ে, তখন সমাজের বিভিন্ন কর্ণার থেকে এর বিরোধিতা করা হয়, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনগুলো থেকেও, কিন্তু খুব একটা তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেনি, তখন সরকারীভাবে এবং সমাজের অন্যান্য গ্রুপ গুলো থেকে এটা বলা হয়েছিল যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর তুলনায়, আসনসংখ্যা অত্যান্ত অপ্রতুল, ফলে মেধা এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীর একটা বিপুল অংশ উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।বাস্তবতার নিরিখেই এই যুক্তিটা সেদিন অনেকই গ্রহন করেছিল। আশা করা হয়েছিল,যারা প্রাইভেট য়্যুনিভার্সিটি প্রতিষ্টা করবেন তারা উচ্চ শিক্ষার প্রসারকে ব্রত হিসেবে গ্রহন করবেন, কিন্তু শিয়ালের হাতে মুরগী তুলে দিলে যা হয়, এই আইনের বলে, ঘুপচি গলি থেকে পরিত্যক্ত ভবন এমনকি কফিশপে পার্টিশন দিয়ে “বিশ্ববিদ্যালয়” স্থাপন শুরু হয়ে গেল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু থাক না থাক, বিবিএ, এমবিএ, কম্পিউটার সায়েন্স এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনায় কানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এখানে কোন সাধারণ পরিবারের সন্তান পড়াশোনার যোগ্যতা রাখেনা সে যতই মেধাবী হোক। উচ্চবিত্তের সন্তানরা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লায়েন্ট, তবে সেটা দোষের কিছু নয়, উচ্চবিত্ত সন্তান হওয়া তো আর দোষের না। যদিও কোন সাধারণ পরিবারের সন্তান ভর্তিও হয় তাহলে বাবার মায়ের অবস্থা যে কোন পর্যায় যায়, সেটা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণের আয়- রোজগায়ের অনেকটা ভাল বিহিত ব্যবস্থা হয়েছে,অনেকে আবার ‘ছুটি’ নিয়ে এইসব বিশ্ববিদ্যায়ের ভিসি প্রোভিসি হয়েছেন। অবসরে যাওয়া অনেকেই শিক্ষার ‘ব্রতে’ ফিরে এসেছেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একেবারেই যে অর্জন নেই সেটা বলা যাবেনা।

প্রথম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নর্থ সাউথ অনেকটা সফল বলা যায়, এরপর ইনডিপেন্ডেন্ট, ইস্ট ওয়েস্ট ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আনা যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতার “উদাহরণ” হিসেবে এখনো বিবেচিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আরেকটা দিক হলো, মালিকানা নিয়ে মামলা পাল্টা মামলা, সম্প্রতি নর্থ সাউথে এই ঘটনা ঘটছে, আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেটা বাংলাদেশের সব জায়গায় একটা সাইনবোর্ড দেখা যায়, এটার মালিক যে কতজন কিংবা এর উপাচার্য কে, বা কতজন, সেটা বলা মুশকিল, বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পাঠকের জন্য ধাঁধাঁর জন্য রইল।

এখন প্রশ্ন হলো এই কেনাবেচা শিক্ষা থেকে সমাজ কী পাচ্ছে? একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা কিনে নিবে, সমাজের সবকিছু সে ঐ বেচাকেনার নিক্তিতে পরিমাপ করবে। সে ভালবাসা কিনবে, মানবিকতা কিনবে, পারলে স্নেহ বিক্রি করবে, মায়া বিক্রি করবে, পারলে একটা দোকান দিয়েও বসতে পারে, ” এখানে ভালবাসা কেনাবেচা হয়, এ সংক্রান্ত অন্যান্যও পণ্যও পাওয়া যায়” এই বিজ্ঞাপন দিয়ে। এরজন্য তাকে একদম দোষ দেওয়া যাবেনা।

কেননা, যে শিক্ষা আহরিত নয়, ক্রীত, সেখানে জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা সুদূরপরাহত।

এখানে রাষ্ট্রের কী কোন ভূমিকা নেই? শিক্ষার দ্বার সব পর্যায়ে, উম্মুক্ত করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে, সেটা সরকারি পর্যায়ে হোক আর বেসরকারী পর্যায়ে হোক, সেটা নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আপত্তি হলো, শিক্ষাকে বেনিয়ার হাতে তুলে দেওয়া। উচ্চ শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন নামে একটি সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ আছে, তারা কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছে, সেটা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ঐ বিজ্ঞাপনটি দেখলেই বুঝা যায়!