ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহতারেমা হিনা রব্বানী খার আন্তজার্তিক মিডিয়ায় এখন ঝলমল করছেন। আন্তজার্তিক মিডিয়া তাঁর গুরুত্ব নতুন কিছু নয়। এবারের প্রচার ও গুরুত্বে ভিন্ন মাত্রা আছে, সেটা হচ্ছে, তাঁর একান্ত ব্যক্তিজীবন এবং চমকপ্রদ বিষয় হলো, আন্তজার্তিক মিডিয়াগুলো বাংলাদেশী একটি ট্যাবলয়েডের বরাত দিয়ে এসংক্রান্ত যাবতীয় খবর ছাপছে, একজন বাংলাদেশী হিসেবে বাংলাদেশী মিডিয়ার এমন আন্তজার্তিক অভিষেকে আনন্দলাভের একটা মওকা খুঁজে পেলাম। হিনা রাব্বানী বিবাহিত এবং দু’কন্যা সন্তানের জননী, তাঁর স্বামী ফিরোজ খা এই পর্যন্ত থাকলেও তিনি শিরোনাম হতেন, কেননা তিনি সুশ্রী,সুন্দর এবং ফ্যাশনদুরস্ত, মিডিয়াগুলো যা চায় একদম ওরকম,কিন্ত “কাহানি” আরো অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। তিনি প্রয়াত বেনজীর ভুট্টো পুত্র বিলওয়ালের প্রেমিকারুপে আর্বিভুত হয়েছেন এবং সেলফোনের এ যুগে, ” আমি কেমন করে পত্র লিখিব বন্ধুরে” এই আকুতিতে চিঠিপত্র লেখালেখিও হয়েছে। বিলওয়ালের প্রেমিকজীবনও(নাকি যৌনজীবন?) নানা বাহারী “কাহিনী”তে ভরপুর।

২. বাংলাদেশের এই ট্যাবলয়েডের খবরটি পাকিস্তানের টালমাটাল রাজধানীতে আরেকটা দমকা হাওয়ার ধাক্কা লাগার মতই। এই খবরটির ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেই। তেমনি নেই মোহাতারেমা হিনা রব্বানী খার কিংবা বিলওয়াল ভুট্টোর।যদিও, হিনার স্বামী ফিরোজ খার বাংলাদেশী এই ট্যাবলয়েডের খবরকে আর্বজনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু “ব্লিৎস” সম্পাদক জানিয়েছেন, এ খবরের সত্যতা ব্যাপারে তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ আছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি এর পেছনে আইএস এস হাত আছে বলেও মন্তব্য করেছে, পাকিস্তানে এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়াও অনেকে ব্যাক্ত করেছে, কেউ কেউ এমনও মন্তব্য করেছে তাঁকে ভালবাসা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হোক, ভাগ্যিস, পদত্যাগ দাবী করেনি, যদিও হিনা রব্বানী নাকি হিলারী ক্লিনটনকে বলেছেন, তাঁর বিগত ১৮ মাস সময় ছিল কঠিন।

৩. আপাত দৃষ্টিতে,হিনা রব্বানীর দাম্পত্য জীবনটি একটি ছবির মত, প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ীর স্ত্রী, অবসরে যাঁরা গজল শুনতেন।তিনি নিজেও পাকিস্থানী ফিউডাল সোসাইটির একজন সফল উত্তরাধিকারী, তারপরেও কেন তিনি পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট হাউসে “অন্তরঙ্গ” সময় কাটবেন বিলওয়াল ভুট্টোর সাথে তাও আবার প্রেসিডেন্ট আসিফ জারদারীর “চোখে” পড়ার মত? তাঁর অসুখটা কী সুখের নাকি স্বামীর অবিশ্বস্থতার জবাব? কেননা তাঁর স্বামী ফিরোজ খার একবার নাকি পরকীয়া জড়িয়েছিলেন যেটা তিনি রুখতে পারেননি,

৪.হিনা রব্বানীকে একজন ব্যক্তি হিসেবে যদি দেখি, তাহলে তিনি যেকোন ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন(সেটা অজাচার না হলেই হয়) তিনি কার সাথে জীবনযাপন করবেন কিংবা করবেন না, এই স্বাধীনতাটুকু অন্তত: তাঁর আছে। কিন্তু উপমহাদেশের যে সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক আবহ , এটাকে মেনে নেয়না। তারা ক্রিকেটার এবং বর্তমানের রাজনীতিক ইমরান খানের ইন্ডিয়াতে খেলতে এসে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে মুনমুন সেনের ফ্ল্যাটে আবিস্কৃত হওয়াকে উপভোগ করে, পারলে বাহবা দেয়, হুমায়ুন আহমেদের দ্বিতীয় জীবন নিয়ে কেঁদেকুটে একাকার হয়ে যায়,এর স্বপক্ষে কিছু নারীবাদী(?) লেখকও সমর্থন দেয়, কিন্তু গুলতেকিনের একা থাকাকেই পছন্দ করে।

৫. পাঠক! আমি কী হিনা রব্বানীর এই সম্পর্কটাকে সমর্থন করছি? বিষয়টা সেরকম নয়,যদি তাঁর পারিবারিক সম্পর্কে “চিড়” ধরে তবে সেই সম্পর্কের একটা সম্মানজনক ইতি তিনি টানতেই পারেন, কিন্তু একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেই আরেকটা সম্পর্কের দিকে পা বাড়িয়ে দেওয়া তাঁর মত দায়িত্বশীল মানুষের জন্য কী সঠিক পদক্ষেপ? যদি ধরেই নিই স্বামীর অবিশ্বস্ততাই তাঁকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, ব্লিৎসের সূত্র অনুযায়ী, যার সাথে তিনি সম্পর্ক গড়েছেন, সেই বিলওয়াল ভুট্টোর নানামাত্রিক যৌনজীবনের কাহিনী ঔই রিপোর্টগুলোতে উঠে এসেছে, যেটা খুবই ভয়াবহ! এই বিলওয়ালাও কী শেষ পযর্ন্ত তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন? ঔই অল্পবয়সী তরুন না হয়, তাঁর খ্যাতি, সৌন্দর্য্য, ফ্যাশন এর প্রতি মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছেন! তিনি কীসের প্রতি মোহাচ্ছন্ন? বিলওয়ালের সম্পর্ক তৈরিতে দায় নেই, কিন্তু তাঁর আছে, কেননা তিনি মা’।

৬. পত্রিকাতে তাঁর একটি ছবি এসেছে , দুটি সন্তান কোলে, ঔই ছবিতে তাঁকে কেমন হতবিহ্বল দেখাচ্ছে, একজন মা হিসেবে তিনি হতবিহ্বলই বটে,ব্যক্তি মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র জীবন যাপন করবেন, এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কেউ যদি কাউকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন,তার দায় তাকে বা তাদেরকে নিতেই হবে।(” আমার আসিবার দায় ছিলনা, দু’ জনের ইচ্ছে আমায় আসিতে হইল” -সমরেশ মজুমদার) হিনা রব্বানী কিংবা ফিরোজ খার যখন কোন সম্পক জড়ান, তখন এই কথাটি মনে রাখবার মত অবকাশ কী তাদের ছিল? তাঁদের দুটি সন্তান আছে , তারা বাবা মার কোলে ওম পেতে চায়, নিরাপত্তা চায়, সেটা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। পৃথিবীর কোন আইনেও ওটা সিদ্ধ নয়।

ব্যক্তিগতভাবে, আমি এই খবরটিকে একটি ”মিথ্যে” খবর হিসেবে দেখতে চাই, আমি চাই, তাদের দু’টি সন্তান দিনা ও অনন্যা হিনা- ফিরোজের ছায়াতলে বড় হয়ে উঠবে, মা -বাবার ছায়াতল ছাড়া পৃথিবী একটা বিশ্রী বিষয়, নোংরা, এবং তেতো, যে এটির মধ্যে দিয়ে যায়নি সে কখনো এটা বুঝতে পারবেনা।

৭.হিনা রব্বানী এই সম্পর্কের পেছনে অনেকে বংশগত কারণ খুঁজেছে, কারণ তাঁর চাচা মুস্তফা খার যৌনজীবন, যেখানে তাঁর ষষ্ট স্ত্রী তাহমিনা দুররানী তাঁর “মাই ফিউডাল লর্ড” বইতে যৌন নিযার্তনের বহু ঘটনা তুলে ধরেছেন, কীভাবে তাঁকে, নগ্ন করে রাখা হতো, কীভাবে অন্য পুরুষের যৌনসঙ্গী করে তা উপভোগের করত মুস্তফা খার, সেসব যন্ত্রণাময় ইতিহাস। এটার সূত্র ধরে অনেকে বলতে চাইছে এরকম ঘটাতো স্বাভাবিক, তাহলে ফিরোজ খার অফিসে নারী কর্মীর সাথে পরকীয়া’র সম্পর্ক কোন “কারণে”র পর্যায় পড়ে?
এটা মূলত; পাকিস্থানীদের সমস্যা। এদের ক্রিকেট থেকে যৌনজীবন এমন কিছ নেই, যাতে তাদের অনৈতিকতা নেই।

৮. কেউ যদি মনে করে আমি হিনা রব্বানীকে ডিপেন্ড করার জন্য এই লেখা লিখছি, সেটা ঠিক নয়, আমি মূলত: দিনা এবং অনন্যা’র মাকে ‘ফোকাস’ করে এই লেখা লিখছি।
পাকিস্থানীদের প্রতি আমার চিরন্তন অবিশ্বাস থাকবে,হুমায়ুন আজাদের সেই প্রবচনের মতই ” পাকিস্থানীরা গোলাপ নিয়ে আসলেও বিশ্বাস করা যায়না”

৯.যৌথজীবনের কোন এক পর্যায়ে স্বামী বা স্ত্রী কে “বাসী” মনে হতেই পারে, তার জন্য “টাটকা” সম্পর্ক তৈরি করতে হলে নিজেদের সন্তানদের কথা আগে ভাবতে হবে, আর সেটার প্রয়োজন না হলে, তাদেরকে পৃথিবীর আলোয় না আনাই ভাল। এরপর কেউ যদি একশ জনের সাথে সম্পর্ক গড়ে বা ভাঙ্গুক, তাতে কীই বা বলার আছে।
পরিশেষে নারীবাদীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে পুরুষ মীর মোশাররফ হোসনের “বিষাদসিন্ধু” থেকে কয়েকটা লাইন আওড়াই-

“ইশ্বর ভক্তই হউন,মহামহিম ধার্মিক প্রবরই হউন,মহা বলশালী বীরপুরুষ হউন, কি মহা প্রাণ সুপন্ডিত হউন, স্ত্রীজাতির মায়াজাল ভেদ করা বড়ই কঠিন। নারীবুদ্ধির অন্ত পাওয়া সহজ নহে।”

ঋণস্বীকার:* দৈনিক আমাদের অর্থনীতি
* “বিষাদসিন্ধু” মীর মোশাররফ হোসেন
* উইকলি ব্লিৎ।