ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে প্রায় ৭৬ লক্ষ দরিদ্র নারীর ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন বলে গ্রামীণ ব্যাংকের দাবী। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। এর ফলে পরিবারে পরিবারে শান্তির আবহ বইছে। সমাজে শান্তি আনয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ানো। ড. ইউনূস সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করেছেন। বিদেশেও অনুকরণীয় হয়েছে এই প্রচেষ্টা। সমাজে শান্তি স্থাপনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন তা বুঝাতেই ড. ইউনূসকে শান্তিতে পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে মনে হয়।

আমাদের দেশে এই ঋণের কার্যকারিতা কতটুকু তা নিয়ে সম্প্রতি পেপার-পত্রিকা, টকশোতে কিছু কথা উঠেছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে এখন অনেক তর্ক-বিতর্ক চলছে। ক্ষুদ্রঋণ আদৌ গরীব মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে জাতি দুই ভাগে বিভক্ত। একটা কথা সত্যি যে ক্ষুদ্রঋণ কিছু ব্যক্তিকে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করেছে। আবার এই ঋণের বেড়াজালে আটকে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা জন্মগতভাবেই ঋণে জর্জরিত। তারপরও এই ঋণের চক্র থেকে মুক্তি পেতে আমরা চাই না। তাইতো চারিদিকে এত এত ব্যাংক, এনজিও, কো-অপারেটিভ সোসাইটির জয়জয়কার।

সাদামাটা দৃষ্টিতে ক্ষুদ্রঋণ বলতে বুঝি, ছোটখাট ধার-কর্জ। যিনি ধার দিবেন স্বাভাবিকভাবেই তিনি ধারের বিনিময়ে কিছু সুবিধা চাইবেন। ব্যাংক, এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে থাকে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া অনেক কঠিন। ঋণ পরিশোধে পর্যাপ্ত স্থায়ী সম্পদ আছে এই নিশ্চয়তা না পেলে ব্যাংক কোনোমতেই ঋণ দেবে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এই সামর্থ্য নেই। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এনজিওগুলো বিনা জামানতে ঋণদান কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছে।

এখন আসা যাক ঋণের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায়। ব্যাংক ঋণ হোক আর এনজিও ঋণ হোক, ঋণ তো ঋণই। ঋণের একটা সুদ আছে। সমস্যা হচ্ছে ব্যাংক এবং এনজিও উভয় প্রতিষ্ঠানই ঋণ নিয়ে এক অদ্ভূত খেলা খেলে যাচ্ছে ঋণগ্রহীতার সাথে। এতে ঋণগ্রহীতা ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্ত হতে পারছে না কোনোক্রমেই। বরং আরও জড়িয়ে যাচ্ছে ঋণের জালে। ব্যবসায় ঋণের ক্ষেত্রে যার ব্যবসা আছে এবং লাভজনক তা দেখে ঋণ দেওয়া হয়।

এতে করে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে না। বেকার শিক্ষিত অনেক উদ্যোক্তা আছে যাদের সামান্য একটু মূলধন হলেই তারা উৎপাদনমুখী ব্যবসায় নামতে পারে। নতুন নতুন অনেক আইডিয়া নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এরকম উদ্যোক্তাকে মূলধন সহায়তা দেওয়ার মতো সরকারের কোনো নীতিমালা নেই।

একটি উদাহরণ দেই। কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা গ্রামের শামছুল আরেফীন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান আবিষ্কার করেছে। প্রচলিত ৫৬ ইঞ্চি ফ্যানে যেখানে ৮০-১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ লাগে সেখানে শামছুল আরেফীনের ফ্যানে মাত্র ২০-৩০ ওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে। শুধু ঢাকা শহরে যদি ৩ কোটি ফ্যান থাকে এবং এতে বিদ্যুৎ খরচ যদি এক চতুর্থাংশ কমিয়ে আনা যায় তাহলে বিদ্যুতের সমস্যা কতটা মিটানো সম্ভব শুধু এই উদ্যোগগুলোকে একটু পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্যবসায় শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েও অনেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে এগিয়ে আসে না। এর প্রথম কারণ হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রফেশনাল উদ্যোক্তা সৃষ্টির মানসিকতা নেই। শিক্ষার্থীরা ব্যবসায় শিক্ষা তথা বিবিএ, এমবিএ শাখায় পড়াশুনা করে একজন ব্যবস্থাপক/প্রশাসক হওয়ার আশা নিয়ে। একজন উদ্যোক্তা হওয়ার আশা নিয়ে নয়।

শিক্ষাজীবন থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ হাতে কলমে ধরিয়ে দিতে হবে। ডিগ্রি বা সম্মান পর্যায়ের শিক্ষা থেকেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ধরি একজন শিক্ষার্থীকে ২ লক্ষ টাকা বাজেটের একটি প্রকল্প জমা দিতে বলা হলো। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে তাকে উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২ লক্ষ টাকা মূলধন জোগান দেওয়া হলো। ফলাফল কি হতে পারে?

জোরদার মনিটরিং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকল্পটিকে এগিয়ে নেওয়া যায়। আর্থিক সহায়তা পেলে এরকম ছোটখাট প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক শিক্ষার্থী এগিয়ে আসবে নিশ্চিত। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যবসায় শিক্ষা বলতে তাত্ত্বিক কিছু বিদ্যা মুখস্ত করিয়ে পরীক্ষার খাতায় তা উগড়ে দেওয়ার ব্যবস্থাকেই বুঝায়। ব্যবসায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

আামদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য আলাদা কোনো রিসার্চ সেন্টার নেই। এরকম রিসার্চ সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবছর বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে। এভাবেই আমরা উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে পারি। তাই ক্ষুদ্রঋণ নয় বরং ক্ষুদ্র মূলধনের সংস্থান করে উদ্যোক্তা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।