ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

৩১ মার্চ ২০১২ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৩৭ জন ঋণ খেলাপী আছেন। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। কত শত কোটি টাকা খেলাপী ঋণের আওতায় আছে অর্থমন্ত্রী তা বলেন নি। ঋণ নিয়ে খেলাপী হওয়ার অনেক কারণ থাকে। ব্যাংক সাধারণত একজন ব্যক্তিকে যাচাই বাছাই করেই ঋণ দিয়ে থাকে। ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত স্থায়ী জামানত না থাকলে ব্যাংক ঋণ প্রদান করে না। অবশ্য ব্যক্তিক জামানতের জিম্মায় অনেক সময় ব্যাংক ঋণ দিতে পারে। ব্যক্তিক জামানতের এ সুবিধাটা ভোগ করেন রাজনৈতিক নেতারা।

মোট ষোল কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৩৭ জন ঋণ খেলাপী। শতকরা হিসেবে ০.০৮% অর্থাৎ ১০০০ জনে প্রায় ১ জন। আমাদের ছোট অর্থনীতিতে ঋণখেলাপীর এই সংখ্যা আতঙ্কজনক। এখানে উল্লেখ্য যে, বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকে এককভাবে ঋণখেলাপীর সংখ্যা বেশি। ২৯ হাজার ২০৩ জন। তারপরেই আছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রায় ২০ হাজার জন।

ব্র্যাক একটি এনজিও এবং এনজিওরা ক্ষুদ্র ঋণের কারবার করে। সেই হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংকও নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করেছে ঋণগ্রহীতাদের কাছে। ২/১ লাখ টাকা ঋণখেলাপীরা ধর্তব্যের বাইরে। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক নিশ্চয়ই কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করেছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ইত্যাদি খাতে কতই বা ঋণ পায় একজন কৃষক! প্রতিবছর প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি কাজ করে তারা যে আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে তাই তাদেরকে ঋণখেলাপীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায়।

রাষ্ট্রীয় খাতের চারটি ব্যাংক যথা সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এগুলোতে খেলাপী আছে প্রায় ২৫ হাজার জন। সরকারি কৃষি ব্যাংকে খেলাপী ৭ হাজার ধরে সরকারি খাতে মোট ঋণখেলাপী ৩২ হাজার জন। দেশে বর্তমানে ৩০ টি বেসরকারি ব্যাংক আছে। ৯টি বিদেশী এবং বিশেষায়িত ব্যাংক সহ দেশে সর্বমোট ব্যাংকের সংখ্যা ৪৮ টি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণখেলাপীর সংখ্যা ব্যাংক অনুপাতে খুবই কম।

রাষ্ট্রায়ত্ব খাত থেকে যারা ঋণ গ্রহণ করেন তারা খুবই প্রভাবশালী হন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিংবা চাকুরীর ভয় ভীতি দেখিয়ে তারা ঋণ মঞ্জুরে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন। রাষ্ট্রায়ত্ব এই ব্যাংকগুলো থেকে কতজন কত শতকোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে ঋণখেলাপী হয়েছেন তার হিসাব সংসদে দেয়া হয়নি। মোট খেলাপীকৃত ঋণের সিংহভাগই যে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর এ কথা বলে না দিলেও চলে।

প্রভাবশালীরা ২/৪ লাখ টাকা ঋণ নেন না। তারা নেন কোটি কোটি টাকা। কারও কারও ক্ষেত্রে কিংবা কোনো সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রে এই ঋণের পরিমাণ শত কোটি টাকাও হতে পারে। শত কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেন তারা ব্যবসায় শিল্প গড়ে তুলবেন বলে। শিল্প গড়ে তোলেন বটে তবে সেই শিল্প হয় শ্রমিক শোষণের হাতিয়ার। শ্রমিকদের শ্রমে, ঘামে শিল্প মালিকদের উদর স্ফীত হয় কিন্তু খেলাপী ঋণের পরিমাণ আর কমে না। ঋণের সুদ মওকুফ, কিস্তি কমিয়ে ন্যুনতম আদায়, শেষমেষ হাতে পায়ে ধরেও এই ঋণ আর ফেরত পাওয়া হয় না।

অনেক প্রভাবশালী ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে যা ব্যাংকে দায়বদ্ধ রাখেন তার মূল্য গ্রহণকৃত ঋণের ধারেকাছেও থাকে না, ফলে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি বিক্রয় করেও আসল উঠানো যায় না। ঋণখেলাপীর তখন পোয়াবারো। কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে গাড়ি, বাড়ি, বিদেশে সম্পদ, সন্তানদের বিদেশে পড়ানো, শপিং করতে বিদেশে। আহা! কি মজার জীবন!

বাংলাদেশে ইদানীং কালো টাকা সাদা করা নিয়ে রমরমা আলোচনা চলছে। কিভাবে কালো টাকা সাদা করা যায় এ নিয়ে অর্থ বিশেষজ্ঞদের মাঝে নানান মতদ্বৈততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঋণখেলাপীদের এই মেরে দেওয়া অর্থ কালো টাকার মধ্যে পড়ে কিনা আমি বুঝতে পারছি না। সাদা দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় এটা কালো টাকা। অপ্রদর্শিত আয় মানেই কালো টাকা। ঋণখেলাপীরা নিশ্চয়ই মেরে দেওয়া এই টাকা প্রদর্শন করে আয়কর দেয় না।

তবে মাদকের ব্যবসা, কালোবাজারী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বদলি বাণিজ্য, মিঃ টেন পার্সেন্ট এগুলোর চেয়ে ঋণের টাকা হাপিশ করে দেওয়াকে অনেক ভদ্র মনে হয়। ব্যাংকের নিয়ম-কানুন এত কড়া যে ঋণগ্রহীতা একসময় না একসময় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য। অর্থঋণ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে ব্যাংক গ্রাহকের নাকে দড়ি দিয়ে ঋণের টাকা আদায় করে নেয়। প্রভাবশালীদের প্রভাবের কারণে ঋণ ফেরত প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘায়িত হয় এই আর কি! সম্প্রতি ইলেকশনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের ঋণখেলাপী থাকলে তা পরিশোধের বিধান ঋণ পরিশোধে একটি শুভ উদ্যোগ হয়ে এসেছে। আরও জোরদার আইন-কানুন আরোপ করলে ঋণখেলাপীর সংখ্যা কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য ভিন্ন। আমি এই ১ লক্ষ ২২ হাজার ঋণখেলাপীর কমপক্ষে ১ জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু বলতে চাই। ধরে নিচ্ছি আপনি বর্তমানে শত কোটি টাকার মালিক। আমি ১০০ জন যুবককে জানি যারা শিক্ষিত এবং কর্মোৎসাহী। সুন্দর সুন্দর কিছু প্রকল্প নিয়ে তারা পরিশ্রম করে যাচ্ছে। মাত্র ৫/১০ লাখ টাকা মূলধন পেলেই তারা তাদের প্রকল্প নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। সম্ভাবনাময় এই ছোট প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের উৎপাদনশীলতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে কৃষিভিত্তিক প্রকল্প যেমন আছে তেমনি আছে বিদ্যুৎ নিয়ে, আইটি নিয়ে। মেধাবী এই তরুণদের স্বপ্ন মিইয়ে যাচ্ছে যখন তারা ব্যাংকে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। কারণ তাদের তো জামানত দেওয়ার মত অর্থ নেই। আর ঋণ পেতেও নানান ঝক্কি। ঋণ প্রদানের পরের মাস থেকে সুদাসলে যেভাবে কিস্তি কাটা আরম্ভ হয় তাতে ব্যবসাটাকে দাঁড় করাতেই তারা আবারও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে। একটা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে মুনাফা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে আনতে কিছুটা সময় তো লাগবে। প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে এই ব্যবস্থা নেই।

এই উদ্যোক্তাদের মূলধন প্রয়োজন। কমপক্ষে ৩ বৎসরের জন্য মূলধন। প্রতিজনের মাত্র ১০ লাখ টাকা মূলধন হলে সর্বমোট লাগবে ১০ কোটি টাকা। এই ১০ কোটি টাকা একজন ঋণখেলাপীর কাছে কিছুই নয়। কমপক্ষে ৩ বৎসর এই মূলধন ব্যবহৃত হবে। তিন বৎসর পর পুরো মূলধন ফেরত। প্রতিটি প্রকল্পে এই বিধান প্রযুক্ত আছে। কিন্তু এরূপ বিধান দিয়ে তো ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘মূলধন’ পাওয়া যাবে না। সরকারেরও এরকম কোনো কর্মসূচি নেই।

তাই ঋণখেলাপী কোটিপতিদের কাছে অনুরোধ আপনাদের মধ্য থেকে অন্ততঃ যে কোনো একজন এই তরুণ উদ্যোক্তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। যাচাই করে তাদের ঋণ নয়, মূলধন সংস্থান করুন। দেখুন এদের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠে।

(লেখাটা ঋণখেলাপীদের উদ্দেশে ফান করে লিখা। কেউ সিরিয়াসলি নিবেন না।)

ট্যাগঃ:

মন্তব্য ৫ পঠিত