ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

শেয়ার বাজারে ধসের জন্য মাথা ঘামানোর কোন কারণ নাই। কারণ, কতগুলো লোক যদি অর্থনীতিতে অবদান না রেখে লাভবান হতে চায়, তাদের কষ্টে আমার হৃদয় কাঁদে না। – অর্থ উপদেষ্টা

শেয়ার বাজার নিয়ে কিছুদিন ধরে যে অস্থির অবস্থা চলছে এবং আমাদের শিক্ষিত বেকার ভাইয়েরা শেয়ার বাজারে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসতে চলেছেন বলে যে মাতম চলছে এর মধ্যে অর্থ উপদেষ্টা মহোদয়ের এই কথাটি তীরের ফলার মত বিঁধেছে নিশ্চয়ই শেয়ার ব্যবসায়ীদের বুকে।

অর্থনীতিতে শেয়ার বাজারের অবদান আছে কি নেই বা থাকলে কতটুকু আছে তা বিশ্লেষণ করার জন্যই আমার এ লেখা। সম্মানিত অর্থ উপদেষ্টার এ বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আমি একটু দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ অর্থনীতিতে শেয়ার বাজারের অবদান একেবারেই নেই বললে তা সত্যের অপলাপ হবে। তবে এই অবদান একটু ভিন্ন ধাঁচের। এই ধাঁচটি কেমন তা নিচের আলোচনাতেই কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে আশা করি। আলোচনাটা আমি নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে দিলাম-

১. কোন পাবলিক লিঃ কোম্পানির যখন পুঁজির দরকার হয় তখন সে আইপিও ছেড়ে পুঁজির টাকাটা উঠিয়ে নেয়। তারপর সেই টাকা দিয়ে ঐ কোম্পানি পরিকল্পনা মত ব্যবসায় বা শিল্প স্থাপন করে কাজ করে যেতে থাকে। সংশ্লিষ্ট অর্থ বৎসরে লাভ হলে কোম্পানি শেয়ার হোল্ডারকে লভ্যাংশ দেয়। সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার কেনা-বেচায় কোম্পানির কোন হাত থাকে না। এই কাজটি করে শেয়ার হোল্ডাররা। শেয়ার বেচে দ্রুত বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্যই শেয়ারের সেকেন্ডারি বাজার। আর এখানেই জুয়া খেলায় জড়িত হয় কোম্পানির পরিচালকরা কারণ তাদের হাতে প্রচুর শেয়ার এবং অর্থ থাকে। ব্রোকারেজ হাউজ, এসইসি, ডিএসই, সিএসই’র কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির কারসাজিতে সিন্ডিকেট করেই এরকম হয়- এটা দিবালোকের ন্যায় স্বচ্ছ। প্রাথমিক শেয়ার যারা ক্রয় করে তাদের অর্থটা সরাসরি অর্থনীতিতে অবদান রাখে এটি নিশ্চিত।

২. সেকেন্ডারি মার্কেটে এই যে হাজার কোটি টাকা প্রতিনিয়ত হাতবদল হয় একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই টাকা আমাদের জিডিপিতে কোন অবদান রাখে না। প্রাইমারী মার্কেটের অর্থের একটা অবদান জিডিপিতে থাকে কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেটের অর্থের অবদান (সাদা চোখে দেখলে) থাকে না। (কেউ যদি বিপুল লাভ করে কোন ব্যক্তিগতভাবে কোন শিল্প বা উৎপাদনমুখী কিছু করে সেটা আলাদা।)

৩. সরকার তথা এসইসি এত ঢাকঢোল পিটিয়ে এই যে শেয়ার বাজারে মানুষজনকে আনছে এর পেছনে একটিই কারণ আছে বলে আমার কাছে মনে হয়, আর তা হচ্ছে অর্থের সার্কুলেশন। অর্থ যদি হাতে হাতে না ঘোরে তাহলে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। এই চিন্তা থেকেই বোধহয় শেয়ার বাজার। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে শেয়ার বাজার আছে এবং অনেক দেশে এ বাজারটা খুবই শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। অর্থনীতিতে অবদান না থাকলে শেয়ার বাজার অনেক আগেই কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলত নিশ্চিত।

৪. বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ পরিশ্রম বিমুখ এবং সহজে লাভ পেতে ইচ্ছুক। এই কারণে বিভিন্ন হায় হায় কোম্পানি রীতিমত গবেষণা করে এদেরকে ফাঁদে ফেলে। ডেসটিনি যা করছে তা এই আদলেই। ডেসটিনিতে প্রধান হিসেবে যিনি আছেন তিনি একজন প্রভাবশালী এবং নামী ব্যক্তি। সারা দেশে নেটওয়ার্ক স্থাপন করে উৎপাদন বিমুখ মানুষকে ডানহাত আর বাম হাতের লোভ দেখিয়ে কব্জা করছে ডেসটিনি। এই হাতের উপরের দিকে যারা থাকবেন তারাই লাভবান হবেন আর বাকিরা বোকা বনবে। এটাই হচ্ছে এবং চলতে থাকবে। ইউনিপেইউটু বা এরকম আরও কয়েক ডজন এমএলএম কোম্পানি আছে, তারাও এই লোভের বাজারে সক্রিয়। বাংলাদেশে এটা চলতেই থাকবে। এরা শেয়ার বাজারের জুয়ার ন্যায় আরেক জুয়া খেলায় মত্ত। এ সমস্ত কোম্পানির অর্থ একদমই জিডিপিতে তথা উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে অবদান রাখছে না।

৫. এই যে মানুষগুলো সহজে লাভ পেতে চায় আর ফাঁদে পড়ে এর অন্যতম কারণ তো আগেই বিশ্লেষণ করলাম। তা থেকে একটি সহজ সিদ্ধান্তে আসতে পারি আর তা হল এই মানুষগুলো এরকম চক্রে বারবার জড়াবে কিন্তু কেউ কষ্ট করে এক মুঠো সবজি বা এক কেজি পেয়ারা উৎপাদনেও নিজকে সম্পৃক্ত করবে না। কারণ উৎপাদন করতে গেলে একটু কষ্ট করতে হবে এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ড একটু সময়সাপেক্ষ। আমরা এই শ্রম এবং সময় দিতে রাজী নই। এটা আমাদের জাতীয় চরিত্র। তাই সহজে এবং বিনা শ্রমে লাভের আশা অর্থনীতিতে অবদান রাখে না।

এখানে যা বলেছি তা আমাদের বর্তমান দুর্দশার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আমরা যদি নিজেরা উৎপাদনমুখী না হই তাহলে দুর্দশা আরও বাড়বে। গতকালের পত্রিকায় একটি নিউজ দেখে চমকে উঠেছি। শেয়ার বাজার ধসের প্রভাব যে এত তাড়াতাড়ি শুরু হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। নিউজটি কতজনের মনে দাগ কেটেছে তা জানি না। নিউজটি শেয়ার করছি- শেয়ার মার্কেটে লস হওয়া অর্থ তুলে আনার প্রয়াসে চট্টগ্রামে জনৈক গৃহশিক্ষক তার ছাত্রীকে অপহরণ করেছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করার জন্য। এই অপরাধ প্রবণতা একজন শিক্ষককে সন্ত্রাসীতে পরিণত করেছে। শেয়ারমার্কেট ধসের এই খারাপ প্রভাব আরও বহু বৎসর নতুন নতুন অপরাধ সৃষ্টি করে আমাদের সমাজকে ভোগাবে এটি নিশ্চিত। ১৯৯৬ সালের শেয়ার ধসের ঘটনায় অনেক পরিবার ভেঙ্গে গিয়েছিল (পত্রিকায় এরকম বেশ কিছু ঘটনা এসেছিল) যার রেশ এই সমাজে এখনও আছে। ঐ বাজারে অর্থ হারিয়ে অনেকে সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছিল।

আরেকটা কথা না বললে আমার এই লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কথাটা হচ্ছে শেয়ার বাজার অবশ্যই থাকবে। তবে এই বাজারে যারা লেনদেন করবেন তাদের শেয়ার সম্পর্কে ভাল জানতে হবে বুঝতে হবে। পত্র পত্রিকায় দেখছি প্রায় ৩৩ লাখ ইনডিভিজ্যুয়াল বিও অ্যাকাউন্ট আছে ব্রোকারেজ হাউসের হিসাব অনুযায়ী। আমাদের দেশের মত একটা ছোট মার্কেটে এত বিপুল পরিমাণ শেয়ার ব্যবসায়ীর পদচারণা একটি আতঙ্কের ব্যাপার। যদিও এটি আনন্দের ব্যাপার হতে পারত যদি মার্কেটের ভিত্তি দৃঢ় হত। অনেক আগে মাসুদ রানা সিরিজের কোন একটা সিরিজে পড়েছিলাম মাসুদ রানার প্রতিদ্বন্দ্বী এক চরিত্র শেয়ার ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায় তার এত মেধা যে সমস্ত কোম্পানির প্রতিদিনের দাম সংক্রান্ত তথ্য তার নখদর্পণে থাকে। আমাদের দেশে যারা শেয়ার ব্যবসায়ে নেমেছে তাদের কয়জন কোম্পানির তথ্য যাচাই করে নেমেছে? অধিকাংশই তো গুজবের পিছনে ছুটছে।

শেয়ার বাজার ধসের পর বলা হচ্ছে শিক্ষিত বেকাররা শেয়ার ব্যবসায়ে নেমেছে। এই শিক্ষিত বেকাররা কি নিজের একটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়/শিল্প স্থাপনে টাকাটা বিনিয়োগ করতে পারত না? কেন আমাদের মধ্যে এই উৎপাদন বিমুখতা কেউ ভেবে দেখেছেন কি?